নদী আছে, পানি নেই

অর্ধশত বছর আগেও পঞ্চগড় জেলার নদীগুলো ছিল পানিতে টইটম্বুর। নদী কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য হতো। স্থানীয় জেলেরা ধরতো মাছ; কিন্তু কালের বিবর্তনে জেলার নদীগুলোর চিত্র পুরোই উল্টে গেছে। নদী আছে কিন্তু পানি নেই। কোথাও দুটোই আছে কিন্তু পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নেই। আবার কোথাও নদী নেই, পানিও নেই। নদীগুলো মরে খালে পরিণত হয়েছে। জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক সময়ের খরসে াতা মহানন্দা, করতোয়াসহ সব নদীই শুকিয়ে গেছে। অনেক নদীর বুকে জেগে উঠেছে বালুচর। পানিশূন্য এসব নদীতে চাষ করা হচ্ছে ইরি-বোরোসহ নানা সবজি ও ফসল।
 
জানা গছে, জেলা সদর, তেঁতুলিয়া, বোদা, দেবীগঞ্জ ও  আটোয়ারী উপজেলার ওপর দিয়ে ছোট-বড় ২৭টি নদী প্রবাহিত হয়। এর মধ্যে মহানন্দা, করতোয়া, ডাহুক, চাওয়াই, সেনুয়া, মরাতিস্তা, কুরুম, তালমা, যমুনা, ঘোড়ামারা, নাগরসহ বেশ কয়েকটি নদীর উত্পত্তিস্থল ভারতে; কিন্তু নদীগুলোর প্রবেশ মুখে ভারত ব্যারাজ, বাঁধ, স্লুইস গেট, রেগুলেটর, জলাধার, ফিডার ক্যানেল নির্মাণ করে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
 
সংশ্লিষ্টরা জানান, ভারত পঞ্চগড় জেলার ২২১ কিলোমিটার সীমান্তব্যাপী বেড়ী বাঁধ নির্মাণ করেছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে জেলার কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর। পানির স্বাভাবিক গতি প্রবাহ না থাকায় নদীগুলোর নাব্যতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এতে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরও নীচে নেমে যাচ্ছে। মাছ প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। পাখির বিচরণ ক্ষেত্র কমে আসছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় শত শত জেলে পরিবার মানবেতর জীবনযপন করছে। এসব নদ-নদীতে প্রয়োজনীয় পানি প্রবাহ না থাকায় আশপাশের ফসলের জমি অনাবাদি থেকে যাচ্ছে। 
 
পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত অধিকাংশ নদীর উত্পত্তিস্থল ভারতের জলপাইগুড়ি, সিকিম ও নেপালের হিমালয় পর্বত। ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে মহানন্দা নদীর উজানে ভারতের শিলিগুড়ির ফুলবাড়িতে মহানন্দা নদীতে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ করে ভারত। এর পরই খরসে াতা মহানন্দা নদীর বুকে পানির বদলে দেখা দেয় ধু-ধু বালুচর। একইভাবে খরসে াতা করতোয়া, ডাহুক, চাওয়াই, সেনুয়া, কুরুম, তালমা, ঘোড়ামারা, যমুনা, মরাতিস্তা নদীতেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাঁধ, স্লুইস গেট ও রেগুলেটর নির্মাণ করেছে।  প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে ফিডার ক্যানেলের সাহায্যে এসব নদীর পানির স্বাভাবিক গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে ভারত পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যের মরু কবলিত এলাকায় নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে তারা এসব পানি সেচ কাজে ব্যবহার করছে। অবশ্য বর্ষা মৌসুমে ভারত মাঝে মধ্যে এসব ব্যারাজ, বাঁধ, স্লুইস গেট খুলে দেয়। ছেড়ে দেয়া অতিরিক্ত পানি কোনো কোনো সময় জেলায় বন্যার সৃষ্টি করে। ফলে উজানের পানি আর অতিবৃষ্টিতে মাঝে মধ্যে করতোয়া নদী পূর্ণ যৌবন লাভ করে।
 
সদর উপজেলার সাতমেরা    এলাকার করতোয়া নদীর পাড়ের বৃদ্ধ আতিয়ার রহমান (৭০) নদীর বেঁচে থাকা ও মরে যাওয়া কেমন তা দেখেছেন। তিনি জানান, আগে নদীতে যেমন পানি ছিল, তেমনি ছিল বড় বড় নৌকা। আজ নদীও নেই, পানিও নেই, মাছও নেই। চোখের সামনেই করতোয়া নদীর মৃত্যু হলো। 
 
জেলার ধাক্কামারা এলাকার করতোয়া নদীর পাড়ে বসবাসকারী এক সময়ের জেলে জয়নুল (৬০) জানান, নদীর পাশেই আমাদের বাড়ি ছিল। নদীতে মাছ মেরে বাজারে বিক্রি করে সংসার চলতো। ধীরে ধীরে নদী শুকিয়ে গেল, মাছ মারাও বন্ধ হয়ে গেল। এখন নদীর বুকে ধান চাষ করছি। মাঝে মধ্যে ভ্যান চালাই। এভাবে কোনো মতে চলে যাচ্ছে সংসার।
 
পরিবেশবিদরা বলছেন, ইতিপূর্বে একাধিকবার অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অভিন্ন নদীগুলো সংশ্লি­ষ্ট সব দেশের সম্পদ হিসাবে গণ্য করতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। অথচ অভিন্ন নদীগুলোর প্রায় সবগুলোর পানি প্রবাহ ভারত একতরফাভাবে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। এ অঞ্চলের নদ-নদী দিয়ে প্রবাহিত পানির কত অংশ ভারত আর কত অংশ বাংলাদেশ ব্যবহার করবে তার একটি রূপরেখা থাকা আব্যশক। অথচ জয়েন্ট রিভার কমিশন (জেআরসি) এ বিষয়ে বাস্তবমুখী কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
 
জেলা পরিবেশ পরিষদের সভাপতি ও পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের প্রধান তৌহিদুল বারী বাবু বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারত পরামর্শ ছাড়াই অভিন্ন নদীতে বাঁধ নির্মাণ করেছে। ফলে নদীগুলোতে পানি প্রবাহ না থাকায় জেলার জীব বৈচিত্র্যসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
 
পরিবেশবিদ ও শিক্ষক শেখ সাজ্জাদ হোসেন জানান, নদ-নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। বালুচর জেগে উঠছে। দ্বি-পাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে নদীগুলোর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বজায় রাখা সম্ভব বলে তার অভিমত।
 
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ভূ-গর্ভস্থ পানি জেলার সেচের একমাত্র অবলম্বন; কিন্তু নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নেই নদীতে। ভূ-গর্ভস্থ পানি নীচে নেমে যাচ্ছে। এ কারণে বোরো চাষিদের একাধিকবার সেচ দিতে হচ্ছে।
 
জেলা মত্স্য কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসেন জানান, নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ না থাকায় মাছ বংশ বিস্তার করতে পারছে না। এছাড়া নদীর বুকে বোরো আবাদ করে কীটনাশক ব্যবহার করায় মাছের প্রজনন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
 
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম জানান, নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। নলকূপগুলোতেও তেমন পানি উঠছে না।
 
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রবীন্দ্র চন্দ্র সোম জানান, জেলার ২২টি নদীর নাব্যতা রক্ষায় ড্রেজিং করার জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে আমরা জাতীয় নদী কমিশনের কাছে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।