ছবি তুমি কার ? : মৈত্রীর না বাণিজ্যের !

গৌতম ঘোষ বাংলা চলচ্চিত্রের বিশাল এক ক্যানভাস। এতটাই বড় মাপের এই চিত্রকর, যার হাজার হাজার বর্ণিল সেলুলয়েডের রংতুলি আঁচড় সমৃদ্ধ করে তৈরি হয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের সামগ্রিক চলচ্চিত্রের এক অপরূপ শিল্পকর্ম! বড় বড় মানুষের বড় বড় শিল্পকর্মে বড় বড় ক্যানভাসে ছোট খাটো অবহেলার আঁচড় থাকবেই।
হয়ে যায়..কিছু আবদারে, অবহেলায় বা বেখেয়ালে! হতেই পারে! চিত্রকররাও বিভিন্ন ইন্টারভিউতে বলেন, এটা অত বুঝে সুঝে আঁকাইনি, বুঝলে? হয়ে গেছে বা হয়ে যায়!
সত্যিই কী তাই ?
শঙ্খচিল দেখার পর গৌতম দা’র কাছ থেকেও জানতে ইচ্ছে করে।
 
IMG0
 
       গৌতম ঘোষের গোটা ফিল্ম ক্যারিয়ারকে একটি চিত্রকর্ম ভাবলে, তার ‘শঙ্খচিল’ ছবিটিকে কি বলা যাবে? কালোত্তীর্ণ কোনো ক্যানভাসের অবহেলার ছিঁটে ফোঁটা?
নয়তো এই ছবির শুরু থেকেই যে দুই বাংলার সম্প্রীতির গল্পের চিত্রকর্মে গৌতম ঘোষ যে মাধ্যমগুলো দিয়ে আঁকলেন তা থেকে তার আগের অনেক ছবির হিসেবই তো মেলে না ! কুড়িগ্রামের সীমান্তের ১৪ বছর বয়সী যে ফেলানী ট্রাজেডির সাথে পরিচিত আমরা বাংলাদেশিরা.. যেই দুঃখের ক্ষত আমাদের ভেতরে, প্রচলিত-প্রচারিত। তাতে ভুলের মলম লাগাতে এলেন কেন শঙ্খচীল ছবির নান্দনিক ভয়ংকর ফ্রেম!
কাঁটাতারে জীবনযুদ্ধের নিঃশ্বাস ৪ ঘণ্টা গুণেও বাঁচতে পারেনি ফেলানি- ইতিহাস, নথি তো তা-ই বলে! অথচ সেই গভীর ক্ষত কেন মৈত্রীর রুপকথা গল্প দিয়ে ভোলাতে চাইলেন গৌতম ঘোষ! কাঁটাতার সীমান্ত, দুই বাংলার সৌহার্দ্য দেখাবার মশলা হিসেবে ভুলের এই মিছরির ছুরির মতো দৃশ্য না রাখলেও তো অনেকভাবে মৈত্রীর গল্প বলা যেত!
 
বরাবরের মতো অসাধারণ ক্যামেরার ফ্রেম আর দৃশ্যগল্পের বিবরণ। অনবদ্য আবহ সঙ্গীত আর নির্মাতার পাঁচকবির গান বাছাই।
সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকায় এত ভয়ংকর সুন্দর প্রকৃতির যে মিশেল, তা একজন অনবদ্য নির্মাতা গৌতম ঘোষের জন্যই আমরা দেখতে পেলাম। গৌতম ঘোষের এখানেই যে মুন্সিয়ানা। চোখ জুড়িয়ে দেয়া , মোহমেঘে ভারী করে রাখতে জানেন দর্শকমন।
 
 
কিন্তু প্রসেনজিতের মতো শক্তিমান অভিনেতাকে কবি মুনতাসির চৌধুরী বাদল হিসেবে দেখিয়ে কবিতার প্রলাপ রইলোনা তেমন, সেই কবি এক সম্প্রীতির প্রবন্ধ লিখতেই ছবির দৃশ্যকল্প বর্ণনা শুরু করলেন।
        গোটা ছবির গল্প এক বাংলাদেশি সাংবাদিকের বয়ানে দেখানো হলো। খুব সংক্ষিপ্ত চরিত্রে সাংবাদিক হিসেবে শাহেদ আলীকে যেভাবে কাচুমাচু হয়ে সংলাপে দেখা গেল। তাতে প্রথমদিকে ভ্রম হচ্ছিল, সাংবাদিককে কি জোরপূর্বক ধরে আনা কি-না। কিংবা আমাদের বড় ভাইয়েরা কি এমনই আচরণ করেন। জানামতে- তা তো নয়। সেখানে পারস্পরিক সম্মানের সম্পর্কই তো বর্তমান। অথচ এরকম ভুল সিকোয়েন্স কেন সাজালেন। সাংবাদিক ভীতুস্মরে কথা বলছেন, গুটি গুটি পায়ে হাঁটছেন!
নাকি ভুল হচ্ছিল আমরা সত্যিই পদ্মা নদীর মাঝি , শুকনো লঙ্কা বা মনের মানুষের ছবি দেখতে বসেছি কি-না!
আর নয়তো বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী মানুষের দুঃখ-সংকট মোচনের এই মৈত্রীর গল্পে বোধ করি গৌতম ঘোষ দেখাতে চাইলেন অনবদ্য এক সম্প্রীতির আখ্যান। যা ঘটে যাওয়া অতীত নয়, হয়তো ভবিতব্যে দৃশ্যকল্প এমনটা দেখতে চান বলে নির্মাতা তার ঘরে বসে স্বপ্ন বুনেছেন। কিংবা প্রযোজকদ্বয়। সিনেমায় ধর্ম-রাজনীতির মিশেল দেখাতে গিয়ে কেমন একটু গুলিয়ে ফেললেন কি? খুবই কি প্রয়োজন বর্ডার পার হলেই মুসলিম নাম বদলে হিন্দু নামে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া। সেটিকে অনেক লজিকে দেখাতে চেয়েছেন, কিন্তু নিরুপায় হবার জোরালো কারণ ছিল না তাতে!
 
IMG2
নদীর এপার ওপার দুটি দেশ। সেখানে অবৈধ অনুপ্রবেশে ধর্মটাই যেন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড় করালেন। মাইনোরিটি, দেশভাগ থাকলেই বঝি ক্লাসিক ছবির নামান্তর হয় সে সকল!
‘শঙ্খচিল’-এ মুনতাসির চৌধুরী বাদল নামের এক স্কুল মাস্টারের জীবনে। দশরথ মাঝির পাহাড়ের মত তার জীবনে বাধা হয়ে আসে দুই দেশের কাঁটাতার। কারণ তার মেয়ের হার্টের বাল্ব নষ্ট হয়ে গেলে দ্রুত চিকিত্সার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু ভালো চিকিত্সার জন্য তাকে যেতে হবে খুলনা কিংবা ঢাকা শহরে। যেখানে যাওয়ার আগেই হয়তো বড় কোনো বিপদ হয়ে যেতে পারে একমাত্র মেয়ে রূপসার। আর অন্যদিকে হাতের কাছে শুধু সীমানাটা পেরোলেই ভারতের টাকিতে সুচিকিত্সা হয়, পাশেই আবার কলকাতা। বাদল মাস্টার পড়েন মহা সংকটে। সুচিকিত্সার জন্য এই সীমান্ত এলাকা থেকে তাকে দ্রুত সময়ে খুলনা কিংবা ঢাকা শহরে যাওয়ারও সময় নেই! তাই তার স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পরামর্শে খুলনা কিংবা ঢাকা নয়, তার দ্রুত সময় আর ভালো চিকিত্সার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবেই সীমানা পাড়ি দিয়ে মেয়েকে নিয়ে ভারতের টাকি যায় বাদল মাস্টার ও তার স্ত্রী।
 
 
ছবির অভিনয়ের মুন্সিয়ানা সবাই সাধ্যমতো দেখিয়েছেন। যদিও গল্পের আঙ্গিকের কারণেই সবাইকে ছাপিয়ে গেছে রুপসা নামের ‘সাঁঝবাতির ’ চরিত্রটি। ছবিটির মূল শিল্পী এই ক্ষুদে অভিনেত্রী সাঁঝবাতি’।
প্রসেনজিতের অভিনয় নিয়ে বলার কোনো মানে নেই। তিনি এমন এক মাপের মহানায়ক তার অভিনয়ের তুলনা চলে না। আর এই ছবিতে তার সাথে যোগ হয়েছে বরেণ্য গৌতম ঘোষের কেমিস্ট্রি। তাই প্রসেনজিতের পর্দা উপস্থিতি মানেই মুগ্ধতায় ডুবিয়েছে সমালোচক মন।
 
 
কুসুম শিকদার তার এ যাবত্ কালের সেরা অভিনয় টুকু দেখিয়েছেন এ ছবিতে। এবং অবশ্যই তা নির্মাতার কল্যান। কিন্তু বিশ্ববরেণ্য নির্মাতা তার এই ‘শঙ্খচিল’ ছবির ভেতরে দূর্বল বা পরিকল্পিত মৈত্রীর যে গল্প টানতে চেয়েছেন তাতে যেন দর্শক প্রত্যাশায় বড় আঘাত লেগে যায়। কি দেখতে এসেছিলাম, কি দেখছি? গৌতম ঘোষের গল্পের যে মোচড়, যে অপরূপ অজানা ঘটনার জার্নি, সেসবের তো কিছুই নেই। বরং গল্পের এলোমেলো গতি, সহজ ক্লাইমেক্স। বলিউডি মুভিতে যেন টুপিওয়ালা মানেই সন্ত্রাসী.. গৌতম ঘোষের এই গল্পেও এক শঠ-খারাপ চরিত্রের দালালকে দেখানো হরো মুসলিম। নাকি ছবির বিরতির পরের খন্ড কলকাতার হলদর্শকের জন্য? সহজ ব্যালান্সড সমীকরণ করা!
এদিকে  হঠাত্ কলকাতার উচ্ছৃংখলতা দেখাতে গিয়ে একদল বাইক চালকের মাতলামি দেখালেন..অথচ গল্পের সঙ্গতিতে সেই দৃশ্যটার ব্যাখ্যা কি বোঝালেন তিনি তা বোধগম্য হলো না ! আর দুই বাংলার সম্প্রীতি দেখানোর চর্চায় এটুকু কি খুব জরুরী ছিল?
 
IMG3
 
 
কাঁটাতারের বাঁধা মানতে হয় না, শঙ্খচিলের। শঙ্খচিল উন্মুক্ত। ছবির মূল প্রতিপাদ্য এই অনবদ্য বিষয়টিই। অথচ সেই ট্রাজিক পয়েন্টগুলোকে সীমান্তবর্তী মানুষের যে পরস্পরের দুঃখবোধ ভুলে সম্প্রীতির ককটেল সাজিয়েছেন- তার প্রেক্ষিতে গৌতম ঘোষের দর্শকেরা যে স্বস্তি পায় না।
ছবির এক লাইণের প্রতিপাদ্যে যদি বলতে হয়, তাহলে বলা যায় ছবিটি মুক্ত সাংস্কৃতিক বিপ্লব তৈরির। কিন্তু সেখানে আমরা বাংলাদেশ আর পশ্চিমবাংলা এই দুই স্থানের যে বাঙালি স্বত্ত্বার আত্মিক যোগাযোগ, সেই মেল বন্ধনের অপরপিঠে ওপার বাংলায় এখনও আমাদের টিভি চ্যানেল দেখানো হয় না এখনও, সেখানের সাংস্কৃতিক বিপ্লব কি করে বোঝাবেন গৌতম দা। গত তিন বছর ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের টালমাটাল অবস্থানে টলিউডের অধিকাংশ অভিনেতা এখন যৌথ বাণিজ্যের ব্যবসায়িক উপকরণ। কিংবা অতি সম্প্রতি মেহের আফরোজ শাওনের ছবি নামিয়ে বাণিজ্যের দোহাই দিয়েই সেখানে ওপার বাংলার ছবি চালানো হলো- হুমায়ূন আহমেদের গল্পচিত্র নামিয়ে!
সেই অবস্থানে বসে, ঠিক সেখানে গৌতম ঘোষের ছবিতে প্রচলিত ক্লাসিক খোঁজার চেষ্টা করলে শঙ্খচিল দেখলে বিভ্রান্ত হতেই হয়!
 
IMG1
 
যেমন, সিনেমার প্রথমেই ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীদের গুলিতে যে বাংলাদেশির মৃত্যু হয়- তার খুনের দায় বিএসএফ নিজের ঘাড়ে না নিয়ে বরং ইতিহাসের উপর চাপিয়ে দিয়ে সাফাই গাইলেন। বাংলাদেশের সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন ‘খুনের দায় কার?’
কিংবা সীমান্ত হত্যার দায়তো ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদেরই বলে জিজ্ঞেস করেন।
তখন সীমান্ত প্রধান বললেন, ‘এই খুনের দায় কোনো ভারতীয় সীমান্তরক্ষীর না, বরং ব্লাডি হিস্ট্রির’।
এমন নানান বিচ্ছিন্ন ডায়লগ আর মেসেজে ঠিক কি বোঝাতে চাইলেন তা স্পষ্ট হয় কি?
আবছা আলোর সিনেমা হলে, আবছা ভাবাবেগের এই গল্পে গৌতম ঘোষের এই ছবিরই এক পঙক্তি - নদী তুমি কার :হিন্দু না মুসলমানের?’ বাক্যটি খানিক অনুসরণ করে তাই লেখাটির শিরোনাম দিতে ইচ্ছে করে।
তাই শঙ্খচিলের এই রিভিউ এর শিরোনাম হোক
 — ছবি তুমি কার? : মৈত্রীর না বাণিজ্যের !