বাড়ছে উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ

বিশ্বজুড়ে উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই উগ্রতাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সংগঠন গড়ে উঠছে। কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিশুদের দলে অন্তর্ভূক্ত করার চেষ্টা করছে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা।
 
যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতীয়তাবাদীদের প্রচারণা এবং অপপ্রচার দুটোই বেড়েছে। এক রিপোর্টে দেখা গেছে, গত বছরই শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের প্রপাগান্ডা বেড়েছে ১৮২ ভাগ।
 
বিশ্লেষকরা বলছেন, যেভাবে উগ্রতা বাড়ছে তাতে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের মতে, ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব থেকেও এসব উগ্র জাতীয়তাবাদ বাড়ছে। শুক্রবার শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করেছে নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলাকারী টারান্ট।
 
নিউজিল্যান্ড শান্তির দেশ। ২০১৭ সালে ৩৫ জন নিহত হয়েছিল। আর সেই দেশে একসঙ্গে ৪৯ জনকে হত্যা করা হলো। তাও আবার মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদে। 
 
জানা গেছে, ১৯৪৩ সালের পর নিউজিল্যান্ডে এ ধরনের নারকীয় হামলা এই প্রথম। হামলার আগে খুনি ব্রেন্টন টারান্ট শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ নিয়ে ৭৩ পৃষ্ঠার একটি ইশতেহার ফেলে রেখেছিল। 
 
এর আগে সে একটি কপি নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর কাছেও দিয়েছিল। সে নািসবাদের জনক হিটলারেরও কট্টর সমর্থক। আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পেরও প্রশংসা করেছে খুনি টারান্ট। 
 
শ্বেতাঙ্গ জাতীয়বাতাদে উগ্রতা যে বেড়েছে তার সাম্প্রতিক প্রমাণ ক্রাইস্টচার্চ, যুক্তরাষ্ট্রের চার্লোটেসভিলে এবং পিটসবার্গ থেকে গ্রিসের এথেন্স। এসব স্থানে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের হামলায় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
 
‘অ্যাগেইনস্ট দ্য ফ্যাসিস্ট ক্রিপ’ এর লেখক আলেক্সান্ডার রেইড রসের মতে, বিশ্বে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ এবং নব্য নািসবাদের ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি বিশ্বের বহুত্ববাদের সংস্কৃতির জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ক্রাইস্টচার্চ হচ্ছে একেবারেই সামপ্রতিক উদাহরণ।
 
তাত্পর্যপূর্ণ বৃদ্ধি
 
গত ৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংস্থা অ্যান্টি ডিফেমেশন লিগ (এডিএল) নামের একটি সংগঠন জরিপের তথ্য প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, ২০১৮ সালে উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের প্রপাগান্ডায় ১ হাজার ১৮৭টি ঘটনা ঘটে। 
 
এর আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৪২১টি। অর্থাত্ এক বছরে বেড়েছে ১৮২ ভাগ। গত বছর ৯১টি র্যালির আয়োজন করে উগ্র জাতীয়তাবাদীরা। এর আগের বছর ছিল ৭৬টি। এদের মধ্যে এগিয়ে ছিল উগ্র ডানপন্থি গ্রুপ এভরোপা এবং প্যাট্রিয়ট ফ্রন্ট। তারা বর্ণবাদী, অ্যান্টি সেমেটিক (ইহুদি বিদ্বেষী) এবং মুসলিমবিরোধী বার্তা প্রচার করে। শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ এবং নব নািসবাদের সমর্থক এভরোপা ২০১৬ সালের মার্চে প্রতিষ্ঠিত হয়। 
 
প্যাট্রিয়ট ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৭ সালের আগষ্টে। এডিএল’র এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, সংবাদ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রিপোর্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদীরা তাদের প্রপাগান্ডা চালায়।
 
এছাড়া অ্যাটমওয়াফেন ডিভিশন, ডেইলি স্টর্মার, ভ্যানগার্ড আমেরিকা এবং আমেরিকান রেনেসাঁসসহ বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে যারা উগ্র জাতীয়তাবাদ প্রচার করে।
 
শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে উগ্রতা
 
এডিএল তাদের রিপোর্টে জানিয়েছে, কলেজ শিক্ষার্থীরাই উগ্র জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সংগঠনের মূল টার্গেট। তাদেরকে ধর্মের বিভিন্ন বিষয় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। 
 
ইসলাম বিদ্বেষী এবং অ্যান্টি সেমেটিক বিভিন্ন তথ্য জানিয়ে দলে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এমনকি শিশুদেরও দলে ভেড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে মার্কিন সরকার শিশুদের অন্তর্ভূক্তি না করাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট। 
 
এডিএল জানিয়েছে, সামপ্রতিক বছরে কলেজের বাইরেও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা তাদের প্রচারণা চালাচ্ছে। ২০১৭ সালে তারা ১২৯টি প্রপাগান্ডা চালায়, ২০১৮ সালে এসে সেটি ৮৬৮টিতে পৌছায়। ২০১৭ সালে এডিএল এক রিপোর্টে জানিয়েছিল, ৩৯ মার্কিন অঙ্গরাজ্যে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এক বছরে উগ্র জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত ১৮৮টি ঘটনা ঘটেছিল। 
 
এডিএল’র গবেষক কারলা হিল জানিয়েছেন, এসব উগ্র জাতীয়তাবাদীরা বিদ্যুতের খুঁটি, পার্ক করা গাড়িতে, দোকানের জানালা, বইয়ের তাক, লাইব্রেরিতে নিজেদের অপপ্রচারের পোস্টার লাগিয়ে থাকে।
 
শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার টারান্টের
 
টারান্ট তথাকথিত ইশতেহার প্রকাশ করেছে যেখানে সে তার সহিংস কট্টর দক্ষিণপন্থী মতাদর্শ তুলে ধরেছে। হামলার ঘটনার ১৭ মিনিটের ভিডিও এবং ইশতেহার থেকে টারান্টের চিন্তা ও মতাদর্শ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। টারান্ট যখন অস্ত্র বোঝাই গাড়ি নিয়ে আল নুর মসজিদের দিকে যায় তখন গাড়িতে সার্বিয়ান জাতীয়তাবাদী রণসঙ্গীত বাজলিছল। 
 
‘চেটনিকস’ নামে পরিচিত সার্বিয়ান প্যারামিলিটারি ইউনিট ১৯৯২-৯৫ সালের বসনিয়ান যুদ্ধের সময় এটিকে তাদের কুচকাওয়াজ সঙ্গীত হিসেবে ব্যবহার করতো। সঙ্গীতে বসনিয়ান সার্ব নেতা রাদোভান কারাদযিচের প্রশংসা রয়েছে। গণহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে রাদোভান কারাদযিচ দোষী সাব্যস্ত হন। 
 
মুসলিমদের এবং অভিবাসীদের হত্যার কারণে যেসব লোকের সাজা হয়েছে তাদের অনেকের নাম লেখা আছে টারান্টের আগ্নেয়াস্ত্রগুলোতে। একটি বন্দুকের গায়ে লেখা ‘ফর রদারহ্যাম।’ যুক্তরাজ্যের রদারহ্যামে শিশুদের ওপর এশিয়ান মুসলিম পুরুষদের যৌন নিপীড়নের যে কেলেংকারির ঘটনা আলোড়ন তুলেছিল, সেই ঘটনাকেই এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
 
দীর্ঘ ইশতেহারে টারান্ট লিখেছে, ২০১৭ সালে ইউরোপ ঘুরে আসার পর এই হামলার পরিকল্পনা শুরু করে। বিশেষ করে সুইডেনে লরি চালিয়ে আইএস সমর্থকের চালানো এক হামলার কথা। এছাড়াও আছে ফ্রান্সে ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর মতো লোকের প্রেসিডেন্ট হওয়া এবং ফ্রান্সে যে জাতিগত বৈচিত্র তা নিয়ে হতাশার কথা। টারান্টের ইশতেহারের শিরোনাম ‘দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’। 
 
ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মূল কথা, ইউরোপীয়রা ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তাদের তুলনায় নিকৃষ্ট এবং বিপদজনক জাতি ও সংস্কৃতির দাপটে। মূলত মুসলিমদের নিয়ে ঘৃণা এবং ভীতি ছড়ানোর সাংকেতিক আলোচনা বলে মনে করা হয় এসব আলোচনাকে। 
 
আরো পড়ুনঃ কম ঘুমে কমে আয়ু
 
পশ্চিমা দুনিয়ায় যে উগ্র ডানপন্থী শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটছে, তার পেছনে এ ধরণের ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্বের বড় ভূমিকা আছে বলে মনে করা হচ্ছে। নানা ধরণের গোপন গোষ্ঠী ফেসবুকে এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব প্রচারণা চালাচ্ছে জোরেশোরে।
 
ইত্তেফাক/নূহু