জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, বিশ্বের কাছে আজ আমরা একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি হিসাবে সম্মান ও সমীহ অর্জন করেছি। আমরা যদি শক্তি সঞ্চয় ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করতে পারি তবে জনজীবনের উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। যার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও পরিকল্পিত কর্মধারা প্রণয়ন।
তিনি গতকাল শনিবার পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়ায় এক অনুষ্ঠানে আরো বলেন, বাংলাদেশের সর্বক্ষেত্রে অলক্ষ্যে একটা বিরাট পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। যার অনেক কিছুই আমাদের কাছে আবার দৃশ্যমানও। আমাদের মন ও মানসিকতায় এক ধরনের নেতিবাচকতা সুপ্ত থাকায় যা অর্জন করতে পারিনি, তা বড় করে দেখি। সেখানেই হতাশা সৃষ্টি হয়। আমরা যদি শক্তি সঞ্চয় ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করতে না পারি তবে জনজীবনে ভোগান্তি বাড়ে। আর এর কারণ হচ্ছে সম্মিলিতভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে অসমর্থতা। তারপরও রাষ্ট্র পরিচালনায় দুইটি সরকার দীর্ঘ মেয়াদে বিভিন্ন সময় ক্ষমতায় থাকায় আজকে বাংলাদেশের সব দিকে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আশির দশকে তত্কালীন এরশাদ সরকার অনেক সফলতা দেখিয়েছে দীর্ঘ নয় বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতায় থাকার কারণে। এরশাদ সরকারের বড় সমস্যা ছিল অভ্যন্তরীণ সংকট আর যে কারণে বিদেশি সাহায্য-সহযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। শেখ হাসিনার সরকার দুই পর্বে দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন থাকতে পারছে বলে তিনটি পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার সুযোগ পেয়েছে। যার জন্য সুদূরপ্রসারী সফলতা অর্জন করার মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতির প্রচলন, বিকাশ ও সংহত করতে পারায় বিদেশের সাথে আমাদের দেশের একটি সেতুবন্ধ তৈরি হয়েছে। আনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের অগ্রাধিকার কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, বিদ্যুতায়ন ইত্যাদি। শিক্ষা বলতে আমরা বুঝি পুঁথিগত বিদ্যা নয়, যা জ্ঞানার্জনের সার্বিক পথকে সুনিশ্চিত করবে। আর যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাংলাদেশে তো বিপ্লব সাধিত হয়েছে। এ সব অর্জন সম্ভব হয়েছে সমন্বিত একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে, যা আশির দশকে সূচিত হয়ে পরবর্তীকালে যেমন অব্যহত থেকেছে বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার যাকে বেগবান তথা গতিশীল করেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে পণ্য চলাচল, শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি খাতে সৃষ্টি হয়েছে নতুন উদ্যম।
পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, এক সময় আমাদের দেশে বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তার ঘাটতি ছিল। এখন দেশে বাঙালিরা দেশি পুঁজি, স্বল্পপুঁজি, বিদেশি পুঁজি ইত্যাদি সকল ধরনের বিনিয়োগকে প্রয়োগ করে বাংলাদেশকে সফল উদ্যোক্তার দেশে পরিণত করেছে। যদি আমরা স্বাধীন না হতাম তাহলে এ উদ্যোগ বাংলাদেশে সফল হতো না। যদিও কেউ কেউ এ স্বাধীনতাকে তাচ্ছিল্য ভরে দেখেন। মন্ত্রী বলেন, বহির্বিশ্বে এখন আর আমরা ভিক্ষুকের জাতি নই। বিদেশিরা আমাদের সাথে এখন সম্মান ও সমীহ করে কথা বলেন। ঘাটতি কাটিয়ে উঠে খাদ্য উদ্বৃত্ত তথা রপ্তানিমুখী দেশে আমাদের উত্তরণের কথা শুনে তারা নতুন তথ্য পাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আমরা যখন বিদেশি ফোরামে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা নিরসনে কথা বলি এবং অর্থ সাহায্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আগ্রহ কম দেখাই তখন তারা অবাক হন আমাদের আত্মবিশ্বাস দেখে। জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বশেষ জাতিসংঘের সম্মেলনে বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসের চুক্তিতে আমরা স্বাক্ষর করেছি। বিদেশি সাহায্য দিক বা না দিক আমাদের নিজেদের আয়ে দেশকে পরিচালনার যোগ্যতা অর্জন করেছি বছরে ৩৩ হাজার কোটি টাকার জনগণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের অর্থে। দেশের বেশিরভাগ মানুষের পরোক্ষ কর আর ছোট-বড় শিল্প মালিকদের প্রত্যক্ষ করে আমাদের অর্থনীতি এখন অনেক সমৃদ্ধ। এ কথা জানতে আর সেমিনারে বক্তৃতা শুনতে যেতে হয় না। গ্রামের দিকে তাকালে তরুণ-তরুণী-শিশুদের পোষাক-পরিচ্ছদের পরিবর্তন এবং হাট-বাজারে টিভি-ফ্রিজ-এয়ারকন্ডিশনার শপ দেখে এর প্রমাণ মিলবে। যার বড় অংশ আমাদের প্রবাসীদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার বিনিয়োগের অবদানও। আজ আমাদের বিদেশি রিজার্ভ ২৮ বিলিয়ন ডলার এবং বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ। আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিগন্ত আজ সুবিস্তৃত। তার ছেলে-মেয়েরা যেমন দেশ-বিদেশে সুনামের সাথে প্রতিষ্ঠিত, জাতি গঠনে সক্রিয় তেমনি তার বোনের মেয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য। যা একজন সরকার প্রধান ও রাষ্ট্র নায়কের মনোবলকে প্রতিনিয়ত উজ্জীবিত করে, প্রণোদনা জোগায়। আমাদের এসব ইতিবাচক অর্জনকে ব্যবহার করে জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত এক সুরে, এক লয়ে কাজ করতে পারলে মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছানো সময়ের ব্যাপার মাত্র। মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রের যদি অর্থ না থাকে সম্পদ সৃষ্টি না হয় তার প্রভাব অবচেতন মনে পড়ে এবং মনে ও দেহে রোগ-শোক বৃদ্ধি পায়। মহান আল্লাহতালা বলেছেন, আমরা যদি পরিশ্রম করি তাহলে তার পুরস্কার তিনি দেন। এ কথা যেমন আমাদের ব্যক্তি ক্ষেত্রে, তেমনি প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি গতকাল দুপুুরে স্থানীয় মজিদা বেগম মহিলা কলেজের মানিক মিয়া পাবলিক লাইব্রেরি হলরুমে জেলা তথ্য অফিস ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে ‘সরকারের সাফল্য অর্জন ও উন্নয়ন ভাবনা বিষয়ে জনগণকে অবহিতকরণ এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করণের লক্ষ্যে’ এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। এখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যৌতুক, বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ, পরিবার-পরিকল্পনা, নারী ও শিশু উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, মাদক প্রতিরোধ, আত্ম কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন সামাজিক ইস্যু নিয়ে আলোকপাত করা হয়। ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জেলা তথ্য অফিসার মোঃ রিয়াদুল ইসলাম প্রমুখ। এ সময় মঞ্চে ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম তালুকদার উজ্জল, মজিদা বেগম মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মোশাররফ হোসেন মামুন, জেপি’র উপজেলা যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দারসহ ইউপি চেয়ারম্যানগণ। এর আগে উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে ইউএনও’র সভাপতিত্বে উপজেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটির মাসিক সভায় পরিবেশ ও বন মন্ত্রী বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি বলেন, জনগণ তথা কৃষকের উন্নয়নে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সকল সরকারি বরাদ্দের ব্যবহারের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা থাকা আবশ্যক। তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন চাহিদা এখন ব্যাপকভাবে পূরণ হওয়ায় তার বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণে স্থানীয় নেতৃত্ব ও সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। এখানে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুল হক মনি জোমাদ্দার ছাড়াও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম উজ্জল, ভাইস চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আসমা আক্তার, ইউপি চেয়ারম্যানদের মধ্যে তেলিখালীর শাহাদাত হোসেন, ধাওয়ার সিদ্দিকুর রহমান টুলু, নদমূলার শফিকুল কবির বাবুল, ভিটাবাড়িয়ার নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান খান এনামুল করিম, গৌরীপুরের মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরীসহ উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সকালে মন্ত্রী উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের ‘পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক’ ভবনের শুভ উদ্বোধন এবং দোয়া ও মোনাজাত করেন। এ ছাড়া তিনি পরিবেশ ও বন মন্ত্রীর ঐচ্ছিক তহবিল থেকে উপজেলার বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও দুস্থদের মাঝে সহায়তামূলক অর্থের চেক বিতরণ করেন। এরপর উপজেলা মত্স্য বিভাগের উদ্যোগে নদীতে বিভিন্ন জাতের মাছের পোনাও অবমুক্ত করেন। পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গতকাল বিকালে ভাণ্ডারিয়ার নিজ বাসভবন থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ খায়রুল আলম সেখ, পুলিশ সুপার মোঃ ওয়ালিদ হোসেন, বন বিভাগের বাগেরহাট ও সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের ডিএফও মোঃ সাইদুল ইসলাম তাকে বিদায় জানান।