নৌকায় প্রকাশ্যে সিল, অস্ত্র নিয়ে কেন্দ্রে যুবলীগ নেতা

সরকারি দলের ক্যাডারদের জোরপূর্বক নৌকা প্রতীকে সিল মারা, প্রতিপক্ষের সমর্থকদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা আর প্রশাসনিক শিথিলতার মধ্য দিয়ে গতকাল শনিবার নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার দশটি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোর থেকে সব কিছুই ঠিকঠাক চললেও বেলা ১১টায় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে পাল্টে যায় পরিস্থিতি। ওই সময় ভোটাররা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকরা কেন্দ্র দখল করে প্রকাশ্যে ব্যালট পেপারে সিল মারা শুরু করে। ঘটনার প্রতিবাদ করলে তাদের হাতে লাঞ্ছিত হন বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকরা। শুধু তাই নয়, সরকার দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে সিল মারার উত্সবে মেতে উঠলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা  গেছে। 
 
ভোট গ্রহণের শেষ দিকে বৈদ্যের বাজার ইউনিয়নের একটি কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য রুবায়েত হোসেন শান্তকে পুলিশ আটক করে। কিন্তু পিস্তলটি বৈধ হওয়ায় পুলিশ তাকে ছেড়ে দিলেও অস্ত্রটি নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেয়। বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে সোনারগাঁও থানার ওসি শাহ মঞ্জুর কাদের বলেন, আচরণবিধি অনুযায়ী নির্বাচনের দিন কেউ বৈধ অস্ত্রও বহন করতে পারেন না।
 
এদিকে ভোট কারচুপি, জাল ভোট প্রদান ও ভোটারদের ভোট আগে থেকেই দিয়ে দেয়ার অভিযোগ এনে তিনটি ইউনিয়নের বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীরা দুপুরের দিকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এরা হলেন:পিরোজপুর ইউনিয়নের রফিকুল ইসলাম, সাদিপুর ইউনিয়নের কামরুজ্জামান মাসুম এবং কাঁচপুর ইউনিয়নের ফজলুল হক।
 
বৃষ্টিকে কাজে লাগাল সরকার সমর্থিতরা:গতকাল সকালে পিরোজপুর ইউনিয়নের তাহেরপুর হাজী লাল মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সেখানে নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা প্রকাশ্যে ব্যালট বইয়ে সিল মারছেন। কেন্দ্রটির ৬ নম্বর মহিলা বুথে গিয়ে দেখা যায়, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার মাহাবুবুর রহমান নৌকা প্রতীকে সিল দেওয়া ব্যালট বই নিয়ে বসে আছেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই আমরা পরিস্থিতির শিকার।’ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আবদুস সাত্তার খবর পেয়ে ওই বুথে ছুটে গেলেও তিনি এ ব্যাপারে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। ওই সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ঢাকার এসি ল্যান্ড আসিফ ইকবালকে সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রটিতে প্রবেশ করেন সোনারগাঁও থানার ওসি (তদন্ত) হারুন অর রশিদ। উভয়কে সিল মারা ব্যালট বই দেখানোর পরেও তারা এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেননি। উল্টো বলেন, আপনারা ভোট নিতে থাকেন।
 
ওই কেন্দ্রের পাশের কেন্দ্র দুদঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ১১টায় ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পুরুষ মেম্বার প্রার্থীর একশ পাতার একটি ব্যালট বই প্রকাশ্যে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এ কারণে কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আবুল হোসেন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ২ ঘণ্টা ভোট গ্রহণ স্থগিত রাখেন।
 
সন্মান্দি ইউনিয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৩ জনই আওয়ামী লীগ নেতা। এ ইউনিয়নের নীলকান্দা নাজিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ঈমানেরকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা প্রকাশ্যে সিল মারেন। ওই সময় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এসময় ছবি তুলতে গিয়ে নাজিরপুর বিদ্যালয়ে সরকার সমর্থিতদের হাতে মহসিন নামে একটি জাতীয় পত্রিকার সাংবাদিক লাঞ্ছিত হন। এছাড়া এ ইউনিয়নের নানাখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা দখলের চেষ্টা করলে পুলিশ ৩ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
 
এদিকে জামপুর ইউনিয়নে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহ মো. হানিফের পক্ষে ব্যালটে প্রকাশ্যে সিল মারার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া আরো কয়েকটি ইউনিয়নে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ও কয়েকজন চেয়ারম্যান প্রার্থীর  পক্ষে জাতীয় পার্টির এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে অন্য চেয়ারম্যান প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন। এ ব্যাপারে সোনারগাঁওয়ের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জামপুরেই অবস্থান করছেন বলে স্বীকার করেন । 
 

প্রসঙ্গত, সোনারগাঁও উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টিতে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিল। এছাড়া ২টিতে জাতীয় পার্টির এবং ১০টিতেই আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিল।