৭২ খাতে কম খরচে বেশি লাভ

‘কস্ট-বেনিফিট’ (খরচ এবং সে তুলনায় প্রাপ্তি) পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের আসন্ন ২০১৬-’১৭ অর্থবছরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি অগ্রাধিকার তালিকা প্রণয়ন করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এই তালিকায় স্থান পেয়েছে ৭২টি খাত। 
 
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ৭২টি খাতে কম খরচে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি প্রাপ্তি বা লাভ হবে। তাদের দাবি, কোন খাতে প্রতি এক টাকা খরচে সবচেয়ে বেশি লাভ হবে-সেই হিসাব কষা হয়েছে। এছাড়া অগ্রাধিকার তালিকা প্রণয়নে বর্তমান সরকারের ‘ভিশন-২০২১’ ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের বিষয়টিও বিবেচনায় ছিল।
 
এই বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ছিলেন নরওয়ের অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ফিড ই. কিডল্যান্ড, যিনি ২০০৪ সালে অর্থনীতিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান। রয়েছেন বিশ্বের প্রথম সারির থিঙ্কট্যাংক কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের (সিসিসি) প্রেসিডেন্ট ড. বিয়ন লোমবোর্গ, টাইম ম্যাগাজিনের চোখে যিনি দুনিয়ার শীর্ষ প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন। এছাড়াও অগ্রাধিকার তালিকা প্রণয়নে সম্পৃক্ত ছিল বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক।
 
অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান পাওয়া ৭২টি খাত হলো- পদ্মা সেতু, ভ্যাট সংস্কার ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগ্রহ, যক্ষ্মার চিকিত্সা, সরকারি ব্যবস্থায় ই-প্রকিউরমেন্ট, পুষ্টি, ভূমি রেকর্ড ও দলিল ডিজিটালকরণ, রাজধানী ঢাকাকে স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য করা, মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, গর্ভবতীদের জন্য আয়রণ ও ফলিক এসিড নিশ্চিতকরণ, খর্বাকৃতি সমস্যা সমাধানে মনোসামাজিক অনুপ্রেরণা সৃষ্টি, শহুরে বস্তিতে বসবাস করা শিশুদের টিকা দান, উচ্চ রক্তচাপের চিকিত্সা, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার অভিবাসন পরিসেবা, পরিবেশবান্ধব ইটভাটা নির্মাণ, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে অন্যান্য সেবা প্রদান, আর্সেনিক সমস্যা সমাধানে ২০ শতাংশ নিকৃষ্টভাবে আক্রান্তদের জন্য বরাদ্দ রাখা, স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্বারা নবজাতকদের পারিবারিক যত্ন, জন্মনিয়ন্ত্রক প্রাপ্যতা, গোল্ডেন রাইস আর অ্যান্ড ডি, গ্রাম্য আদালত সম্প্রসারণ, তৈরি পোশাক কারখানার কমপ্লায়েন্স, গর্ভাবস্থায় সুষম আমিষের যোগান দেয়া, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বহু ওষুধ ব্যবহার প্রতিরোধী যক্ষ্মার চিকিত্সা, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের টিকাদান, দক্ষ ধাত্রীর মাধ্যমে জন্মদান নিশ্চিতকরণ, তামাকের ওপর কর বৃদ্ধি, কেরোসিনের বদলে মিশ্রিত ডিজেলের ব্যবহার, আরও বেশি শক্তি উত্পাদনে কয়লা আমদানি, গর্ভাবস্থায় ক্যালসিয়াম যোগান দেয়া, তৈরি পোশাক পল্লী বিশেষ অঞ্চল গঠন, শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি, গ্যাসফায়ার চুলা, অতি দরিদ্রদের জন্য স্নাতক ডিগ্রি কর্মসূচি, অভিবাসীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ, ব্রডব্যান্ডের সম্প্রসারণ ও ডায়াবেটিসের চিকিত্সা।
 
এছাড়াও অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে বাণিজ্য উদারীকরণ, কোরোসিনের পরিবর্তে গৃহস্থালী সৌরবিদ্যুত্, সামর্থ্য অনুযায়ী দল ও শিক্ষা, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, জৈববস্তু থেকে তৈরি রান্নার চুলা, হাত ধোয়া প্রচারণা, ঢাকায় বর্ষার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, ঢাকার জন্য পরিবহন অবকাঠামো, আর্সেনিক আক্রান্ত সকলের চিকিত্সা, কৃষি উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি, বুড়িগঙ্গা নদীর পুনরুদ্ধার, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ, ধোঁয়াহীন তামাক বন্ধ করা, ক্রমবর্ধমান শহরগুলোতে পুনর্বাসন জোরদার, তিন মিটারের কম উচ্চতার বন্যা মোকাবিলায় পরিখা, বাণিজ্য সহজীকরণ, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, নতুন হাইব্রিড ইটভাটা, সাময়িক অভিবাস ভাতা বা উপবৃত্তি, জরায়ু মুখের ক্যান্সারের চিকিত্সা ও টিকা, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ রক্ষা, জীবিকা নির্বাহ কর্মসূচি, সহজশর্তে ক্ষুদ্র ঋণ, প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-বাকৃবির তথ্যসমূহ পাঠ্যবইয়ে সরবরাহ, এলপিজি ব্যবহার, উত্তর-পূর্ব ভারতের দিকে অবাধ সড়ক ব্যবস্থা, নিঃশর্তে নগদ অর্থ হস্তান্তর কর্মসূচি, ভুটান ও নেপালের দিকে অবাধ সড়ক ব্যবস্থা, অধিক শক্তির জন্য গার্হস্থ্য কয়লা, কম্পিউটার শিক্ষা, ঋণপত্রের বাজার ও তিন মিটারের বেশি উচ্চতার বন্যা মোকাবিলায় পরিখা।
 
অগ্রাধিকার এই তালিকা নিয়ে গত ১২ মে এক সেমিনার হয়েছে ঢাকার ব্র্যাক সেন্টারে। ওই সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান বলেছেন, ‘বাজেট একটি সাংবিধানিক বিষয়, বাস্তবে এটা রাজনীতিযুক্তও বটে। বাজেট একটি সরকারের বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব। বাজেট সরকারের কোনো একক ব্যক্তির বিষয় নয়, এটা প্রণয়নের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি গ্রুপ কাজ করেন। সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তা বাস্তবায়ন, তীক্ষ নজরদারি ও জবাবদিহিতার মধ্যেই বাজেটের আসল সফলতা নিহিত।’
 
ওই সেমিনারে যোগ দিয়েছিলেন নোবেলজয়ী নরওয়ের অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ফিন ই. কিডল্যান্ড। সেমিনার শেষে ইত্তেফাকের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপে প্রফেসর কিডল্যান্ড বলেন, ‘বিনিয়োগে অগ্রাধিকার বাছাইয়ে বাংলাদেশ এখন শুধু জাতীয়ভাবেই নয়, বিশ্বকেও দিক-নির্দেশনা দিচ্ছে। এটা দেখে আমি খুব আনন্দিত।’
 
অগ্রাধিকার তালিকায় অন্যতম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়াকে। বাংলাদেশ প্রতিবছর সরকারি ক্রয় পদ্ধতির পেছনে ৭২ হাজার কোটি টাকা খরচ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে বিলম্ব ও বাড়তি খরচ এড়ানো সম্ভব। ‘ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’-এর গবেষণা সহকর্মী ওয়াহিদ আবদুল্লাহর গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটাল করা গেলে বছরে ই-প্রকিউরমেন্টে খরচ হবে মাত্র ১৪৪ কোটি টাকা। এতে বছরে আনুমানিক ৫ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা সঞ্চয় হবে। এক্ষেত্রে ১ টাকা খরচের বিপরীতে সুফল আসবে ৬৬৩ টাকার।
 
সরকারি কেনাকাটায় ই-প্রকিউরমেন্ট বিষয়ে নোবেলজয়ী প্রফেসর ফিন কিডল্যান্ড ইত্তেফাককে বলেন ‘ই-প্রকিউরমেন্ট বাংলাদেশের জন্য একটি অসাধারণ শক্তিশালী হাতিয়ার হবে। কম খরচ ও প্রচুর দরপত্র দাখিলের কারণে এই নীতিমালাটি বাস্তব মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য।’
 
এই সম্পর্কে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. কে এ এস মুরশিদ বলেন, ‘ই-প্রকিউরমেন্টের মাধ্যমে দরপত্র দাখিল প্রক্রিয়া আরো উন্নত করা হলে সেটি যেই সংকেতটি দেবে তা হলো-বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য খোলা ও নিরাপদ।’
 
৭২ ইস্যু সংবলিত অগ্রাধিকার এই তালিকার ওপর গত ৮ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়েও একটি পর্যালোচনা সভা হয়েছে। ইউএনডিপি ও ইউএসএআইডি’র সহযোগিতায় সভাটির আয়োজন করে কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘এক্সেস টু ইনফরমেশন’। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এতে প্রধান অতিথি ছিলেন। ৭২ ইস্যুর স্মার্ট সমাধান ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার বিষয়টিকে সামনে এগিয়ে নেয়ার ওপর সেখানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রফেসর ফিন কিডল্যান্ড ও কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ড. বিয়ন লোমবোর্গ। পরে ডিজিটাল বাংলাদেশ ইস্যুতে ‘কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার’ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘এক্সেস টু ইনফরমেশন’-এর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়।
 
এই এমওইউ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভার ওপর বিশ্বের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ চলতি মাসে ‘ডেভেলপিং বাংলাদেশ, হাউ টু স্পেন্ড ইট’ শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বিনিয়োগের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত লাভের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ।
 
কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ড. বিয়ন লোমবোর্গ ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন ‘ক্ষুদ্রঋণ একটি যুগান্তকারী ধারণা।’ তিনি বলেন ‘কার্যকর কর্মসূচির দিকে বাংলাদেশকে এখন নজর দিতে হবে। কম খরচে বেশি লাভ ও দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে হবে।’
 
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ড. মুহাম্মদ মূসা জানান, অগ্রাধিকার ইস্যু নির্ধারণে এক বছর ধরে কাজ করা হয়েছে। প্রায় এক হাজার ধারণা আসে, সেখান থেকে ৭২টি নির্ধারণ করা হয়।