বারবার স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে কৃষকদের। অনাকাঙ্খিত দুর্দশায় পড়ছেন তারা। ধার-দেনা করে ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলিয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করলেও নিজেদের ভাগ্য ফিরছে না তাদের। উল্টো মহাজনের দেনার বোঝা ভারি হচ্ছে। লোকসান গুনতে গুনতে এখন অস্তিত্ব সংকটে অধিকাংশ কৃষক। ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তাদের এই দুর্দশা। চলতি বোরো মৌসুমেও ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না তারা। ফসল বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, উঠছে না উত্পাদন খরচও। আর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কমছে বোরো চাষ।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রতি মণ মিনিকেট বেচাকেনা হচ্ছে ৬৫০ থেকে ৭২০ টাকা, ব্রিধান-২৮: ৫৫০ থেকে ৬২০ টাকা, ব্রিধান-২৯: ৫০০ থেকে ৫২০ টাকা, কাজল লতা ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা, হাইব্রিড ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে কিন্তু প্রতি মণ ধানের উত্পাদন খরচ হয়েছে এরচেয়ে বেশি। সরকার প্রতি কেজি ধান ২৩ টাকা দরে কিনলেও এর সুফল পাচ্ছে না কৃষক। প্রথমত: উত্পাদনের তুলনায় সংগৃহীত ধানের পরিমাণ খুবই কম। দ্বিতীয়ত: মধ্যস্বত্ব ভোগীদের দৌরাত্ম্যে সরকারের গুদামে ধান দেওয়ার সুযোগ কৃষক পায় না বললেই চলে।
সম্প্রতি দিনাজপুর ও সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য উঠে এসেছে। অনেকটা ক্ষোভ নিয়েই দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার কৃষক বলরাম দাস বলেন, আমরা কৃষকেরা একটুও ভালো নেই। যে ফসল আবাদ করি, তাতে শুধু লোকসানই হয়।
দিনাজপুর অঞ্চলে এক বিঘা জমিতে বোরো আবাদে এ বছর খরচ হয়েছে ১২ হাজার টাকার উপরে। এতে প্রতি বিঘা জমির ধান উত্পাদনে ২ হাজার টাকারও বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে। এরসঙ্গে কৃষকের নিজের পারিশ্রমিক যোগ করলে লোকসানের পরিমাণ আরো বাড়বে। অথচ অনেক আশা নিয়ে চড়া সুদে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ধান চাষ করেছেন কৃষক।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের সিমলা সাহাপাড়া গ্রামের কৃষক তপন কুমার সাহা জানান, তিনি এবার ৪ বিঘা জমিতে করেছেন ব্রিধান- ২৮ এর চাষ। এরমধ্যে মাত্র ৫৫ শতক জমি তার নিজস্ব। আর সব বর্গা হিসেবে চাষ করেছেন। গড়ে বিঘা প্রতি ফলন হয়েছে ১৮ মণ ধান। ৪ বিঘা জমিতে মোট ফলন হয়েছে ৭২ মণ ধান। ৫৫০ টাকা হারে এর মূল্য দাঁড়ায় ৩৯ হাজার ৬০০ টাকা। চাষাবাদে মোট খরচ হয়েছে ৩৬ হাজার ৮০ টাকা। ৪ মাস নিরবচ্ছিন্ন শ্রম দিয়েছেন তিনি। তার পারিশ্রমিক প্রতিদিন ৩০০ টাকা হারে ধরলে মোট পারিশ্রমিক দাঁড়ায় ৩৬ হাজার টাকা। মোট খরচের ঘরে যোগ করলে খরচের অঙ্ক হচ্ছে ৭২ হাজার ৮০ টাকা। ফলে শুধু বোরো মৌসুমেই তার লোকসান হয়েছে ৩২ হাজার ৪৮০ টাকা।
রায়গঞ্জ উপজেলার সিমলা গ্রামের কৃষক আব্দুস সাত্তার বলেন, সরকার ধানের যে সংগ্রহ মূল্য ঘোষণা করেছে তা পেলে হয়তো এতটা ক্ষতি হত না। কিন্তু কয়জন কৃষক সরকারি গুদামে ধান দিতে পারবে? ওসি এলএসডি জয়নাল আবেদীন জানান, প্রথম দফায় রায়গঞ্জে ৩ হাজার ৩ টন ধান সংগ্রহ করা হবে। প্রায় ৬ হাজার কৃষকের নিকট থেকে এবার ধান সংগ্রহ করা যাবে। অথচ শুধু এই উপজেলাতেই কার্ডধারী কৃষককের সংখ্যা প্রায় ৫৭ হাজার বলে জানান উপজেলা কৃষি অফিসার এনামুল হক।
এ প্রসঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ) ইলাহী দাদ খান ইত্তেফাককে বলেন, কৃষক যাতে ধানের ন্যায্যমূল্য পান সেজন্য এবার সরকার ধান সংগ্রহের উপর গুরুত্ব দিয়েছে। গত মৌসুমে মাত্র ১ লাখ টন বোরো ধান সংগ্রহ করা হলেও এবার ৭ লাখ টন সংগ্রহ করা হবে। এ ছাড়া এবার ধানের সংগ্রহ মূল্য বাড়িয়ে ২৩ টাকা কেজি দরে নির্ধারণ করা হয়েছে।
ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কমছে বোরো চাষ
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)- এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় বোরো চাষ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। ‘খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার ওপর ধানের জমি কমে যাওয়ার কারণ বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এই জরিপ প্রতিবেদনটি দেশের ১১টি জেলার বোরো ধান চাষ নিয়ে করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর ৪৮ দশমিক ৪৬ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। আর উত্পাদন হয়েছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিক টন চাল। এ বছর বোরো চাষ হয়েছে ৪৬ দশমিক ৬১ লাখ হেক্টর জমিতে। এতে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্র্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক গোলাম মোস্তফা জানান, শস্যভাণ্ডার বলে খ্যাত দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলায় এবার বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৫১ হেক্টর। এর মধ্যে চাষ হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩৭৬ হেক্টর। অর্থাত্ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম আবাদ হয়েছে ২৭৫ হেক্টর জমি। তিনি ইত্তেফাককে জানান, কৃষকেরা ধানের চেয়ে ভুট্টা চাষাবাদে বেশি ঝুঁকেছেন। কারণ ভুট্টায় লাভ বেশি।