মুস্তাফিজ ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’

 
মাত্র এক বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেকের বয়সও দুই বছরের বেশি নয়। এতটুকু সময়ের মধ্যেই মুস্তাফিজুর রহমানের উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত ক্রিকেট বিশ্ব। ‘কাটার মাস্টার’ থেকে আদুরে ‘ফিজ’-জুটে গেছে অনেকগুলো অভিধা। তবে বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষের আপন হয়ে ওঠা মুস্তাফিজকে হয়তো একটি অভিধায়ই সবচেয়ে ভালো মানায়: ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’!
 
বাংলাদেশি এই পেসারের ছোট্ট আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার যেন হার মানায় রূপকথাকেও। ক্রিকেটের প্রত্যেক সংস্করণেই মুস্তাফিজের বোলিং গড় ১৫ এর নীচে। সবচেয়ে বাজে গড় দুই টেস্টে ১৪.৫০! ১৩টি টি-টোয়েন্টিতে গড় ১৩.৯৫। উইকেট সংখ্যা ২২টি। ইকোনমি রেট ছয়ের নীচে। নয় ওয়ানডেতে ওভার প্রতি পাঁচের কম রান দিয়ে নিয়েছেন ২৬ উইকেট। অর্থাত্ ম্যাচ প্রতি তিন উইকেট আর গড় ১২.২৪! রেকর্ডের কথা বাদ দিয়েও এক বছরে ক্রিকেটের উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠতে এর চেয়ে বেশি কী লাগে!
 
তখনও ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পথচলা শুরু হয়নি মুস্তাফিজের। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক সাক্ষাত্কারে ওয়াসিম আকরাম বলেছিলেন, ‘‘আমার এখনও মনে আছে। ১৯৮৯ সালে কেউ একজন আমাকে স্লোয়ার বল শিখতে বলেছিলেন। আমি বলেছিলাম, ‘দূর হও হতচ্ছাড়া।’’ ফাস্ট বোলিংয়ের বৈশিষ্ট্য বুঝাতেই কথাটি বলেছিলেন পাকিস্তান কিংবদন্তি। এক বছরে মুস্তাফিজের নৈপুণ্য দেখে এখন হয়তো কথাটা বলতে একটু হলেও ভাববেন ওয়াসিম। জেফ থমসন কিংবা মাইকেল হোল্ডিংরা আতঙ্ক ছড়াতেন পেস আর ভয়ঙ্কর বাউন্সে। ওয়াসিমের ছিল সুয়িং। বিশ্ব ক্রিকেট মঞ্চে মুস্তাফিজের আগমন স্লোয়ারের সঙ্গে কাটারের শিল্পিত প্রদর্শনীতে। যেটা এখনও বুঝে উঠতে পারেননি এবি ডি ভিলিয়ার্স-হাশিম আমলা-কেন উইলিয়ামসনের মতো ব্যাটসম্যানরা। এখানেই থমসন, হোল্ডিং আর ওয়াসিমদের মতো কিংবদন্তিদের থেকে স্বতন্ত্র মুস্তাফিজ।  গত বছরের এপ্রিলে পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে আন্তর্জাতিক   ক্রিকেটে অভিষেক। মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে সচরাচর ধারা ভেঙে ১৯ বছর বয়সী মুস্তাফিজকে বল তুলে দিলেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। রত্ন চিনে নিতে ভুল করেন না মাশরাফি। প্রথম স্পেলে দুই ওভারে মুস্তাফিজ দিলেন মাত্র পাঁচ রান। দ্বিতীয় স্পেলে ১১ তম ওভারে যখন বোলিংয়ে এলেন তখন ব্যাটিংয়ে শহীদ আফ্রিদি। পাকিস্তানের হয়ে টি-টোয়েন্টিতে যার দ্বিতীয় সর্বাধিক রান। তৃতীয় বলে মুস্তাফিজের বলে ছক্কার অর্ধশতক পূরণ করেন ‘বুম বুম আফ্রিদি’। কিন্তু পরের বলেই কী দারুণভাবেই না বোকা বানালেন আফ্রিদিকে। অফ কাটারে পিছনে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান পাকিস্তান অধিনায়ক। এরপর দুর্দান্ত ইয়র্কারে তুলে নেন পাকিস্তানের হয়ে সর্বাধিক রান সংগ্রাহক মোহাম্মদ হাফিজকেও।
 
তবে কাটার যে একটি শিল্প সেটা বুঝিয়েছিলেন একই বছরের জুনে ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকে। প্রথম নতুন বলে কিছুটা খরুচে ছিলেন। জাদুটা দেখালেন দ্বিতীয় স্পেলে। তার পঞ্চম ওভারের পঞ্চম বলটি বুঝতেই পারেননি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা রোহিত শর্মা। মাশরাফির হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান ওয়ানডের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। এরপর একে এক স্লোয়ার আর কাটারের মায়াজালে বিভ্রান্ত করে অজিঙ্কা রাহানে-সুরেশ রায়নাদের তুলে নিয়ে বাংলাদেশের হয়ে তাসকিন আহমেদের পর ওয়ানডে অভিষেকেই তুলে নেন পাঁচ উইকেট।
 
জাদুটা যে ক্ষণিকের নয়, সেটা প্রমাণ দিলেন দ্বিতীয় ওয়ানডেতে। রোহিত-মাহেন্দ্র সিং ধোনিসহ ছয় উইকেট তুলে নিয়ে গড়ে ফেলেন বিশ্ব রেকর্ড। জিম্বাবুয়ের ব্রায়ান ভিট্টোরিকে হটিয়ে প্রথম দুই ম্যাচে ১১ উইকেট নেয়ার মাইলফলক গড়েন তিনি। আর সিরিজ শেষে সঙ্গী হয় আরো একটি রেকর্ড। তিন ম্যাচের সিরিজে মুস্তাফিজের ১৩ উইকেট শিকারই বিশ্বসেরা। ক্রিকেট বিশ্বের প্রধান শিরোনাম হয়ে যান একটি সিরিজেই। কিংবদন্তিদের পিছনের গল্পটা বেশিরভাগ সময়ই অদ্ভুত হয়। হোল্ডিংয়ের কথাই ধরুন না। ছোট বয়সে আম্পায়ার, প্যাড কিংবা গ্লাভস ছাড়া যখন খেলতেন, তখন অফ স্পিনার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবদন্তি। আর সেই হোল্ডিংয়ের পেস আতঙ্কে এক সময় ঘুম হারাম হয়ে যেত রথী-মহারথী ব্যাটসম্যানদের। মুস্তাফিজের গল্পটাও এর চেয়ে কম রোমাঞ্চের নয়।
 
বছর পাঁচেক আগেও মূল ক্রিকেট বলটা ছুঁয়ে দেখা হয়নি মুস্তাফিজের। তারও আগে একজন ব্যাটসম্যান হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ থানার তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্মানো চার ভাইয়ের মধ্যে ছোট মুস্তাফিজ।
 
বয়স তখন ১৪ কিংবা ১৫ হবে। তেঁতুলিয়া গ্রামে টেনিস বলের টুর্নামেন্টে মুস্তাফিজের বড় ভাই মাহফুজুর রহমান ছাড়া অন্য তিন ভাই ছিলেন নিয়মিত মুখ। বড় ভাইও আসলে খেলাটা ছেড়েছিলেন চাকরির কারণে। সেজো ভাই মোখলেসুর রহমান ছিলেন রাজাপুর আরপি সংঘের অধিনায়ক। প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের হাতে তুলোধুনো হচ্ছিলেন আরপি সংঘের বোলাররা। মোজো ভাই জাকির হোসেনের অস্বস্তি সত্ত্বেও মোখলেসুর বল তুলে দিলেন মুস্তাফিজের হাতে। তৃতীয় বলেই বোল্ড করলেন ব্যাটসম্যানকে। এরপর নিয়মিত টেনিস বলের টুর্নামেন্টে অংশ নিতেন মুস্তাফিজ। সব গ্রেটদের মতোই একদিন একজনের নজরে পড়ে গেলেন মুস্তাফিজ।
 
নিজের উঠে আসার গল্প এভাবে জানান মুস্তাফিজ, ‘আমার বাবা ওয়াসিম আকরামের বল দেখতে পছন্দ করতেন। সাঈদ আনোয়ার-মোহাম্মদ ইউসুফদের খেলা দেখতেন। আমি তখন তেমন ক্রিকেট খেলা দেখতাম না। কিন্তু বাবা আমাদের সকালবেলা ম্যাচ শুরু হলেই জাগাতেন। এভাবেই ক্রিকেট খেলা শুরু। আসলে আমি স্কুল মাঠে ফুটবলও খেলতাম। ক্রিকেট খেলতাম ফাইভ স্টার (টেনিস) বল দিয়ে। আমি একজন ব্যাটসম্যান ছিলাম। তবে বড় শট খেলতে পারতাম না। দীর্ঘ সময় ব্যাট করতে পারতাম। টুর্নামেন্টে এলাকার ভালো ক্রিকেটাররা খেলতে আসতেন। আমি তাদের বল করতাম। একজন ভালো ব্যাটসম্যান ছিলেন মিলন। তাকে বল করার পর তিনি আমার ভাইকে জানালেন আমি ভালো বল করি। তারপর তিনি আমাকে বললেন যে যখন সাতক্ষীরায় বয়সভিত্তিক ক্রিকেট শুরু হবে তখন ডাকবেন। আমি তখনও সাতক্ষীরা চিনতাম না। যখন বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট শুরু হলো তারা আমাকে ডাকলো। আমার দাঁত পরীক্ষা করলো। তারপর অনুর্ধ্ব-১৬ দলের নেটে ট্রায়াল দিলাম। তখনই প্রথমবারের মতো সত্যিকারের ক্রিকেট বল দেখেছিলাম। তারা ৫১ জনের মধ্যে ১৪ জনকে নির্বাচন করলো। আমি টিকে গেলাম।’
 
নিজের বাড়ি থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে সেজো ভাইয়ের বাইকে চড়ে প্রতিদিন সকালে অনুশীলনে আসতেন মুস্তাফিজ। অনূর্ধ্ব-১৬ জেলা টুর্নামেন্টে খেলার সময়ই স্বপ্ন দেখতে থাকেন জাতীয় দলের বোলার হওয়ার। মুস্তাফিজের স্মৃতিতে জেগে উঠে সে সময়কার কথা, ‘যখন আমি অনূর্ধ্ব-১৬ দলের হয়ে খেলতাম, তখন প্রয়াত শেখ সালাহউদ্দিন স্যার সব সময়ই আমার প্রিয় ছিল। স্যার একদিন মিরপুরে জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা অনুশীলনে কীভাবে বল করেন সেটা আমাদের দেখালেন। আমি তাদের দেখতাম আর ভাবতাম, আমি কখন ওখানে খেলব?’
 
জেলা টুর্নামেন্ট খেলার পর কিছুদিন খেলেন খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে। এরপর ২০১২ সালে ঢাকায় এসে শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট বোলিং স্টেডিয়ামে একটি ফাস্ট-বোলিং ক্যাম্পে ট্রায়াল দিলেন মুস্তাফিজ। সেখানেই কোচদের মনোযোগ আকর্ষণ করেন তিনি। এরপর অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে নিয়মিত নির্বাচিত হতে লাগলেন। ২০১৪ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ১৮.৪৪ গড়ে নয় উইকেট নেন।
 
এপ্রিল, ২০১৪ খুলনা বিভাগের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেকের পর মে মাসে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের ফাইনালে দ্বিতীয় ম্যাচ খেলার সময় ডাক আসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের জন্য বাংলাদেশ ‘এ’ দলে। অনেকে বিস্মিত হলেও প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ বলেছিলেন, ‘মুস্তাফিজ দেশের সেরা অনূর্ধ্ব-১৯ বোলার। এটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যে সে ম্যাচ খেলবে। বরং তার সম্ভাবনা আছে। বাঁ হাতের সিম বোলিংয়ে দারুণ বৈচিত্র্য আছে তার।’
 
সে বছর মে-জুনের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে অবশ্য কোরি রিচার্ডসের দলের বিরুদ্ধে কোন ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি মুস্তাফিজ। খুলনা বিভাগের হয়ে ন্যাশনাল ক্রিকেট লিগে দারুণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে ডাক পেয়ে যান পাকিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টি-টোয়েন্টি ম্যাচে। এরপর ডাক আসে  জুনে ভারতের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজেও। আর সেখানেই স্লোয়ার আর কাটারের মায়াজাল ছড়িয়ে বিশ্ব মঞ্চে আবির্ভাব মুস্তাফিজের।
 
কিংবদন্তি ফাস্ট বোলারদের মানসিকতাকে আত্মস্থ করেছিলেন প্রথম ওয়ানডে সিরিজেই। কিংবদন্তি জেফ থমসন সম্পর্কে হোল্ডিং বলেছিলেন, ‘থম্মো কখনই ব্যাটসম্যানকে গালি দিতেন না। একটা খারাপ বল করতো আর মাঠে পা ছুঁড়ে মারত। আর নিজেকেই গালি দিত।’ মুস্তাফিজও সেটা শিখেছিলেন ভারতের বিপক্ষে সিরিজেই। চির বিনীত কাটার মাস্টারের বক্তব্য এমন, ‘আমি স্লেজিং করি না। এটা পছন্দও করি না। বলই কথা বলবে মুস্তাফিজের হয়ে। ক্যামেরার সামনে কিছুটা লাজুক মুস্তাফিজ উইকেট পাওয়ার আনন্দে শিশুর মতো দু’হাতে তালি দিয়ে মায়াবি হাসিতে সতীর্থদের আলিঙ্গনে সিক্ত হবেন এটাই যেন নিয়ম। ব্যতিক্রম হয়নি টেস্ট অভিষেকেও। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে নিজের ১৪তম ওভারে হাশিম আমলা, জেপি ডুমিনি এবং কুইন্টন ডি কককে আউট কারার পর শেষদিকে টেম্বা বাবুমাকে তুলে নিয়ে হয়েছিলেন ম্যাচসেরা। প্রথমবারের মতো ওয়ানডে এবং টেস্ট দু’টি অভিষেকেই ম্যাচ সেরার পুরস্কার নেয়ার কৃতিত্ব দেখান মুস্তাফিজ। এরপর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে প্রথম বাংলাদেশি হিসাবে জায়গা করে নেন আইসিসির ওয়ানডে বর্ষসেরা দলে।
 
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচের সময় ইনজুরির কারণে এশিয়া কাপ থেকে ছিটকে পড়ার পর ভারতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টিতেও পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলতে পারেননি। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া, ভারত এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে নিয়েছেন নয় উইকেট। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তার ৫-২২ বোলিং ফিগারই ছিল  আসরের সেরা।
 
প্রথমবারের মতো ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএ) খেলতে গিয়ে তো আসরের প্রধান বিজ্ঞাপন এখন মুস্তাফিজ। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে ছয় ম্যাচে নিয়েছেন সাত উইকেট। গুজরাট লায়ন্সের বিপক্ষে খেলার সময় বাংলাদেশি পেসারের বোলিং সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ধারাভাষ্যকার অ্যালান উইলকিন্স বলেন, ‘মুস্তাফিজকে যতবার দেখবেন, ততবার মুগ্ধ হবেন। প্রতিমুহূর্তে সে আরও দারুণ কিছু নিয়ে আপনার সামনে হাজির হবে। অনেকটা সের্গেই বুবকার মত। যিনি নিজের রেকর্ড প্রতিনিয়ত নিজেই ছাড়িয়ে যেতেন।’ পরের ম্যাচে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের বিপক্ষে চার ওভারে মাত্র নয় রানে দুই উইকেট নিয়ে যার প্রমাণ দিয়েছিলেন মুস্তাফিজ।