বিএনপিতে মনোনয়ন বাণিজ্য সিণ্ডিকেট

বিএনপিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন এবং দলের পদ-পদবি বিক্রির একটি বাণিজ্য সিন্ডিকেট বিত্ত-বৈভবের পাহাড় গড়ছে। চেয়ারপার্সনের গুলশান অফিসে এই সিন্ডিকেটের ঘাঁটি। বেগম খালেদা জিয়া যাদের বিশ্বাস করে বিভিন্ন দায়িত্ব দিয়েছেন তারাই এখন তার অফিসকে ‘বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী’ করে নিয়েছেন এ যেন সরিষার ভেতরেই ‘ভূত’। এই বাণিজ্য সিন্ডিকেটের হোতারা সরাসরি টাকা নেন না। তাদের কয়েকজন এজেন্ট আছেন যারা ‘ক্যাশিয়ার’ ও ‘মক্কেল’ ধরার কাজ করেন। তারাই ইউপিতে প্রার্থী মনোনয়নে রমরমা বাণিজ্য করছেন। এর আগে পৌর নির্বাচনেও করেছেন। দলের নতুন কমিটিতে পদ-পদবি দেয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে বড় অংকের টাকা নিচ্ছেন তারা। নিচ্ছেন উপঢৌকন।
 
ঐ সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরের এক সূত্র জানায়, সদ্য ঘোষিত সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদের কয়েকটি বিক্রি করে কয়েক কোটি টাকা পেয়েছে এই সিন্ডিকেট। আর পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মনোনয়ন বাণিজ্য করে অন্তত ৩০ কোটি টাকা আয় করেছেন তারা। এখন ইউপি নির্বাচনের সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন কমিটির পদ বাণিজ্য। এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা সদ্য অবসর নেয়া এক যুগ্ম মহাসচিব। তার সঙ্গে আছেন গুলশান অফিসের কতিপয় কর্মকর্তা এবং স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য। স্থানীয় নির্বাচনে দলের প্রার্থী হতে হলে বেশিরভাগ প্রার্থীকে গুনতে হয় নগদ টাকা। এজন্য এই সিন্ডিকেট ফাঁদ পাতে। তৃণমূল থেকে সুপারিশকৃত যে প্রার্থীর নাম গুলশান অফিসে আসে তারা নানা অজুহাত, ফাঁকফোকর বের করে। এতকিছুতে প্রার্থী যখন পেরেশান হয়ে পড়েন তখন সিন্ডিকেটের এজেন্টরা দরদাম করতে থাকে। শেষে রফা হয়। আবার বেশি টাকা পেলে অপরিচিত কোনো লোককে দেয়া হয় দলের প্রত্যয়নপত্র।
 
ইত্তেফাকের কাছে শনিবার এরকম মনোনয়ন বাণিজ্যের কিছু তথ্য প্রমাণ এসেছে। এর মধ্যে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নে প্রার্থী দিয়ে ৩০ লাখ টাকার মনোনয়ন বাণিজ্যেরও উল্লেখ আছে। দাউদকান্দির ইউনিয়ন নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়ে একজন   প্রার্থীর কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ৬ লক্ষ টাকা। বিএনপির আসন্ন নির্বাহী কমিটিতে ঢোকানোর কথা বলে চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার, সিলেট, ঢাকার মিরপুর, এফডিসি এবং মিরেরসরাইয়ের অন্তত:৬ জনের কাছ থেকে এই সিন্ডিকেট বিরাট অংকের টাকা নিয়েছে। এসব নিয়ে এখন রীতিমত তোলপাড় চলছে বিএনপিতে। ফাঁস হয়ে গেছে এই সিন্ডিকেটের ক্যাশিয়ার বলে ‘পরিচিত’ এক নেতার ব্যাংকের স্টেটমেন্ট। দলের সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুর গত এক বছরের একটি ব্যাংকের বিবরণী ফাঁস হয়ে গেছে। যেখানে (মার্কেন্টাইল ব্যাংকে) প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার লেনদেন করেছেন তিনি। এই ব্যাংক স্টেটমেন্টের ফটোকপি এখন বিএনপি নেতা-কর্মীদের হাতে হাতে। দলের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইত্তেফাককে জানিয়েছে, এই টাকা পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মনোনয়ন বাণিজ্যের। জানা গেছে, দলের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে গত বছরের ১৮ মে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা টিপুকে দলের গুরুত্বপূর্ণ সহ-দফতর সম্পাদক করা হয়। মূলত টিপুর ঘনিষ্ঠজন সদ্য সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান, স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস তার পদায়নের নেপথ্যে ছিলেন।
 
ইত্তেফাকের হাতে আসা ব্যাংক স্টেটমেন্টে দেখা যায়, ২০১৫ সালের ৫ এপ্রিল থেকে চলতি বছরের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত তাইফুলের মালিকানাধীন কোম্পানি ‘মেসার্স টি এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে মোট ৪ কোটি ৩৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৭৩ টাকা জমা হয়েছে। এই সময়ে ব্যাংক থেকে তুলে নেয়া হয়েছে চার কোটি ৩৭ লাখ ৫২ হাজার ৩৭২ টাকা। এতে দেখা যায়, পাবনা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনলাইনে ওই হিসাব নম্বরে টাকা জমা হয়েছে। তবে তাইফুলের দাবি, এটি পুরোপুরিই তার ব্যবসার লেনদেনের টাকা। এর সঙ্গে মনোনয়ন বাণিজ্যের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তাইফুল ইসলাম টিপুর গ্রামের বাড়ি নাটোরের লালপুর উপজেলার মোমেনপুর গ্রামে। নাটোর জেলা বিএনপির নেতারা জানান, তার বড় কোনো ব্যবসা আছে বলে এযাবত্কালে তারা শোনেননি। এদিকে বাণিজ্য সিন্ডিকেটের খবর রাখেন এমন একটি সূত্র জানায়, টিপুর মতোই দলের প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় জড়িত দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য বেলাল আহমেদ সম্প্রতি দুইটি ট্রাক খরিদ করেছেন। তিনি ছাগলনাইয়ায় তার এলাকায় ৯০ লাখ টাকা খরচ করে বিলাসবহুল নতুন বাড়ি করেছেন। যে বাড়ি এবং ট্রাকের ছবি ইত্তেফাকের হাতে এসেছে। এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত আউয়াল খান কিনেছেন ভক্সি গাড়ি। এছাড়া সম্প্রতি ঘোষিত দলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদ দেয়া হয়েছে তাকে। তার এই পদায়ন নিয়ে বিস্মিত বিএনপির অনেকে। দলের একটি সূত্রমতে এরকম আরো কয়েকটি একাউন্ট আছে সিন্ডিকেট এবং তাদের এজেন্টদের। এদিকে পৌর ও ইউপি নির্বাচন প্রক্রিয়ার মূল তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে কাজ করছেন দলের সদ্য সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যের কথা অস্বীকার করেছেন।
 
দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইত্তেফাককে বলেন, গুলশান অফিসের সিন্ডিকেটটি কোনো কাজ করে প্রশ্নবিদ্ধ হলেই তা দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ওপর চাপিয়ে আসছে। অথচ সম্প্রতি দলের ৪২ জনের যে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে তাদের কয়েকজনকে বেগম জিয়া চেনেন না। বাণিজ্য করে তাদের পদ-পদবি দেয়া হয়েছে। হাইকমান্ড থেকে যে তালিকা আসছে তা উল্টাপাল্টা করছে এই সিন্ডিকেট। তাদের লোকজনকে ঢুকানো হচ্ছে।
 
এসব অনিয়ম রুখতে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দলের প্রায় সব তরুণ নেতা এবং কয়েকজন সিনিয়র নেতাও। তাদের মতে, দলের নতুন কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় তারেক রহমান নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত না থাকায় পদবাণিজ্য করতে পারছে গুলশানের সিন্ডিকেট।