কাউন্সিল শেষ হওয়ার পর দুই মাস অতিক্রান্ত হলেও বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা নিয়ে অনিশ্চয়তার আবর্ত কাটছে না। এই বিলম্বের প্রেক্ষাপটে দলের তৃণমূল ও কেন্দ্রীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে বাড়ছে হতাশা, বিভাজন ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল। বিব্রতকর পরিস্থিতি পার করছেন দলের নেতারা। কমিটি কবে হবে? মাঠ কর্মীদের এমন প্রশ্নের জবাব দিতে তারা যেমন জেরবার হচ্ছেন, আবার নিজেরাও পদ-পদবী ভাগ্য নিয়ে আছেন অস্থিরতায়। পদোন্নতি না ‘পদ অবনতি’ হবে সেই চিন্তায় কাটছে প্রহর। তবে তারা বসে নেই। অনেকেই দৌড়ঝাঁপ করছেন দলের সিনিয়র নেতাদের কাছে। অনেকে আবার কথিত ’গুলশান সিন্ডিকেট’কে তোয়াজ করে চলছেন প্রত্যাশিত পদ পেতে। কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এ অবধি চার ধাপে মহাসচিব, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, কোষাধ্যক্ষ, যুগ্ম মহাসচিব এবং সাংগঠনিক পদে ৪২ জনের পদ ঘোষণার পর আটকে গেছে পূর্ণাঙ্গ কমিটি।
জানা যায়, সর্বশেষ দুই ধাপের ঘোষিত কমিটির কয়েকটি পদ এমন কিছু নেতাকে দেয়া হয়েছে যা নিয়ে চতুর্মুখী বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন মিডিয়ায় প্রকাশ হতে থাকে পদ বাণিজ্য,আসন্ন কমিটিতে পদ দেয়ার নামে লেনদেনের অনেক প্রামাণ্য খবর। যেখানে হাইকমান্ডের পরীক্ষিত, দক্ষ, যোগ্যতাসম্পন্নদের সমন্বয়ে নতুন কমিটি করার পরিকল্পনা আংশিক ভেস্তে যাওয়ার মুখে পড়ে। এনিয়ে দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা হয়। অধিকাংশ নেতা বেগম জিয়ার কাছে ঘোষিত কমিটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পদ বাণিজ্য নিয়ে তারা তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি করেন। বেগম জিয়া এ বিষয়ে সতর্ক আছেন বলে তাদের জানান। পরে তিনি নিজেই কমিটি করার ক্ষেত্রে আরো মনোযোগী হওয়ার কথা বলেন। এতে কমিটি গঠনে ধীরগতি চলে আসে। লক্ষ্য রাখা হচ্ছে মূলত: পদ বাণিজ্য, দলীয় ও সরকারি ’ষড়যন্ত্র’ ঠেকানো।
দলের স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানান, কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে পদ-পদবী পাওয়া নিয়ে নেতাদের মধ্যে লবিং-তদবিরের পাশাপাশি কোন্দলও তৈরি হয়েছে। আসন্ন নতুন কমিটিতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে সক্রিয় বিএনপির বিবদমান কয়েকটি অংশ। সুযোগমতো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করারও চেষ্টা চলছে। নির্বাহী কমিটি আংশিক ঘোষণা করার পর দ্বন্দ্বের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। ঘোষিত আংশিক কমিটিতে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী এবং ত্যাগ-যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধরা জায়গা পাওয়ায় পোড় খাওয়া অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। পাশাপাশি অনেক সিনিয়র নেতা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন নিজেদের ভবিষ্যত্ নিয়ে। কারণ কাকে কিভাবে মূল্যায়ন করা হবে তার কোন মাপকাঠি পাওয়া যায়নি আংশিক ঘোষিত কমিটির ক্ষেত্রে।
এই পরিস্থিতিতে সারাদেশের থানায় জেলায় দলের চলমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়াও থেমে গেছে।
সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নেতাদের মন নেই। কাউন্সিলের পর থেকে জেলা কমিটি ও উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড কমিটি পুনর্গঠন বন্ধ। নেতাদের প্রায় সবাই নতুন কমিটিতে স্থান পান কি না নিশ্চিত হয়েই মাঠপর্যায়ে সম্মেলন, সাংগঠনিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়াতে চাচ্ছেন। অনেক নেতা অপেক্ষায় আছেন কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাদের রাখা হয়েছে কি না, তা দেখার জন্য। কেন্দ্রীয় কমিটিতে নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরই তারা জেলা, মহানগর, উপজেলা কমিটি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে নতুন কমিটি গঠনে উদ্যোগী হতে চান। তার আগে কাউন্সিল করে জেলা, উপজেলা, মহানগর পর্যায়ে সাংগঠনিক অবস্থান হাতছাড়া করতে রাজি নন তারা।
এদিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, স্থায়ী কমিটি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলসহ দলের সব স্তরের কমিটি চূড়ান্ত করেছেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। চলতি মাসের যে কোনো দিন এ কমিটিগুলো ঘোষণা করা হতে পারে। রমজানের আগেও ঘোষণা দেয়া হতে পারে। সমপ্রতি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত্ করে এমন কথাই জানিয়েছেন বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, চলতি মাসের যে কোনো দিন কমিটি ঘোষণা হতে পারে। তবে কমিটিগুলোর সব একইসময়ে নাকি পর্যায়ক্রমে ঘোষিত হবে, এ সম্পর্কে জানাতে পারেননি তিনি।
এদিকে দলের অঙ্গ সংগঠন যুবদল এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে কমিটির শীর্ষ পদগুলোর তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। বেগম জিয়া নিজেই এই তালিকা করেছেন বলে জানা গেছে।