অপরাধীদের পছন্দ ঢাকা নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড

 
অপরাধীদের পছন্দের সড়কে পরিণত হয়েছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের ৫ কিলোমিটার এলাকা। গত দুই বছরে ৭ খুনের ঘটনা, বেলার নির্বাহী পরিচালকের স্বামী এবি সিদ্দিক অপহরণ ছাড়া, বোমা ফাটিয়ে চলন্ত বাস থামিয়ে মোবাইল ব্যবসায়ীকে গুলি করে টাকার ব্যাগ ছিনতাই ছাড়াও এই সড়কের ৫ কিলোমিটার এলাকায় ঘটেছে বেশ কিছু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা, সড়কের পাশে পাওয়া গেছে অনেকের লাশ । সর্বশেষ চলতি বছরের ২ এপ্রিল এই সড়কের পাশে মিলেছে ঢাকার দৃক গ্যালারির কর্মকর্তা ইরফানুল ইসলাম ইরফানের লাশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডটিকে লাশ ডাম্পিংয়ের উপযুক্ত স্থান হিসেবে মনে করে অপরাধীরা।  ইরফানের লাশটি পাওয়া যায় লিংক রোডের পূর্ব পাশের নির্জন স্থানে, যে লেনে নারায়ণগঞ্জমুখী যানবাহন চলাচল করে। রাস্তার পাশে গাড়ি পার্ক করে দ্রুত লাশ ফেলে পালিয়ে যায় ঘাতকেরা। দিনের বেলাতে লিংক রোডে চেকপোস্ট না থাকায় সে সুযোগ কাজে লাগায় তারা। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যাতায়াতের অন্যতম রুট হলো ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-পাগলা রুট থাকলেও উড়াল সেতুর (যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার) কারণে লিংক রোড দিয়েই মূলত লোকজন বেশি চলাচল করে। প্রাইভেট কার ছাড়াও গণপরিবহনে এ রুটে যাত্রী সংখ্যাও বেশি। নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে ফতুল্লার শিবু মার্কেট থেকে সাইনবোর্ডের দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার। সড়কের এই অংশেই সবচেয়ে বেশি অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এখানকার বেশকিছু স্থান প্রায় সময়েই থাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন। আর নীরব ওই স্থানগুলোকেই মূলত টার্গেট করে ছিনতাই, অপহরণের কাজটি করে থাকে দুর্বৃত্তরা। খুন করে লাশ ডাম্পিংয়ের জন্যও সড়কের এ অংশটি বেছে নেয় অপরাধীরা। এর মধ্যে ফতুল্লার শিবু মার্কেট থেকে জালকুড়ি ও জালকুড়ি থেকে ভূইগড় ও ভূইগড় থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত লিংক রোডের বিভিন্ন স্থান অনেকটাই অরক্ষিত। পৃথক লেন থাকায় লিংক রোড দিয়ে বিভিন্ন যানবাহন বেশ দ্রুত গতিতে চলাচল করে। ফলে কোনো যান রাস্তার পাশে থেমে থাকলেও  সেদিকে নজর দেয়া অন্য যানচালকের পক্ষে সাধারণত সম্ভব হয় না। লিংক রোডের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শাখা সড়ক দিয়ে ফতুল্লা, পাগলা হয়ে যাত্রাবাড়ি এবং সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল, ঢাকেশ্বরী, আদমজী এলাকা দিয়েও বের হওয়া যায়। ফলে চাষাঢ়া ও লিংক রোডে স্থাপিত সিসি ক্যামেরা দিয়ে অপরাধী শনাক্ত করা সাধারণত সম্ভব হয় না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে।
 
২০১৪ সালের ১৬ এপ্রিল পরিবেশ আইনবিদ ও বেলার নির্বাহী পরিচালক রিজওয়ানা হাসানের স্বামী গার্মেন্ট কর্মকর্তা এবি সিদ্দিক ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহরণের পর দেশজুড়ে ঘটনাটি আলোচিত হয়। ৩৬ ঘণ্টা পরে তাকে ঢাকায়  ছেড়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। ওই বছরের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নাসিকের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ ৭ জন অপহূত হন। ৩০ এপ্রিল বিকালে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ৭ খুনের ঘটনাটি শুধু দেশজুড়েই নয় বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়। এই দু’টি ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। সড়কটির বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয় পুলিশের সিসি ক্যামেরা ও দুটি চেকপোস্ট। এ ছাড়া পুলিশের টহলও নিয়মিত করা হয়। তবে এত কিছুর পরেও বন্ধ হয়নি অপরাধীদের অপতত্পরতা। ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারী ফতুল্লার ভূইগড় এলাকায় অটোরিকশাচালক দেলোয়ার হোসেনকে (২৮) কুপিয়ে খুন করে দুর্বৃত্তরা। ১৭ এপ্রিল জালকুড়ি এলাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের পার্শ্ববর্তী একটি বিল থেকে অজ্ঞাত পরিচয় যুবকের (২৫) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ৫ মে সাইনবোর্ড এলাকায় ডিবি পরিচয়ে ফজর আলী নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ২২ লাখ টাকা লুটে নেয়া হয়। ১৩ মে ডিবি পরিচয়ে উত্সব পরিবহনের একটি বাস থামিয়ে ১৮ লাখ টাকা লুট করা হয়। ১১ জুন ভূইগড় থেকে দুই ভুয়া ডিবি পুলিশকে মাইক্রোবাসসহ আটক করে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। ৩ আগস্ট রাতে ফতুল্লার মাহমুদপুরে যাত্রীবাহী একটি বাস থামিয়ে মোবাইল  ফোন ব্যবসায়ী নূরুল ইসলামকে গুলি করে হত্যার পর তার টাকার ব্যাগ নিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ২২ আগষ্ট ভূইগড়ে আবদুল্লাহ আল মামুন নামে এক বীমা কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৮ নভেম্বর রূপায়ন হাউজিং-এর সামনে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান রাজু মিয়া (৪৫) নামে এক ভ্যানগাড়ি চালক। সর্বশেষ চলতি বছরের ২ এপ্রিল দৃক গ্যালারির কর্মকর্তা ইরফানুল ইসলামের লাশটি উদ্ধার করা হয়।
 
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোখলেছুর রহমান বলেন, লিংক রোডে অপরাধ প্রবণতা কমাতে শিবুমার্কেট, স্টেডিয়ামের সামনে, জালকুড়ি, ভূইগড় ও সাইনবোর্ডে সিসি টিভি স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের দুইপাশে অসংখ্য সংযোগ সড়ক রয়েছে যেখান দিয়ে দুর্বৃত্তরা অপকর্ম করে সহজেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পুলিশের ৩টি ভ্রাম্যমাণ টিম ও দু’টি চেকপোস্ট ওই সড়কে কাজ করলেও লিংক রোড থেকে আশপাশের গ্রামের সঙ্গে সংযুক্ত সড়কগুলো থেকে যায় অরক্ষিত।