মোবাইল ফোনের সেবায় চরম বিরক্ত গ্রাহক। এখন কোনো একটি ফোনে টানা ৫ মিনিট কথা বলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে একাধিকবার কল কেটে যাচ্ছে। চালু থাকা ফোনে কল দিলেও দেখাচ্ছে বন্ধ। আবার কথা না বললেও দেখাচ্ছে বিজি টোন। চিঠি চালাচালির মারপ্যাঁচে গ্রাহককে কলড্রপে কল ফেরতও দিচ্ছে না অপরারেটরা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি) এক্ষেত্রে চূড়ান্ত একটি গাইডলাইন এখনো দিতে পারেনি। গত তিন মাসে বিটিআরসিতে অভিযোগের পাহাড় জমে গেছে। অভিযোগ দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়ে গেছে। অথচ এসব অভিযোগের ব্যাপারে অপারেটররা বলছে, তাদের সেবার মান যথেষ্ট ভালো।
টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, ‘কল ড্রপে কল ফেরতের একটা নির্দেশনা আমরা দিয়েছিলাম। এ ক্ষেত্রে অপারেটরা কিছু ব্যাখা চেয়েছিল। আমি বলেছি, আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রাহককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে; কিন্তু এখন সমস্যা হয়েছে এই ক্ষতিপূরণটা নির্ধারণ করবে কে? বিটিআরসি এতদিন অপারেটরদের দিকেই এই সংখ্যার জন্য তাকিয়ে থাকত। আমার কাছে গতকাল এমন একটি চিঠি এসেছিল। আমি সেখানে বলেছি, বিটিআরসিকেই যন্ত্র বসিয়ে হোক বা অন্য কোনো উপায়ে হোক এটা নির্ধারণ করতে হবে। সেটার ব্যবস্থা করার কথা জানিয়ে চিঠিটি আমি পাঠিয়ে দিয়েছি। তবে শিগগিরই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। গ্রাহকের প্রতিটি অভিযোগই আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ বিটিআরসির এক হিসেবে দেখা গেছে, তাদের কাছে অভিযোগের মাত্রাও অনেক বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক গুণ। গত অক্টোবরে যেখানে অভিযোগ ছিল ৬৭টি। সেখানে গত ফেব্রুয়ারি শেষে হয়েছে ২৮৮টি। গত সেপ্টেম্বরে ছিল ৭৫টি, আর গত জানুয়ারিতে এসে হয়েছে ২৪৫টি। গত ৮ মাসে বিটিআরসিতে অভিযোগ পড়েছে প্রায় দেড় হাজার। যদিও বিটিআরসি বলছে, তাদের কাছে আসা অভিযোগের অধিকাংশেরই সুরাহা তারা করেছেন। অপারেটরের কাছ থেকে প্রতিকার না পেলেই শুধু বিটিআরসিতে অভিযোগ করা যায়। এক্ষেত্রে একজন গ্রাহক অপারেটরের কাছেই কয়েকদফা অভিযোগ করেন। প্রতিকার না পেয়ে বিটিআরসিতে আসেন।
গ্রামীণফোনের হেড অব কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মাহমুদ হোসাইন ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, বাংলাদেশে কোয়ালিটি অব সার্ভিস আশপাশের দেশের তুলনায় অনেক ভালো। বিশেষ করে কলকাতা, মুম্বাই ও হায়দারাবাদ শহরে গিয়ে আমি নিজে দেখেছি সেখানে অবস্থা অনেক খারাপ। আন্তর্জাতিক যেসব মানদণ্ড আছে সেগুলো এবং বিটিআরসির দেয়া গাইডলাইন মেনেই আমরা সেবা দিচ্ছি। এখানে কলড্রপে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সে সীমারেখা আছে তার অনেক নিচেই আমাদের অবস্থান। ঢালাও অভিযোগ করলে হবে না। তিনি বলেন, তবে অনেক ক্ষেত্রে আবহাওয়া, সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার কারণেও কল ড্রপ হতে পারে। রবির ভাইস প্রেসিডেন্ট একরাম কবীরও ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে একই ধরনের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বিটিআরসি যে নির্দেশনা দিয়েছে আমরা সেই নির্দেশনা মেনেই সবধরনের সেবা দিয়ে থাকি।
গত ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) থেকে মোবাইল অপারেটরদের চিঠি দিয়ে প্রতি কল ড্রপে এক মিনিট কল ফেরত দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। এর একদিন পর গত ২১ জানুয়ারি অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) মহাসচিব টি আই এম নুরুল কবির বিটিআরসিতে এক চিঠি দিয়ে এই নির্দেশনা স্থগিত করে আলোচনার অনুরোধ করেন। এরপর গত ২৮ জানুয়ারি মোবাইল ফোন অপারেটরদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর তারানা হালিম সাংবাদিকদের বলেন, আইটিইউ’র নির্দেশনা অনুযায়ী ৩ শতাংশের বেশি কল ড্রপ হলে গ্রাহককে কল ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি সপ্তাহে একদিন একটি ম্যাসেজের মাধ্যমে কতটি কল ড্রপ হল এবং গ্রাহক কতটি কল ফেরত পেলেন তা জানাতেও নির্দেশনা দেন। কিন্তু এই নির্দেশনার পরও গ্রাহকের স্বার্থে এখন পর্যন্ত কোনো কাজই হয়নি।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ গত বৃহস্পতিবার এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, আমরা একটা গাইডলাইন তৈরি করছি। সেটা চূড়ান্ত হয়ে গেলে এ বিষয়ে কারো কোনো অভিযোগ থাকবে না। অপারেটরদের কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে। অপারেটরদের এটা মানতে বাধ্য করা হবে। মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব মহাসচিব টি আই এম নুরুল কবির ইত্তেফাককে বলেন, ‘কল ড্রপের অনেকগুলো দিক থাকে। কোনো গ্রাহক কথা বলার সময় দেখা গেল সেখানে বিদ্যুত্ চলে গেছে ফলে পাশের বিটিএসের কানেকশন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আবার আবহাওয়া খারাপ হলে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। অন্যদিকে অপারেটররা নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের জন্য সবসময়ই কাজ করে যাচ্ছে। ফলে সেক্ষেত্রে যেসব এলাকায় কাজ হচ্ছে সেখানে সাময়িক কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু এর কোনটিই স্থায়ী নয়, সাময়িক সময়ের জন্য।
বিটিআরসিতে গ্রাহকদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, কল ড্রপের বাইরেও ইন্টারনেট নিয়েও তাদের রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। প্যাকেজ থাকার পরও সরাসরি টাকা কেটে নিচ্ছে। আবার ঠিকমতো সংযোগ পাওয়া যায় না। আবার কথা বলতে বলতে একদিকের কথা অন্যজন শুনতে পাচ্ছেন না। কিন্তু কল কাটছে না। এতে করে অপারেটররা দেখাচ্ছে গ্রাহকই কলটি কেটে দিয়েছেন। তাদের কলড্রপ হচ্ছে না। এসব অভিযোগ থেকে প্রতিকার চান তারা।
বাংলালিংকের হেড অব কর্পোরেট কমিউনিকেশন আসিফ আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘কোয়ালিটি সার্ভিস নিশ্চিত করাটা তাদের প্রথম অগ্রাধিকার। আমাদের নেটওয়ার্ক অপারেশন ও কাস্টমার সার্ভিস টিম কোয়ালিটি অব সার্ভিস নিশ্চিত করতে ২৪ ঘন্টা কাজ করছে। তবে এক্ষেত্রে কিছু বাহ্যিক বিষয়ও প্রভাব ফেলে। জনসমাগম এলাকা বা আবহায়া খারাপ হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটা প্রভাব ফেলে। তবে আমরা ভালো সেবা দিতে বদ্ধপরিকর।’