শিক্ষকের এ অপমান মেনে নেয়া যায় না

 
শিক্ষককে কান ধরে উঠবসের ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ব্যথিত হয়েছেন সমাজের সবশ্রেণির মানুষ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিক্ষুব্ধরা। ঢাকার শাহবাগে ছাত্র-শিক্ষক-সাংবাদিক-সাংস্কৃতিক কর্মীরা সংহতি সমাবেশ করেছেন। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলমত নির্বিশেষে বৃষ্টিতে ভিজে কান ধরে উঠবস করেছেন শিক্ষার্থীরা। শোবিজ জগতের তারকারাও কান ধরে উঠবসের মিছিলে যোগ দিয়েছেন। প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
 
নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের প্রতি সমব্যথী বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের এক বিবৃতিতে কান ধরে উঠবসের ঘটনাকে চূড়ান্ত অসভ্যতা, বর্বরতা ও বেআইনি বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আর দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা বলেছেন, এ অপমান মেনে নেওয়া যায় না। তারা বলেছেন, কানধরে উঠবস করেছেন শিক্ষক আর কান কাটা গেছে পুরো জাতির।
 
গত সোমবার এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। গতকাল এ ঘটনাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করার ঘটনাটি পেনাল কোড (দণ্ডবিধি) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
 
শিক্ষককে কান ধরে উঠবসের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিক ইত্তেফাককে বলেন, একজন শিক্ষককে এ ধরনের নির্যাতন ও শাস্তি দেওয়াকে আমি জঘন্য অপরাধ মনে করি। এটি দুঃখজনক ঘটনা। আশা করবো বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখবে।
 
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এমিরেটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে ইত্তেফাককে বলেন, শিক্ষার মান উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে একজন শিক্ষক। শিক্ষকরাই সমাজের সবচেয়ে সম্মানীত ব্যক্তি। অথচ শিক্ষককে এভাবে হেনস্তা করার মানে সবকিছুই অর্থহীন। এটা বড় রোগের লক্ষণ। শিক্ষককে কান ধরে উঠবসে প্রমাণ হয়, সমাজে শিক্ষকদের কোনো মর্যাদা নেই। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।
 
তিনি আরো বলেন, একজন সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে শিক্ষককে কানধরে উঠবস করানো চরম অপমান। বরং ওই সংসদের উচিত ছিল সবকিছুর আগে শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করার। কিন্তু তিনি তা না করে ছাত্র-শিক্ষক-সমাজের সবার সামনে শিক্ষককে অপমান-অপদস্ত করলেন। এটি শিক্ষার জন্য কোনো শুভবার্তা বহন করে না।
 
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, শিক্ষককে কানধরে উঠবস করানো– এমন বর্বরতা কোনো সভ্য সমাজে ঘটতে পারে বলে মনে হয় না। এটা আমাদের লজ্জা ও অপমানের বিষয়। বাংলাদেশে এমনিতে শিক্ষকের তেমন মর্যাদা নেই, ঠিকভাবে পয়সা দিতে পারি না, এই পরিস্থিতিতে এমন ঘটনা মেনে নেয়া যায় না। এই ঘটনার যদি কোনো প্রতিকার না হয়, তাহলে আমাদের মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, এই সমাজটা যে পচে গেছে, কোথাও কোনো বিবেক বোধ-বুদ্ধি কাজ করছে না, একজন শিক্ষককে সংসদ সদস্যের সামনে কানধরে উঠানো বসানোর জন্য এই সমাজটাকে ঘৃণা করা ছাড়া আমাদের আর কি করার আছে। যারা মানুষ গড়ার কারিগর তাদেরকে যদি এভাবে অসম্মান করি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে আর লেখাপড়ার দরকার নেই। একজন শিক্ষকের আত্মমর্যাদা হলো বড় সম্পদ, সেই আত্মমর্যাদা বোধটুকু যদি এভাবে জঘন্য প্রক্রিয়ায় ছিনিয়ে নেয়া হয়, তাহলে এই সমাজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা আজ দৃশ্যমান।
 
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ইত্তেফাককে বলেন, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। সামাজিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষককে সম্মানিত অবস্থানে না রাখলে কোনো সমাজ টেকে না। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষকদের নানাভাবে হয়রানি-নির্যাতন-অপমান-অপদস্ত করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ শুধু সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সকল রাজনৈতিক দলকেও এগিয়ে আসতে হবে।
 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহম্মদ মিজানউদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, আমি একজন শিক্ষক হিসাবে এই ঘটনায় ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করছি। শিক্ষকের অবমাননা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া উচিত। 
 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল্লাহ্ বলেন, ‘যেকোনো শিক্ষকের সম্মানই আমরা মনে করি শিক্ষক সমাজের সম্মান, সারাদেশের শিক্ষকদের সম্মান। মিডিয়ার মাধ্যমে যেভাবে আমরা অর্থাত্ জাতি দেখল, তাতে একজন শিক্ষক হিসেবে আমি এবং শিক্ষক সমাজ অপমাণিত বোধ করছি। এর যথাবিহিত ব্যবস্থা হওয়া দরকার বলে মনে করছি।’
 
শ্রেণিকক্ষে ‘ধর্মীয় কটূক্তির’ অভিযোগে গত শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে মারধর ও কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনা ঘটে। এসময় স্থানীয় জাতীয় পার্টি-জাপার সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম ওসমান ও স্থানীয় স্কুলের ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তবে প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির দ্বন্দ্বের জেরে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। গতকাল বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফারুকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে ওই শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।