নর্থ ইস্ট ভিয়েতনামের হা গোইয়ান প্রদেশের যেখানে চীনসীমান্ত থেকে পাহাড় কেটে রেড রিভার বলে অত্যন্ত দীর্ঘ এক নদী উপত্যকায় এসে নৃত্য শিল্পীর বঙ্কিম কোমরের মতো মোচড় তুলে হারিয়ে গেছে কুয়াশাময় নীল পাহাড়ের অন্তরালে, ঠিক সেখানে ফোর হুইল ল্যান্ডরবার থেকে আমাদের নামিয়ে দিলেন ভিয়েতনামিজ ট্যুর গাইড। ডিসেম্বরের নির্জন বিকালে এদিকে শীত পড়েছে বেশ ঝাঁকিয়ে। আজ থেকে শুরু হয়েছে মঙ ট্রাইভাল গোষ্ঠীর কিনচিয়েং বা নববর্ষের অনুষ্ঠান। এ বাবদে নিকটবর্তী লাওকাই জেলার সাপা শহরে আসছে বিস্তর ট্যুরিস্ট। একসময় সাপা ছিল ফরাসি ঔপনিবেশিক প্রশাসকদের অত্যন্ত পছন্দসই সামার রিসোর্ট। এখনো সে শহরে আছে পাহাড়ের ঢালে কলোনিয়েল আমলে নির্মিত ফ্রেঞ্চ স্টাইলের অনেকগুলো ভিলা। পর্যটকরা পছন্দ করেন বেলকনিতে বসে দূরের কন-ভই বা জংলা হাতি বলে পরিচিত পর্বতের দিকে তাকিয়ে, হালকা তুষারের মিহি আস্তরণে সূর্যরশ্মির রিফ্লেকশন দেখতে দেখতে পাসটিস বলে একধরনের ঝাঁঝালো অ্যালকোহলে প্রস্রবণের জল মিশিয়ে পান করতে। সে ফরাসি আমল থেকেই তারা কন-ভই পর্বতকে আদর করে ডাকেন টংকিনিজ আল্পস বলে। ট্যুর-গাইড আমাদের একটি ফ্রেঞ্চ ভিলায় আহার বাসস্থানের বন্দোবস্তও করেছিলেন। কিন্তু আমরা রাজি হইনি। আমাদের আগ্রহ কিনচিয়েং বা নববর্ষের পরবে একটি মঙ ট্রাইভাল গ্রামে রাত কাটিয়ে বিষয়টি সরজমিনে পর্যবেক্ষণ করা। আমার সঙ্গী ক্রেগ রাইস-জাতিতে সাহেব, তার গাত্রবর্ণ রাঙা মুলার মতো গোলাপি, তার শরীরে আছে তাজা ফরাসি খুন, তিনি পেশায় এথনোমিউজিকোলিস্ট—অর্থাত্ ঝোপ জঙ্গলে বাসরত আদিবাসীরা কেন গান করে, সুর-লয়-তাল বজায় রাখতে তারা কী ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে, এবং সংবেদনশীল সংগীত শ্রবণ করে তাদের হূদয়ে আনচানের সৃষ্টি হয় কি-না—এ বাবদে তিনি গবেষণা করছেন। আমি যেহেতুে এ মুহূর্তে উল্লেখ করার মতো কোনো পেশার সাথে জড়িত নই, কিন্তু একটি মঙ গ্রামে রাত্রিবাসের খায়েশ আছে, এবং নিজেকে তো অপদার্থ বলে পরিচয় দেয়ার কোনো বিধান নেই, তাই বাংলাদেশি ফ্রি লেন্স রাইটার পরিচয় দিয়ে ক্রেগ সাহেবের সাথে একত্রে মঙ গ্রামের দিকে রওয়ানা দিয়েছি। ভরসা একটাই—মঙরা নববর্ষের পরবে আগত অতিথিদের খেদমত করেই অভ্যস্ত; ক্রেগ সাহেব আমাকে ভরসা দিয়েছেন, তিনি শুধু সংগীতই না মঙ সম্প্রদায়ের আচার-বিচার সম্পর্কে গত দেড়শ বছরে রচিত তাবত্ প্রবন্ধ পুস্তকাদি পাঠ করে রীতিমতো দিগগজ হয়ে খোদ প্যারিসের একটি লাইব্রেরিতে সচরাচর বিহার করেন। তার ভাষ্য মোতাবেক মঙ মেয়েরা মেজবান হিসেবে প্রেমিকাদের মতোই আপ্যায়নশীলা, তারা কখনো কোনো মেহমানকে নববর্ষের রাতে ছাতা-পেটা করে গ্রাম থেকে তাড়ায় না।
ক্রেগ সাহেব ম্যাপ দেখে এদিক সেদিক তাকিয়ে পয়দলে ‘টেয়’ পলির দিকে রওয়ানা দেন। তার শরীরের সাথে বাঁধা লটবহর ও সামানাদি বিস্তর। ব্যাকপ্যাকের স্ট্রাপে আটকানো স্লিপিং ব্যাগ, কাঁধ থেকে ঝুলছে গিটার, কোমরের বেল্টের সাথে বাঁধা গোখরা সাপের চামড়ায় তৈরি ভিয়েতনামিজ ঢোলক। আমরা খানিক আগে চাওবেঙ্গ থেকে দুশো-পঞ্চাশ কিলোমিটার ল্যান্ডরবারে ন’ঘণ্টায় পাড়ি দিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছি। আমরা সারাদিন চলমান গাড়িতে বসে ছিলাম বলে ক্লান্ত হলেও হাঁটতে ভালোই লাগে। ক্রেগ থেমে ট্রাইপডের ওপর ক্যামেরা বসান। পাহাড়ি সড়কের এ বাঁক ভরে আছে বিচিত্র সব পাখির কাকলিতে। কিন্তু আমরা কোথাও কোনো পাখি দেখতে পাই না। ক্রেগ সাহেব ক্যামেরা অটোতে দিয়ে সাথে সাথে টেপ রেকর্ডে পাখির ধ্বনি ধারণ করেন। আমি তন্ময় হয়ে কিছুক্ষণ নিচের উপত্যকার দিকে তাকিয়ে থাকি। ওখানে স্তরে স্তরে নেমে গেছে টেরাস করা ধান ও সবজির খেত। উপত্যকার দূরত্ব অনেক, তাই টেরাসের আউটলাইনের দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয়-কিংবদন্তির কোনো দৈত্যের কুঞ্চিত ললাটরেখার মতো। এবং এ জায়েন্টের ঠিক পশ্চাত্পটে জগদ্দল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হোয়াং লিয়েন সান মাউন্টেন। গোধূলি আসন্ন তবে রোদ মরেনি, তাই পাহাড়ের বর্ণবিভায় নীল জমিনে মিশ্রিত হয়েছে সবুজের প্রলেপ, তার ওপর কুয়াশামিশ্রিত হালকা শুভ্রতায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে সূর্যের সোনালি ডানা। মঙ যুবতীরা যেরকম কিনচিয়েং উত্সব উপলক্ষে খুব সাবধানে সাজে, সে-রকম পাহাড়টিও তার অবয়বকে আজ উপস্থাপন করছে মোলায়েম সব বর্ণের মোহন সম্ভারে।
প্রায় আধ ঘণ্টার মতো হেঁটে আমরা অবশেষে টেয় পলির কাছাকাছি চলে আসি। এখানে ধাপে ধাপে ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়া টেরাস চলে আসে আমাদের স্পর্শের সীমানায়। আমরা দীর্ঘ ঘাস মাড়িয়ে, বুট জুতায় শিশির মাখিয়ে আলপথে চলি। আমাদের সামনেই টেয় গ্রামের দোচালা সব ঘরের কাঠামো দৃষ্ট হয়। কোথাও কোনো মানুষজন বা পশুপাখি নেই। টেরাসের সবুজ ঘাসে ঘাসে উড়ে বেড়ায় হাজার বিজার ফড়িং, সুরুজ আরো খানিক নেমে এসেছে বলে নির্জন এ জনপদ ভরে উঠেছে হলুদাভ আলোয়। আমরা টেরাস করা খেতের একপাশে আলগা পাথর ফেলে করা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠি। আমাদের পদশব্দে বিরক্ত হয়ে কক কক করে পাখা ঝাপটিয়ে উড়ে যায় একঝাঁক বনমোরগ। এ জনপদের নির্জনতা ও গোধূলিবেলার বর্ণবিচ্ছুরণ আমাদের মনে ছাপচিত্রের মতো আঁকা হয়ে যায়। ক্রেগ ট্রাইপড বাগিয়ে আবার তুলে নেন বেশকিছু ছবি। তিনি ক্যামেরার লেন্স পাল্টাতে পাল্টাতে আমাকে বলেন, ‘ইউ আর অ্যা রাইটার, হাউ উড ইউ ডেসক্রাইব দ্যা বিউটি অব দিস সলিটারি পেস?’ আমি জবাবে বলি, ‘আই রিয়েলি ক্যান্ট, বাট অ্যা বেঙ্গলি পোয়েট জীবনানন্দ দাশ ডেসক্রাইবড দিস অ্যাজ ধানসিঁড়ি।’ ক্রেগ সাহেব নোটবুক খুলে বলেন, ‘দ্যা ওয়ার্ড ফর দিস কাইন্ড অব ডেসক্রিপসন ইজ নোউন ইন বেঙ্গলি এজ জীবনানন্দ।’ ‘অ্যাবসলিউটলি নট। জীবনানন্দ হচ্ছে ভদ্রলোকের নাম, বাড়ি বরিশাল, তাঁর বর্ণনাতে আছে ধানসিঁড়ি শব্দটি।’ আমি বিরক্ত হয়ে বলি। ক্রেগ সাহেব আমার বক্তব্যটি নোটবুকে টুকে তা আমাকে দেখিয়ে জানতে চান, ‘ডিড আই ক্যাচ ইট কারেক্টলি?’ তার নোটবুকের ভাষা ফরাসি, তাতে তিনি কী লিখেছেন কেবলমাত্র অন্তর্যামীই জানেন। আমি এ বাবদে কোনো কথা বাড়াতে চাই না বলে মাথা হেলিয়ে চুপচাপ থাকি।
টেয় পলি দৃশ্যত কাছে হলেও ওখানে পৌঁছাতে আমাদের আরো মিনিট চল্লিশেকের মতো লেগে যায়। টেরাস বেয়ে ওঠা তেমন কষ্টসাধ্য না হলেও একটি পাহাড়ি ঝোরা অতিক্রম করতে বেশ বেগ পেতে হয়। গ্রামে ঢুকেই দেখি উঠানে দড়ি দিয়ে বাঁধা গোটাচারেক হূষ্টপুষ্ট ককুদওয়ালা ষাঁড়; তাদের গলায় বুনো ফুলের মালা, কপালে রঙিন খাড়ি দিয়ে আঁকা বোধকরি ঝিঁঝিঁ পোকার নকশা। কাঁধে পিঠে বিস্তর মালমাত্তাসহ দুই বিদেশিকে দেখামাত্র ষণ্ডগুলো হাম্বা হাম্বা রবে দড়ি ফড়ি ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করে। এ গোলযোগে চালাঘর থেকে দাওয়ায় বেরিয়ে এসে দুটি মেয়ে আমাদের দেখে খিলখিল হেসে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। আমরা তাদের ছাড়িয়ে আরো ক’টি চালাঘর পাড়ি দিয়ে চলে আসি ভিন্ন একটি উঠানে। এখানে লাকড়ি পুড়িয়ে করা হয়েছে অগ্নিকুণ্ড। তার ওপর বাঁশের ফ্রেম থেকে জ্বলন্ত শিখার ওপর ঝুলছে কেতলি। আগুন ঘিরে গাছের কাটা সব গুড়িতে বসে আছেন গাঁয়ের বেশ কয়েকজন ময়-মুরব্বি। বোধকরি তাদের সাথে ক্রেগ সাহেবের জানাশোনা আছে। তিনি মঙ ও ফরাসি ভাষার মিশ্রিত জবানে তাদের সাথে সম্ভাষণ বিনিময় করেন। গাঁও বুড়োরা সকলে হাতখানেক লম্বা তেলচিক্কন আঁকওয়ালা বাঁশের টাবে চিলিম গেঁথে ধূমপান করছেন। বসার জন্য আমাদের গাছের কাটা গুড়ি এগিয়ে দেয়া হয়। সন্ধ্যা হয়ে আসছে প্রায়। হিমও পড়েছে জবর। তাই আগুনের পাশে বসতে ভালোই লাগে। একজন প্রৌঢ় কেতলি নামিয়ে এনামেলের পেয়ালায় আমাদের পরিবেশন করেন গরম চা। তাতে চুমুক দিয়ে মনে হয় জঙ্গলের পানজেন্ট সব শিকড়-বাকড়কে অনেকক্ষণ ধরে ফোটানো হয়েছে। চা খেতে খেতে ক্রেগ বোধকরি আমার কিনচিয়েংয়ের পরব দেখতে আসার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। গাঁও বুড়োরা সকলে আমার দিকে বারবার ফিরে ফিরে তাকান। ক্রেগ এবার মৃদু হেসে জীবনানন্দ এবং বাংলাদেশ শব্দটি উচ্চারণ করলে সকলের মুখে যুগপত্ কৌতূহল ও হাসি ফোটে। আমি একটু ধন্ধে পড়ি—ক্রেগ জীবনানন্দকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বলে চালাচ্ছেন কি-না তা-ই বা কে জানে? একটু আগে খিলখিল করে হাসা মেয়ে দুটি অগ্নিকুণ্ডের পাশে চলে এসে আমার দিকে ইশারা করে মিঠে হেসে কিছু বলে। গাঁও বুড়োরাও আমার দিকে তাকিয়ে হেসে কিছু একটা ইশারা করেন। আমি কিছু বুঝতে না পেরে ভ্যাবলাকান্তের মতো ক্রেগ সাহেবের দিকে তাকাই। ক্রেগ জানান যে, আমি গাঁয়ের নতুন অতিথি, এসেছি সেই সুদূর বাংলাদেশ থেকে, তাই মেয়েরা আমাকে আপ্যায়ন করতে চায়। আমাকে যেতে হবে তাদের সাথে। আমাকে অগত্যা উঠতে হয়। মেয়ে দুটির হাসি দেখে মনে হয়—তারা ভেতরে ভেতরে ভাবছে—বাছাধন, অনেক দিন তো বনে বনে ঘুরে বেড়িয়েছ, এবার তোমাকে ফাঁদে ধরেছি!
আমরা ছাগলের কুট্টির মতো দেখতে ছোট্ট একটি নিচু ঘরে এসে ঢুকি। একটি মেয়ে কোণে রাখা কেরোসিনের মশাল জ্বালে। বালিকাটি অত্যন্ত অল্পবয়সী। সে আমাকে হাতের ইশারায় মাছ ধরার পলোর মতো একটি আসন দেখায়। আমি ইতস্তত করতেই অন্য মেয়েটি—যার মুখ চাঁদের মতো গোলাকার এবং বয়সে তরুণী—আমার দু’বাহুতে হাত রেখে জ্যাকেটটি খুলে নিতে চায়। তা কাপড় খুলবে কেন—আমি বড় বিভ্রান্তিতে পড়ি। আসনখানা কী তা খুঁটিয়ে দেখার জন্য একটু নিচু হতেই বালিকাটি পিছন থেকে দু’হাতে আমার চোখ ঢেকে মাথা তার দিকে ঈষত্ আকর্ষণ করতেই আমি ভারসাম্য হারিয়ে পলোতে বসে পড়ি। তরুণী দ্রুত হাতে আমার জ্যাকেট খুলে নেয়। পলোতে হরিণের চামড়া পাতা। আমার যাতে ঠাণ্ডা না লাগে তার জন্য তারা বুকে রাখে ভালুকের চামড়ার একখানা ভারী কম্বল। ছোট্ট মেয়েটি এখন আমার কপাল টিপে দিয়ে আস্তে আস্তে চুল টেনে দিচ্ছে। বড়টি চুঙের ফুঁ দিয়ে আমার আসনের ঠিক নিচে মালসায় আগুন উস্কে দেয়। তীব্র শীত বলে উত্তাপটুকু খারাপ লাগে না, তবে শেষে না মেয়ে দুটি আমাকে রান্নাবান্না করে বসে এ অতঙ্কে আড়ষ্ট হয়ে বসি থাকি। বড় মেয়েটি বাঁশের চোঙ থেকে কিছু ঢেলে ঝিনুকে করে আমাকে খেতে দেয়। তরলটি পান করতে গিয়ে আমি মধুর সুমিষ্ট স্বাদের সাথে কালিজিরার সৌরভ পাই। মেয়ে দুটিও আরকটি চাখে। তারপর কী কারণে জানি আমরা সকলে হাসাহাসি করতে শুরু করি। যুবতী হাসতে হাসতে ভেঙে খানখান হতে থাকে। হাসির গমকে তার বুকে ভারী স্তনযুগল উছলে ওঠে। একটু পর খানিক ধাতস্থ হতেই সে আমার বুট খুলে নেয়। এ খোলাখুলি বিষয়টি আমার ভালো লাগে না, কিন্তু এ পরিস্থিতিতে করবই বা কী, বেচারা হয়ে বসে থাকি। তরুণী এখন আমার পায়ে ভেষজের থিকথিকে ক্বাথ মালিশ করে দিচ্ছে। ছোট্ট মেয়েটির মাথা মালিশ করা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। সে এখন হাতখানেক লম্বা বাঁশের টিউবে চিলিম সাজায়। আমি ধূমপান করতে না চাইলে সে আমার থুতনিতে হাত রেখে চোখের ভাষায় খুব অনুনয় করে। আমি আর তার অনুরোধ ফেরাতে পারি না। ধূমপান করতে করতে ক্রেগ সাহেবের কথা ভাবি—নিশ্চয়ই সাহেবকে অন্য কোনো ঘরে মেয়েরা এখন ডালাই মালাই করছে। তরুণী আমার জ্যাকেটের পকেট ঘেঁটে বের করে এনেছে ওয়াকম্যান, কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছে না বস্তুটি দিয়ে কী করতে হয়? আমি ইশারায় তাকে কাছে ডেকে তার কানে ইয়ারফোনের প্লাগ গুঁজে দিয়ে প্লে-বাটন টিপে দেই। কানে গানের শব্দ হতেই সে খানিক অবাক হয়, তারপর খুব দ্রুত বিষয়টি বুঝতে পেরে একহাতে ওয়াকম্যান চেপে ধরে উঠে দাঁড়িয়ে সুরে-লয়ে নাচতে শুরু করে। ছোট্ট মেয়েটি আমার থুতনিতে হাত রেখে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে নীরবে নালিশ করে—তার ভাবখানা এই যে, আমাকে কিছু দেবে না? আমি হাত বাড়িয়ে জ্যাকেটের অন্য পকেট থেকে বের করে আনি সস্তা ক্যামেরা। তাকে শাটার টেপা দেখিয়ে দিতেই সে নৃত্যরতা যুবতীর দিকে তাকিয়ে ফটাফট শাটার টিপে ফ্লাস ঝলকাতে শুরু করে। ঠিক তখনই ঝামেলাটা হয়। মনে হয় চতুর্দিকে শুরু হয়েছে তীব্র তুফান, খাট করে উড়ে যায় ঘরের চাল। সাথে সাথে ঘূর্ণি হাওয়া এসে আসনসুদ্ধ আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যায় আকাশে, আমি তারার আলোয় উড়ে চলি হোয়াং লিয়েন সান পর্বতের দিকে। ভাবি, মেয়ে দুটি সাথে এলে দারুণ হতো। ঠিক তখনই দেখি—যুবতী মেয়েটি মেঘের ওপর দিয়ে ওয়াকম্যান খামচে ধরে ছায়াপথের তারকা জ্বলা সরণীতে ঢিমে তালে নাচছে। ভেলার মতো বড়সড় একখণ্ড মেঘ ভেসে আসে, তার ওপর বসে ছোট্ট মেয়েটি বিজুলির মতো ফ্লাস ঝলকিয়ে সপ্তর্ষিমণ্ডলের ছবি তোলে।
কানে মিউজিকের তীব্র শব্দ হতেই স্বপ্নময় চটকা ভেঙে যায়। তাকিয়ে দেখি বড় মেয়েটি আমার কানে ওয়াকম্যানের ইয়ারফোন টিপে ধরেছে আর ছোট্ট মেয়েটি ক্যামেরা হাতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে তীব্র কৌতূহল নিয়ে। তারা আমাকে পলোর মতো আসন থেকে দু’হাতে টেনে ওঠায়। গ্রামে কোথায় যেন দ্রিমিক দ্রিমিক মাদল বাজছে। আমি মশালের আলোয় মেয়ে দুটির সাথে চলে আসি অন্য এক উঠানে। একটি বড়সড় ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে বাদ্যের সাথে ‘হাহ হা রানই রানই’ বলে বিচিত্র একধরনের শব্দ। আমরা পা টিপে টিপে ঘরের ভেতরে চলে আসি। মেঝেতে মাদুরের ওপর জানু বিড়িয়ে বসে আছে অনেক নারী ও পুরুষ। আমরা আলগোছে তাদের পাশে বসি। ঘরের ঠিক মধ্যিখানে রাখা শুকরের কাটা মস্তক, তাকে ঘিরে ফুলপাতা আর গাছশামুক দিয়ে তৈরি বৃত্ত। বৃত্তের দু’পাশে বসা দুটি নগ্নবক্ষা মেয়ে, তারা দু’ হাতে ঝাপটে ধরে আছে দুটি রঙচঙে মুর্গা। মেয়ে দুটির চুল, মুখ, মাথা ও চোখ লালসালু কাপড়ে ঢাকা। তাদের থেকে অল্পদূরে দাঁড়িয়ে মঙ শামান বা তুকতাকের ওঝা। তিনি ব্যাটম্যানের মতো কালো কাপড়ে চোখমুখ ঢেকে মৃগি রোগীর মতো কেঁপে কেঁপে ‘হাহ হা রানই রানই’ বলে হাহাকার করে উঠছেন। ঘরে সমবেত লোকজনের ঠিক পিছন দিকে বেতের বৃহত্ ঝুড়িভর্তি সদ্য মাড়াই করা ধানের আবডালে বসে মাদলওয়ালা, তার পাশে একধরনের ট্রামপেট ও মাউথ হার্প নিয়ে বসে আরো দুই বাজনাদার। আমি ওদিকে তাকাতেই দেখি দেয়ালের সাথে সেঁটে ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে রীতিমতো অ্যামবুস পেতেছেন ক্রেগ সাহেব। ওঝা গোলাকার একটি রিংয়ে গাঁথা শতাধিক ভাঙতি পয়সা ঝনঝনিয়ে দু’হাত সামনে বাড়িয়ে অনুনয় করে কাকে যেন ডাকেন। বিষয় কিছু বুঝতে না পেরে আমি পশ্চাত্ ঘষটিয়ে ঘষটিয়ে চলে আসি ক্রেগ সাহেবের কাছে। তিনি ফিসফিস করে আমাকে বলেন, ‘শামান এখন ট্রেন্স বা মোহগ্রস্ত এক মানসিক স্তরে চলে গেছেন। এ বিষয়টিকে মঙ ভাষায় বলে ‘ক্বোয়ানাহ’। তিনি কয়েন ঝনঝনিয়ে ‘চাক্সআননাহ’ বলে একটি রিচ্যুয়েলের মাধ্যমে মৃত পূর্বপুরুষদের এখনই ডেকে আনবেন।’ হঠাত্ করে সমস্ত পরিবেশ নীরব হয়ে আসে। অনেক্ষণ এ তীব্র নীরবতার মধ্যে বসে থাকতে থাকতে মনে হয় গ্রামবাসীরা নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে। আঙিনার ঝোপঝাড় থেকে ভেসে আসে ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ। সহসা মুর্গা দুটো একসাথে বাঁক দিয়ে উঠলে মেয়েগুলোর একটি খোনা গলায় কাঁদে, অন্যটি তাকে ধমক দিয়ে পুরুষালি গলায় কথা বলতে শুরু করে। ওঝা আবার কয়েন ঝনঝনিয়ে ‘হাহ হা রানই রানই’ বলে হাহাকার করে ওঠেন। ক্রেগ সাহেব আমাকে ফিসফিসিয়ে বলেন, পূর্বপুরুষদের একটি নারী ও একটি পুরুষের আত্মা এইমাত্র বনানী ছেড়ে ঘরে এসে ঢুকল। সাথে সাথে সব ক’টি বাদ্যযন্ত্র, মোরগের বাঁক ও ওঝার হাহাকার ধ্বনিত হয়। সমস্ত বিষয়টি ভাবতে গিয়ে আমার শরীর শিউরে ওঠে। আমি চুপচাপ দেয়াল সেঁটে বসে অপেক্ষা করতে থাকি কখন সকাল হবে।