সিগারেটের করারোপের জন্য ব্যবহৃত মূল্যস্তর প্রথা তুলে দেয়া সহ বাজেটে সব ধরনের সিগারেটের উপর একই হারে অর্থাৎ খুচরা মূল্যের ৭০ শতাংশ সমপরিমাণ সুনির্দিষ্ট এক্সাইজ ট্যাক্স আরোপের দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন তামাক বিরোধী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এছাড়াও বিড়ির উপর খুচরা মূল্যের ৪০ শতাংশ, জর্দা এবং গুলের উপর খুচরা মূল্যের ৭০ শতাংশ সুনির্দিষ্ট এক্সাইজ ট্যাক্স আরোপসহ খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহতকরণে তামাকের ওপর বিদ্যমান রপ্তানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাবও করেছেন তারা।
এ ব্যাপারে গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, 'কার্যকরভাবে করারোপের মাধ্যমে তামাকের দাম বাড়ালে তামাক ব্যবহার সন্তোষজনক হারে হ্রাস পায়।'
তিনি এ সংক্রান্ত একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করে বলেন, 'গবেষণায় দেখা গেছে, করারোপের ফলে তামাকের প্রকৃত মূল্য ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে নিম্ন ও মাঝারি আয়ের লোকজনের মধ্যে তামাকের ব্যবহার ৮ শতাংশ হ্রাস পায়, যা জনস্বাস্থ্যের নিরিখে প্রশংসনীয় সূচক হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু বাংলাদেশে তামাক কর বিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কার্যকর করারোপের অভাবে এখানে তামাকপণ্যের প্রকৃত মূল্য বৃদ্ধি পায়নি। উল্টো সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে তামাকের দাম সস্তা থেকে সস্তাতর হয়েছে।'
ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস (সিটিএফকে) এর কনসালটেন্ট শরিফুল আলম বলেন, 'বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অন্তত তিনটি কারণে তামাকপণ্যে কার্যকরভাবে করারোপ করা জরুরি। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে তামাকপণ্য দিন দিন সস্তা থেকে সস্তাতর হচ্ছে। ফলে এর ব্যবহার ও ব্যবহারজনিত ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি পাচ্ছে যা রোধ করা জরুরি।'
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৪ সালের তথ্যমতে, 'পৃথিবীতে যেসব দেশে সিগারেটের মূল্য অত্যন্ত কম বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। এক্ষেত্রে নেপাল ও মায়ানমার এর পরই বাংলাদেশের অবস্থান।ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস (সিটিএফকে) এর ২০১৬ সালে প্রকাশিত এক তথ্যচিত্রে দেখা গেছে, ২০০৮-০৯ সালে ৫০০০ শলাকা বিড়ি কিনতে যেখানে মাথাপিছু জিডিপি'র ১.৮২ শতাংশ ব্যয় হতো সেখানে ২০১৩-১৪ সালে একই পরিমাণ বিড়ি কিনতে ব্যয় হয়েছে ১.৩৪ শতাংশ অর্থাৎ বিড়ির প্রকৃত মূল্য কমে গেছে।'
জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবাতে অনুষ্ঠিত 'উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন' শীর্ষক বিশ্ব সম্মেলনে তামাক করকে রাজস্ব আহরণের একটি কার্যকর ও সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, তামাকের ওপর বর্ধিত ও কার্যকরভাবে করারোপ করলে তামাকের ব্যবহার হ্রাস পায় এবং রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পায়। ফিলিপাইন, তুরস্ক, মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯৯৩ থেকে ২০০৯ সময়কালে সিগারেটের প্রকৃতমূল্য ৩২ শতাংশ থেকে ৫২ শতাংশে বৃদ্ধি করা হয়েছে ফলে সেখানে একদিকে প্রাপ্ত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মাঝে মাথাপিছু দিনপ্রতি সিগারেট সেবনের পরিমাণ ৪টি থেকে কমে ২টিতে নেমে এসেছে অন্যদিকে এসময়ে সরকারের রাজস্ব আয় ৯ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গবেষনা প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা মনে করে, উপরোক্ত প্রস্তাবনা মেনে যদি বাংলাদেশে একই হারে সুনির্দিষ্ট সিগারেট এক্সাইজ ট্যাক্স আরোপ করা হয় যার পরিমাণ খুচরা মূল্যের ৭০ভাগ এবং বিদ্যমান একাধিক মূল্যস্তরভিত্তিক এড-ভ্যালোরেম কর কাঠামো প্রথা বাতিল করা হয়, তাহলে: প্রায় ৭০ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী সিগারেট সেবন ছেড়ে দেবেন। ৭০ লক্ষেরও অধিক তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত হবে; ধূমপানের কারণে সংগঠিত প্রায় ৬০ লক্ষ অকাল মৃত্যু রোধ করা যাবে; এবং সরকার অতিরিক্ত ১,৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করবে।