সংসার শুরুর আগের ধাপটিই হচ্ছে বিয়ে। এটি সামাজিক বন্ধন বা চুক্তি। সামাজিক জীবনে মানুষ স্থায়ীভাবে একজন জীবন-সঙ্গীকে গ্রহণ করার পূর্বে তাকে সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করতে হয় এবং সেটা মূলত সামাজিক কার্যপ্রণালি দ্বারাই সম্পন্ন হয়; এই সামাজিক কার্যপ্রণালির নামই হচ্ছে বিয়ে। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুসারে একটি পূর্ণাঙ্গ বিয়ের জন্য যে শর্তগুলো পূরণ করতে হয় তা হলো—
মুসলিম বিয়ে দেওয়ানি চুক্তি হওয়ায় তার শর্তানুসারে দুই পক্ষকেই প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের হতে হবে। আইন বিয়ের যোগ্যতা হিসেবে বয়স নির্ধারণ করে থাকে। বিয়ের জন্য ছেলে ও মেয়ের অবশ্যই স্বাধীন সম্মতি থাকতে হবে। সম্মতিহীন বিয়ে একটি বাতিলযোগ্য বিয়ে হবে।
দেনমোহর: দেনমোহর হলো মুসলিম বিয়ের অন্যতম শর্ত। বিয়েতে অবশ্যই দেনমোহর থাকতে হবে এবং তা অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। কোনো অবস্থায় তা মাফ হয় না, যদি না স্ত্রী স্বেচ্ছায় তা মাফ করে দেন। সমাজে প্রচলিত ধারণা আছে যে, মেয়ের তরফ থেকে তালাক প্রদান করলে দেনমোহর মেয়েটি পাবে না- এটা সম্পূণ ভ্রান্ত ধারণা। তালাক যে পক্ষ থেকেই হোক না কেন, দেনমোহর অবশ্যই মেয়েটি পাবে। এখানে উল্লেখ্য যে, স্বামী মারা গেলে তার রেখে যাওয়া সম্পদ বিক্রি করে বিধাব স্ত্রীকে দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে। দেনমোহর স্ত্রী’র কাছে স্বামীর ঋণস্বরূপ এবং স্ত্রীর মর্যাদার স্মারক। এটি স্ত্রী’র আইনগত অধিকার।
সাক্ষী: বিয়েতে দু’জন সুস্থ মস্তিষ্কের প্রাপ্তবয়ষ্ক সাক্ষী থাকতে হবে। অনেকের ধারণা, মুসলিম বিয়েতে সাক্ষী হিসেবে একজন পুরুষের সাক্ষী দু’জন নারী সাক্ষীর সমান। কিন্তু এটি একটি ভিত্তিহীন ধারণা। মুসলিম পরিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ বা মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯৭৪ বা অন্য কোনো আইনে এরূপ কোনো বিধান নেই। তা ছাড়া ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন অনুসারে সাক্ষী হিসেবে নারী ও পুরুষের মর্যাদা সমান। তাই একটি বৈধ বিয়ের জন্য দু’জন পুরুষ অথবা মহিলা যে কেউ সাক্ষী থাকতে পারেন।
নিবন্ধন: বিয়ের লিখিত প্রমাণ হচ্ছে- নিবন্ধন। উল্লেখ্য, বিয়ে নিবন্ধনের দায়িত্ব স্বামীর। স্বামী এই দায়িত্ব পালন না করলে দুই বছর পর্যন্ত বর্ধনযোগ্য মেয়াদের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা তিন হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবে। যে ক্ষেত্রে স্বয়ং নিকাহ্ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়, সে ক্ষেত্রে উক্ত বিয়ে তাত্ক্ষণাত্ নিবন্ধন করতে হবে। অন্যদিকে, মাওলানা বা হুজুর দ্বারা যদি বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়, সে ক্ষেত্রে বর বিয়ে অনুষ্ঠানের তারিখ থেকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিকাহ্ রেজিস্ট্রারের কাছে বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করবেন। নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন বিয়ের দিন করাই যুক্তিযুক্ত। বিয়ে অনুষ্ঠানের সাথে সাথেই রেজিস্ট্রি করানো উচিত। এতে করে পরে বাড়তি ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকা যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, নিকাহ রেজিস্ট্রার বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্রতি হাজার দেনমোহরে ১০ টাকা হারে ফি গ্রহণ করবেন। তবে সর্বনিম্ন ৫০ টাকা ও সর্বোচ্চ চার হাজার টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি হতে পারবে। বিয়ে রেজিস্ট্রেশন বাবদ ফিস স্বামীকে প্রদান করতে হবে। রেজিস্ট্রি করা নিকাহনামা ছাড়া বিয়ে প্রমাণ করা কঠিন। এসব কারণে প্রতিটি বিয়ে অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হয়। ১৯৭৪ সালের বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইনের ৩ নং ধারা অনুযায়ী বিয়ে রেজিস্ট্রি আবশ্যকীয় ঘোষণা করা হয়েছে এবং রেজিস্ট্রি করার এ দায়িত্ব স্বামীর। কাজী যদি ইচ্ছাকৃত কোনো ভুল করেন অথবা দায়িত্বে অবহেলা করেন অথবা নিকাহনামার ঘরগুলো ঠিকভাবে পূরণ না করেন, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জেলা প্রশাসক বা জেলা রেজিস্ট্রাির বরাবর অবেদন করা যাবে।
লেখক: আইনজীবী, ছবি: ইন্টারনেট