কর্ণফুলী হালদা শঙ্খ ও ফেনী নদীতে বেপরোয়া বালু দস্যুরা

চট্টগ্রামে অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনকে পাত্তা না দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে কর্ণফুলী, হালদা, শঙ্খ ও ফেনী নদীর তীর ভাঙছে। বালুদস্যুদের থাবায় এসব নদীর নাব্যতায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি নদীর মত্স্য সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও আশপাশের বাসিন্দাদের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে।
 
সংশ্লিষ্টরা জানান, বঙ্গোপসাগরের মোহনা থেকে উজানে কালুরঘাট সেতু সংলগ্ন এলাকার কর্ণফুলী অংশ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন। সেতু এলাকার কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ রেলওয়ের। বোয়ালখালী, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, হাটহাজারী উপজেলায় কর্ণফুলী ও হালদা নদীর বৃহত্ অংশ, বাঁশখালীতে শঙ্খ নদী ও মিরসরাইয়ে ফেনী নদীর বড় অংশের নিয়ন্ত্রক চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। জেলার ১১৭টি মহালের উল্লেখযোগ্য অংশই এই চার নদীতে। প্রতিবছর ইজারা আহ্বান করলেও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে অর্ধেক মহালও ইজারা হয় না; কিন্তু পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেদারছে এসব নদ-নদী ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন খাল থেকে বালু উত্তোলন চলছে।
 
পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মকবুল হোসেন ইত্তেফাককে বলেছেন- সেতু, সড়ক, মহাসড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিকটবর্তী স্থান এবং পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করে এমন কোনো স্থান হতে বালু উত্তোলন করা পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের পরিপন্থী। এসব স্থানে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে পরিবেশের নানা ধরনের ক্ষতি হয়।
 
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মঞ্জুুরুল কিবরিয়া বলছেন, শুধু হালদা নদীতেই ১৪টি বৈধ ও ২৯টি অবৈধ মহাল আছে। এসব মহালে অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর উত্পাদনশীলতা নষ্ট হচ্ছে, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের উপর চরম নেতিবচাক প্রভাব পড়ছে। বালু উত্তোলন করা স্থানে ভরাট হওয়ার সময় পার্শ্ববর্তী স্থানে ভাঙন দেখা দিচ্ছে, মা মাছ আঘাত পাচ্ছে, এমনকি মারাও যাচ্ছে।
 
চট্টগ্রাম নগরীর কালুরঘাট এলাকায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী কালুরঘাট সেতুর দুই পার্শ্বে বালুর স্তূপ। আশপাশের এলাকায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে কর্ণফুলীর নাব্যতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সেতুও হুমকির মুখে পড়েছে।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কালুরঘাট সেতুর নিকটবর্তী এলাকা থেকে হালদা নদীর মুখ পর্যন্ত এলাকায় ছোট-বড় অর্ধশতাধিক মহাল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলিত হচ্ছে। আবার ফেনী নদীর উপর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ধুমঘাট ব্রিজের আশপাশের এলাকা থেকেও ইচ্ছেমতো বালু উত্তোলন করছে বালুদস্যুরা। এদুইটি ব্রিজ ছাড়াও চট্টগ্রামের অন্যান্য উপজেলায় বেশকিছু ব্রিজ-কালভার্টের আশপাশ থেকে বালু উত্তোলন করতে দেখা গেছে।
 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, মিরসরাই, হাটহাজারী ও বাঁশখালী উপজেলার বিভিন্ন স্থানের নদী-খাল থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব স্থানের বেশিরভাগ মহাল ইজারা না থাকলেও সরকার দলের নাম ভাঙিয়ে এক শ্রেণির অসাধু সিন্ডিকেট বলগেট, ড্রেজার ও বড় আকারের নৌকা দিয়ে রাতদিন বালু উত্তোলন করছে, নতুন নতুন মহাল তৈরি করছে।
 
জেলা প্রশাসনের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর রুহুল আমীন ইত্তেফাককে বলেন, বিশেষজ্ঞ দ্বারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মহালের ব্লক (যে অংশে বালু উত্তোলন করা যাবে) নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত ব্লকের বাইরে বালু উত্তোলন অবৈধ।