ইউপি নির্বাচন শনিবার

‘বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণে নির্বাচনী এলাকা’

‘ভাড়াটিয়া বহিরাগত সন্ত্রাসী দ্বারা নির্বাচনী এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে নির্বাচনী এলাকা। প্রতিনিয়ত কর্মীদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে সরকার দলীয় প্রার্থীর নেতাকর্মীরা। ভোটের আগের রাতে বহিরাগতদের দিয়ে অর্ধেক ভোট ব্যালট ব্যাক্সে ভরে রাখবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে।’ 
 
পঞ্চম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন বরাবরে এই লিখিত অভিযোগ করেছেন চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার সহদেবপুর ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুস সামাদ আজাদ। 
 
তিনি ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দেয়ার নিশ্চয়তা চেয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে আবেদন করেছেন। ৫টি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে গত মঙ্গলবার আবেদন করার পর গত দুইদিনে বেশ কয়েকবার সহিংসতা হয়েছে ওই কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট এলাকায়। প্রার্থীদের এ ধরনের অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়েছে কমিশনে।
 
এ রকম বাস্তবতায় পঞ্চমধাপে শনিবার ৭২০টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইসির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের চেষ্টা করলেও নির্বাচনী এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
 
গত ১১ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইউপি নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ছয়টি ধাপে ২২০ জন চেয়ারম্যান পদে বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া সংঘাত-সহিংসতায় এ পর্যন্ত ১০১ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
 
শনিবার ভোটের দিন সুষ্ঠুভাবে ভোট দেয়া নিয়ে শঙ্কা আর উত্কণ্ঠা প্রকাশ করেছেন প্রার্থীরা। নির্বাচনী এলাকায় বহিরাগতদের আনাগোনা অনেকাংশ বেড়েছে বলে অভিযোগ প্রার্থীদের। নির্বাচনে বহিরাগতদের বিচরণ নিষিদ্ধ থাকলেও প্রশাসন থেকে সেই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে নেই কোনো উদ্যোগ।
 
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার লুটেরচর ইউপির স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী আলমগীর হোসেন তার এলাকায় ভোট লুটের আশঙ্কা প্রকাশ করে ইসির কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছেন। তার আশঙ্কা ওই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জনপ্রিয়তা না থাকার কারণে বহিরাগতদের দিয়ে জোর-জুলুম করে ভোট নেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। ইসির কাছে নরসিংদী জেলার আমদিয়া ইউপির চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মো. আবু সিদ্দিক মিয়া গতকাল এই আশঙ্কা প্রকাশ করে আবেদন করেন যে, তার নির্বাচনী এলাকার ৯টি ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ। এই কেন্দ্রগুলোতে জোর করে সিল মারাসহ যে কোনো গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। আবু সিদ্দিক মিয়া ইসিকে আরো লিখেছেন, ‘এ ইউপিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে এ নির্বাচন কলঙ্কময় ও নিন্দনীয় হিসেবে আখ্যায়িত হবে।’ নরসিংদী সদর উপজেলার হাজিপুর ইউপির আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী ইউসুফ খান পিন্টু তার এলাকার দুইজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে বলেছেন, তারা একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে কেন্দ্র দখল অথবা ভোটার উপস্থিতি কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করেছে। প্রায় বহিরাগতদের দিয়ে তারা অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে। সংখ্যালঘু ভোটারদের হুমকি দিচ্ছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।
 
নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বৈরাটি ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান এবং এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মুহাম্মদ আনিসুজ্জামান তালুকদারের অভিযোগ, গত ১১ মে মহিমা বাজারে দলীয় অফিসে নির্বাচনী সভা চলার সময় তার লোকজনের উপর হামলা হয় এবং এতে অনেকে মারাত্মকভাবে জখম হয়। হামলাকারীরা ওই অফিস ভাঙচুর করে এবং অফিসের বাইরে থাকা তিনটি সিএনজি অটোরিকশা, একটি মোটর সাইকেলও ভেঙে ফেলা হয়। হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি ইউপির আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মো. দিলাওর হোসেনের অভিযোগ, সেখানে নবীগঞ্জ থানার পুলিশ বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
 
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, প্রার্থীদের অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও ভোটারদের সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই কমিশনের পক্ষে শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
 
এদিকে ৭২০ ইউপিতে গতকাল মধ্যরাতে শেষ হয়েছে প্রার্থীদের সবধরনের প্রচার-প্রচারণা। গত বুধবার মধ্যরাত থেকেই মোটর সাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পঞ্চম ধাপে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছেন ৩ হাজার ২৫৪ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ১৫২৭ ও রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১৭২৭ জন। তবে এ ধাপেও ভোটের আগেই ৪২ ইউপিতে জয়ী হয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। এই ধাপে বিএনপির প্রার্থী নেই ১০০টি ইউপিতে।
 
মাঠে নেমেছে র্যাব-বিজিবি
 
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ৪৩টি জেলার সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে মাঠে নেমেছে র্যাব, বিজিবি, পুলিশ-আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য। টহল দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যরা। অপরাধের তাত্ক্ষণিক সাজা দিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের পাশাপাশি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরাও মাঠে রয়েছেন।
 
ইউপি নির্বাচন নিয়ে সংঘর্ষে ছয় জেলায় আহত হয়েছেন ৯১ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে চারজন, কুমিল্লার দাউদকান্দিতে চারজন ও যশোরে একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বাঁশখালীর চারজন ও যশোরে একজন মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। রাতে সর্বশেষ খবরে জানা যায়, দাউদকান্দিতে গুলিবিদ্ধ চারজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে। চাঁদপুরের কচুয়ায় সংঘর্ষের পর বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।