ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিল একটি কাভার্ড ভ্যান। নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে হঠাত্ কাভার্ড ভ্যানটিতে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। চারদিকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ভেতর থেকে চিত্কার আর আর্তনাদ ভেসে আসে। লোকজন ছুটে গিয়ে টেনে বের করলো দুই ব্যক্তিকে। শরীরের অধিকাংশই পুড়ে গেছে। তাড়াহুড়া করে তাদের নেয়া হলো হাসপাতালে। এদের একজন চালক সোহেল রানা এবং অপরজন হেলপার সেলিম হোসেন। সেলিম মারা গেছেন আর পোড়া শরীর নিয়ে জীবনযুদ্ধে এখন সোহেল। ঘটনাটি গত ২১ ফেব্রুয়ারির।
শুধু এই কাভার্ড ভ্যান নয়, সারাদেশে এমন দেড় লাখেরও বেশি যানবাহন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। এর যে কোনোটিতে যখন তখন কাভার্ড ভ্যানটির মতো বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। হতাহত হতে পারেন যাত্রী-চালক যে কেউ। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর গাড়িতে লাগানো গ্যাসের সিলিন্ডার পরীক্ষা করার নিয়ম রয়েছে। বিস্ফোরক অধিদফতরে এই পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দেয়ার কথা। মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার গাড়ি নিয়মিত পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দেয়। অন্যরা পরীক্ষা করে কি-না বা মেয়াদ আছে কি-না তার কিছুই জানে না বিস্ফোরক অধিদফতর।
বিস্ফোরক অধিদফতরের প্রধান পরিদর্শক সামসুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, ‘মেয়াদ উত্তীর্ণ এক একটি সিলিন্ডার একটি বোমার চেয়েও ভয়াবহ। এসব জেনেও আমরা গ্যাসের সিলিন্ডারটি নিয়মিত পরীক্ষা করছি না। মাঝে মধ্যে আমরা যে রিপোর্ট পাই সেটা প্রাইভেটকারের। বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা অন্যান্য যানবাহনের কোনো তথ্যই আমাদের কাছে নেই। ফলে তাদের অবস্থা কি আমরা কিছুই জানি না। একটি প্রাইভেট গাড়িতে মালিক নিজেই চলাচল করেন। তারপরও তিনি জেনে বুঝে নিয়মিত সিলিন্ডারটি পরীক্ষা করাচ্ছেন না। ফলে ঝুঁকিতে থাকছেন তিনি নিজেই। এর জন্যে আমরা নানাভাবে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
সামসুল আলম বলেন, ‘প্রতি বছর গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার সময় গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দেয়ার জন্য আমরা বছর দু’য়েক আগে মন্ত্রণালয়কে লিখেছিলাম। তারাও বিষয়টি আন্তরিকভাবে নিয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হল দেশে মাত্র ১৩/১৪টি রিটেস্ট (পুনঃপরীক্ষা) সেন্টার আছে। ফলে এটি আইনের মধ্যে ঢুকালে ওই রিটেস্ট সেন্টারগুলোতে এমন চাপ পড়বে তখন একটা লেজেগুবরে অবস্থা হয়ে যাবে। এ কারণে তখন আইনের মধ্যে বিষয়টি ঢোকানো হয়নি। ফলে গাড়ির মালিকরা ইচ্ছেমতো হয় পরীক্ষা করাচ্ছেন, নতুবা মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। আর আইনের মধ্যে কিছু না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও কোনো সুযোগ নেই।’
নিয়ন্ত্রক সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় সোয়া দুই লাখ সিএনজিচালিত যানবাহন রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় অতিক্রম করা গাড়ির সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি। এগুলোর ৮০ ভাগই পুনঃপরীক্ষা করা হয়নি। সিএনজি নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক মান নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার পাঁচ বছর পরপর রিটেস্টের বিধান রয়েছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার নিয়েই হাজার হাজার যানবাহন রাস্তায় চলাচল করছে। এর ফলে মাঝে মধ্যে গাড়িতে ঘটছে বিস্ফোরণ। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী গত তিন বছরে ১৪৪টি গাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গইঞ্চিতে ৩ হাজার পাউন্ড চাপে যখন গ্যাস ভরা হয় তখন রাস্তায় চলাচলকারী এক একটি গাড়ি যেন চলমান বোমা হয়ে ওঠে। গ্যাস ভরার সময় সিলিন্ডার এমনকি গ্যাসও উত্তপ্ত অবস্থায় থাকে। সিলিন্ডার যথাযথ না হলে বড় রকমের অঘটন ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। বড় বাস-ট্রাকের বিস্ফোরণের ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ বাস-ট্রাকগুলোতে ছয় থেকে আটটি সিলিন্ডার থাকে।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে গত জানুয়ারি পর্যন্ত নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ২৪ লাখ ৯১ হাজার ২১৯টি। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাম্বুলেন্স ৪ হাজার ২৯২টি, বাস ৩৬ হাজার ২৬৮, কার্গোভ্যান ৬ হাজার ১৭টি, কাভার্ড ভ্যান ১৭ হাজার ১২৯টি, হিউম্যান হলার ১০ হাজার ৪৬৯টি, প্রাইভেটকার ৪৩ হাজার ১৫৫টি, মাইক্রোবাস ৮৬ হাজার ৪১টি, মিনিবাস ২৬ হাজার ৯২৫টি, প্রাইভেটকার (ভাড়ায় চালিত) ২৯ হাজার ৬৪টি, অটোরিকশা ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৯২টি, ট্যাক্সিক্যাব ৪৫ হাজার ১৪১টি, ট্রাক ১ লাখ ১৪ হাজার ৪১৪। এসব যানবাহনের বড় একটি অংশ সিএনজি চালিত। কিন্তু এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কোনো দফতরের হাতেই নেই। কারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো গাড়ি সিএনজি রূপান্তরের পর রিপোর্ট সঠিকভাবে জমা দেয় না।
বিআরটিএ’র এক প্রকৌশলী জানান, গ্যাস সিলিন্ডার ঝুঁকিপূর্ণ কি না তা পরীক্ষা করা হয় প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে। সারাদেশে এমন ৫৮৭টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে রিটেস্ট সেন্টার আছে মাত্র ১৩/১৪টি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন করে যদি বিআরটিএ’র ফিটনেস নেয়ার সময় সিলিন্ডার রিটেস্ট করানো বাধ্যতামূলক করা যায় তাহলে এই ধরনের ঝুঁকি কমবে। সবাই সচেতন হবে। এর ফলে প্রাণহানি ও যানবাহনও নিরাপদ হবে।