৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও রিমান্ড প্রশ্নে হাইকোর্টের রায় বহাল

বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার ও পুলিশি রিমান্ড প্রশ্নে ১৩ বছর আগে দেওয়া হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায় বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ গতকাল মঙ্গলবার সরকারের আপিল খারিজ করে এই রায় দেয়। তবে প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন, হাইকোর্টের রায়ের কিছু সংশোধনী দেয়া হবে।
 
৫৪ ধারার অপব্যবহার চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়েরকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষের আইনজীবী ড. কামাল হোসেন আপিল বিভাগের রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, মনে হচ্ছে উনবিংশ শতাব্দী থেকে আমরা একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশ করছি। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, পৃথিবীর কোথাও সাদা পোশাকে কাউকে গ্রেফতার করা হয় না। সাদা পোশাকে গ্রেফতার করা নিয়ে আমাদের দেশে নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। শত্রুতাবশত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে গায়েব করার ঘটনাও রয়েছে। আশা করি, আপিল বিভাগের এই রায়ের মাধ্যমে এটা বন্ধ হবে।
 
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মান্য করতে পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এও বলেছেন, কেউ যদি নির্দেশনা অমান্য করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
 
গতকাল সকালে আপিল বিভাগ ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা অনুযায়ী বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার এবং ১৬৭ ধারায় পুলিশ রিমান্ড প্রশ্নে রাষ্ট্রের আপিল খারিজ করে দেয়। এটি ছিল দিনের শুনানির কার্যতালিকার ২ নম্বর ক্রমিকে। দুই লাইনের একটি আদেশ ঘোষণা দিয়ে আপিল বিভাগ বলেছে,      ‘আপিল খারিজ করা হল। আমরা কিছু সংশোধনীসহ একটি নীতিমালা ঠিক করে দেব।’
 
যা ছিলো হাইকোর্টের রায়ে:
 
আদালত থেকে বেরিয়ে রিট আবেদনকারী পক্ষের অন্যতম আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশনাগুলো বহাল থাকছে। তা মানার ক্ষেত্রে সরকার ও পুলিশের উপর এক ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হল। ১৮ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটল।’ প্রসঙ্গত হাইকোর্টের রায়ে ১৫ দফা নির্দেশনা ও সাতটি সুপারিশ করা হয়েছিল। নির্দেশনাগুলো হল: ক. আটকাদেশ (ডিটেনশন) দেয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করতে পারবে না। খ. কাউকে গ্রেফতার করার সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে। গ. গ্রেফতারের কারণ একটি পৃথক নথিতে পুলিশকে লিখতে হবে। ঘ. গ্রেফতারকৃতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলে তার কারণ লিখে তাকে হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য নিয়ে ডাক্তারি সনদ আনবে পুলিশ। ঙ. গ্রেফতারের তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারকৃতকে এর কারণ জানাতে হবে। চ. বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য স্থান থেকে গ্রেফতারকৃতর নিকটাত্মীয়কে এক ঘণ্টার মধ্যে টেলিফোন বা বিশেষ বার্তাবাহক মারফত বিষয়টি জানাতে হবে। ছ. গ্রেফতারকৃতকে তার পছন্দসই আইনজীবী ও নিকটাত্মীয়র সঙ্গে পরামর্শ করতে দিতে হবে। জ. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের (রিমান্ড) প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে কারাগারের অভ্যন্তরে কাচ নির্মিত বিশেষ কক্ষে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। কক্ষের বাইরে তার আইনজীবী ও নিকটাত্মীয় থাকতে পারবেন। ঝ. কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া না গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে সর্বোচ্চ তিন দিন পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত কারণ থাকতে হবে। ঞ. জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ওই ব্যক্তির ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে। ট. পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করবেন। বোর্ড যদি বলে ওই ব্যক্তির ওপর নির্যাতন করা হয়েছে তাহলে পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং তাকে দণ্ডবিধির ৩৩০ ধারায় অভিযুক্ত করা হবে। ঠ. পুলিশ হেফাজতে বা কারাগারে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে হবে। ড. পুলিশ বা কারা হেফাজতে কেউ মারা গেলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে তা তদন্তের ব্যবস্থা করবেন। মৃত ব্যক্তির ময়নাতদন্ত করা হবে। ময়নাতদন্তে বা তদন্তে যদি মনে হয় ওই ব্যক্তি কারা বা পুলিশ হেফাজতে মারা গেছে তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট মৃত ব্যক্তির আত্মীয়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তা তদন্তের নির্দেশ দেবেন।
 
আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া:
 
আপিল বিভাগের আদেশের পর রিট আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনাসূমহ কখনো স্থগিত করেনি আপিল বিভাগ। সরকারের আপিল খারিজ হওয়ার পর নির্দেশনাগুলো প্রতিপালন করা রাষ্ট্রীয় কর্তব্য। আইনের শাসন রক্ষার জন্যই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনাগুলো মেনে চলতে হবে।
 
রিট আবেদনকারী পক্ষের আরেক আইনজীবী ইদ্রিসুর রহমান বলেন, অন্য একটি মামলায় আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩৯ এবং ৪৩৯ ধারা পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তা সংশোধনের পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু ৩৩ বছরেও এই রায় বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে  আদালত দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, এটা একটি খারাপ অভিজ্ঞতা।
 
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, সাদা পোশাকে যারা (গ্রেফতার) করবে, তাদের কাজ হবে আসামিকে অনুসরণ করা, গতিবিধি লক্ষ্য করা, তাকে গ্রেফতার করার ব্যাপারে নিশ্চয় পরিচয় দেওয়া উচিত। আমার মনে হয় না নিজেদের পরিচয় না দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কাউকে গ্রেফতার করতে যায়। সাদা পোশাকের কাজ হচ্ছে গতিবিধি ও গোয়েন্দার কাজে নিয়োজিত থাকা, যখন গ্রেফতারের প্রসঙ্গ আসবে তখন পরিচয় দেওয়ার বিষয়টা আসবে।
 
মাহবুবে আলম বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ে কিছু সংশোধনী আনবে। এখন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আপিল বিভাগ যে রায় দেবেন বা যে সমস্ত নির্দেশনা দিবেন তার আলোকে সরকার পদক্ষেপ নিবে।
 
তিনি বলেন, আশা করি আদালত বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করবেন। আদালতের মূল উদ্বেগ হচ্ছে যেন মানবাধিকার লঙ্ঘিত না হয়।
 
যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই মামলা
 
১৯৯৮ সালে ডিবি পুলিশ ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকা থেকে ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্র শামীম রেজা রুবেলকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে। পরে পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় রুবেল মারা যান। পুলিশ হেফাজতে রুবেলের মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)সহ কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের রিট আবেদন দায়ের করে। ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল বিচারপতি মো. হামিদুল হকের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও রিমান্ড সংক্রান্ত ১৬৭ ধারার বিধান ৬ মাসের মধ্যে সংশোধনে এক যুগান্তকারী রায় দেন।