হিমালয়ের শৈবতীর্থ কেদারনাথ শৃঙ্গ

বছর কয়েক আগের কথা। ভারতভ্রমণে গন্তব্য ছিল—দেরাদুন, সিমলা, নৈনিতাল, দিল্লি। হাওড়া থেকে যাত্রা করে দুন এক্সপ্রেসে দুই দিন দুই রাত কাটানোর পর তৃতীয় দিনে সূর্য হঠাত্ই বলল, হিমালয়ের ট্রেকিং করব কি-না? পাহাড়ে ২৮ কিলোমিটার হাঁটতে পারব কি-না? সে-সময় অবধি ট্রেকিং-এর কোনো পূর্বপ্রশিক্ষণ ছিল না। আমার ৩০ বছরের জীবনে তখনো পাহাড়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা কেবল মাধবকুণ্ড আর সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ মন্দিরে। হাওড় এলাকায় বাড়ি হওয়ার কারণে শুকনা মৌসুমে সদর জেলার বাড়ি থেকে গ্রামের বাড়ি আসা-যাওয়ার জন্য কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হয়, কিন্তু সেটা পাহাড়ে নয়, সমতলে। সে অভিজ্ঞতা আর আত্মবিশ্বাসকে সম্বল করে সূর্যকে প্রশ্ন করলাম, ২৮ কিলোমিটার হাঁটলে কী পাব? উত্তরে শুনলাম ‘হিমালয়’।

কল্পনার চোখে ভেসে উঠল—শাদা বরফের শৃঙ্গ হিমালয় আর শেরপাদের ছবি। এর আগে দিব্যচোখে কাঞ্চনজঙ্গাকে দেখেছিলাম দার্জিলিং-এ। সেখানে প্রতিষ্ঠিত তেনজিং নোরগের মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট-এ গত ট্যুরে কিছুটা সময় কাটিয়েছিলাম। তখন ইচ্ছে হয়েছিল, নিজের মনে মনে ভাবছিলাম, একটু আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠব কি-না? চেষ্টা করে দেখব নাকি, শেরপাদের মতো পাহাড়ে  যেতে পারি কি-না?

১৯৫৪ সালে ভারতের দার্জিলিং-এ তেনজিং নোরগের মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়। পর্বত আরোহণে উত্সাহ ও প্রশিক্ষণের জন্য তেনজিং নোরগে ও এডমন্ড হিলারির আগ্রহে ভারতে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহেরু হিমালয় পর্বতারোহণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। দুঃসাহসিক পর্বত আরোহণের মৌলিক ও উচ্চতর ব্যবহারিক বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই ইনস্টিটিউট। এভারেস্ট বিজয়ী তেনজিং নোরগে ছিলেন এ ইনস্টিটিউটের প্রথম প্রশিক্ষণ ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক।

সূযের্র হিমালয়ে ট্রেকিং-এর প্রস্তাবে এতকিছু না ভেবেই ঝোঁকের মাথায় অবশেষে রাজি হয়ে গেলাম। একটু দুশ্চিন্তা আর পিছুটান ছিল—কোলকাতা থেকে করে নিয়ে আসা সিমলা, নৈনিতাল আর দিল্লির রিটার্ন টিকিটগুলোর ভবিষ্যত্ নিয়ে।

ভাবনার জাল ছিন্ন হলো একসময়। ঘণ্টাখানেক পর অবশেষে শিবালিক পাহাড়ের পাদদেশে হরিদ্বারে পৌঁছালাম। হরিদ্বারের পুরোনো পরিচয় মায়াপুরী নামে। এখান থেকেই গঙ্গার সমতলে যাত্রা শুরু হয়েছে।

পবিত্র হিন্দুতীর্থ হরি ও হরের সহাবস্থান ঘটেছে হরিদ্বারে। গঙ্গাই হরিদ্বারের মূল আকর্ষণ। অতীতে নাম ছিল গঙ্গাদ্বার। পাহাড় থেকে গঙ্গা নামছে সমতলে, হরিদ্বারের ‘হরি কি পাউরি’ ঘাটে। বিশ্বাস করা হয় গঙ্গাস্নানে সব পাপ ক্ষয় হয়। পূর্বে চণ্ডী পাহাড়, পশ্চিমে মনসা পাহাড় রয়েছে হরি কি পাউরি-কে কেন্দ্র করে।

তীথযাত্রী আমি, সূর্য আর কোলকাতার দুজনের গন্তব্য উত্তর প্রদেশের হিমালয় শৈবতীর্থ কেদারনাথ  শৃঙ্গ। দুপুরে হিমালয়ের ট্রেকিং-এর প্রস্তুতি হিসেবে মনসামঙ্গল পাহাড়ে চার ঘণ্টার ট্রেকিং শেষ করি।

সন্ধ্যায় হরি কি পাউরি ঘাটে ৯৯৯টি ফুল, প্রদীপ দিয়ে সাজানো পাতার ভেলায় মঙ্গলারতির কথা এখনো স্মৃতিতে রয়েছে।

হরিদ্বারে স্টেশনে রিটার্ন টিকিট ফেরত দেওয়ার সময় কোলকাতার দাদাদের কাছে ধরা পড়লাম। বিস্মিত হওয়ার পালা। পাসপোর্টের নাম দেখে বুঝে গেল—আমরা দুজন তীর্থ সহযাত্রী, হিন্দু নয়, মুসলিম!

ভোর ৫ টায় রওনা হলাম শৈবতীর্থ হিমালয় শৃঙ্গের উদ্দেশে। কাঁধে হ্যাভারস্যাক, হাতে স্পাইক লাগানো লাঠি

আর হঠাত্ ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে উইন্ডসর। কেদারশৃঙ্গের পাদদেশে মন্দাকিনী নদীর কূলে, গাড়োয়াল হিমালয়ে ১২,৮৬৬ ফুট উঁচুতে কেদারনাথের মন্দির। সে-সময় ছিল অক্টোবর মাসের ১৯ তারিখ। দেয়ালীর পর ২৫ তারিখে মন্দিরের মূর্তিকে সমতল ভূমি উখিমঠে অধিষ্ঠিত করা হয়। তখন বরফের কারণে বন্ধ হয়ে যায় গৌরীকুণ্ডের যোগাযোগব্যবস্থা।

যাত্রাপথে অপরূপ সৌন্দর্য। কেদারনাথের পথে সবুজ মন্দাকিনী আর শ্বেত অলকানন্দা নদী রুদ্রপ্রয়াগে মিলিত হয়েছে। সঙ্গমে একখণ্ড শিলা—নাম ‘নারদশিলা’। কথিত আছে, সেখানে শিলায় বসে নারদ তাঁর বীণা বাজাতেন। কেদারনাথ যাওয়ার জন্যে হরিদ্বার থেকে ১৩ ঘণ্টা বাস জার্নি করে প্রথমে পৌঁছেছি গৌরীকুণ্ডে। শিবের পার্বতী এখানকার উষ্ণকুণ্ডে স্নান করতেন, তাই এ জায়গার নামকরণ গৌরীকুণ্ড।

গৌরী—কিংবদন্তি শিবজায়া পার্বতী রিতুস্নানে কুণ্ডে আসেন। গনেশকে পাহারায় রেখে স্নানে যান দেবী। সাধুবেশী শিব গনেশের হাতে বাধা পেয়ে ত্রিশূলাঘাতে মুণ্ড কাটেন গনেশের আবার দেবীরই অনুরোধে শিব এক হস্তীমুণ্ড এনে জুড়ে দেন গনেশের মুণ্ডকাটা ঘাড়ে। প্রাণ পায় গনেশ। নামও হয় সেই থেকে গণপতি। পুরাণে কিংবদন্তি আছে, হিমালয়কন্যা গৌরী শিবকে পতিরূপে পেতে এখানে তপস্যা করেন।

গৌরীকুণ্ড থেকে ২৮ কি. মি. আসা যাওয়া, ট্রেক বা পায়ে হাঁটার পথ—শৈবতীর্থ কেদারনাথ শৃঙ্গ। 

যদিও হেলিকপ্টার, ঘোড়া, ড্যান্ডি—অনেক কিছুর ব্যবস্থা রয়েছে, তবে আমাদের চার জনের ভরসা— চরণযুগল।

কোলকাতার শিবুদার প্রেরণা আমি। তাঁর ভাষায়, ‘একটা মেয়ে মানুষ, তার চোখের সামনে দিয়ে হিমালয়ের শৃঙ্গে যাচ্ছে, আর সে পারছে না; তা কী হয়?’ আমিও পারছিলাম না, তারপরও অনেক কষ্টে একরকম মনে মনে কাঁদতে কাঁদতে হাঁটছিলাম। পা সাথে আছে কি-না বুঝতে পারিনি। গৌরীকুণ্ড থেকে ৭ কিলোমিটার যাওয়ার পর রামবাড়াতে যাত্রাবিরতি করলাম। সেখানে অসংখ্য ভেড়ার দেখা  মেলল। ভেড়ার আধিক্যের কারণে নাকি এ জায়গার এরূপ নামকরণ। ছোট্ট পাহাড়ি টঙ-এ চা খেলাম শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়ানোর আশায়। দলনেতা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি জানতেন পাহাড়ে একই গতিতে হাঁটতে হয়। থেমে গেলে স্থিতি জড়তার কারণে চলার গতি শ্লথ হয়ে যায়।

এত উচ্চতায় অক্সিজেন কম তাই নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। বুকের ভেতরে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করছিলাম।

কেদারশৃঙ্গের বরফের রুপালি ঝলক, পথের সমস্ত কষ্ট দূর করে দেয়। কেদারনাথ—ভারত ইন্দোচীন সীমান্তে অবস্থিত ১,০০০ বছরের পুরনো হিন্দু মন্দিরের প্রধান পবিত্র মন্দির কেদারনাথ। লোকশ্রুতি, পাণ্ডবরাই নাকি এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। হিমালয়ের পাদদেশে মন্দাকিনী নদীর আদি পর্যায়ের উত্সস্থলে ভারতের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। শোনা যায়, গান্ধি সরোবর থেকে মন্দাকিনীর উত্সস্থলের পথেই যুধিষ্ঠির স্বর্গযাত্রা করেন। ১৪,০০০ ফুট উঁচুতে অপার্থিব সৌন্দর্যের লীলাভূমি শ্বেতশুভ্র বরফের গান্ধি সরোবর। গান্ধিজির চিতাভস্ম এখানে বিসর্জিত হয়—তাই এ নামকরণ। প্রচণ্ড বৈরী আবহাওয়ার কারণে এই মন্দিরটি শুধুমাত্র এপ্রিলের শেষার্ধে কার্তিক পূর্ণিমায় শরতের পূর্ণচন্দ্রে উন্মুক্ত হয়। শীতে দেয়ালীর পর মন্দিরের মূর্তিকে সমতল উখিমঠে অধিষ্ঠিত করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, আদি শংকরাচার্য মন্দিরটি নির্মাণ করেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের চতুর্ধামের অন্যতম কেদারনাথ।

গ্রানাইট পাথরের বড় বড় স্লাব এই চড়াই-উতরাইয়ে কীভাবে এত উঁচুুতে আনা সম্ভব হয়েছে তা সত্যিই বিস্ময়কর।

মহাভারতে জানা যায়, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে চাঁদের কলঙ্কের মতো কলঙ্কিত হয়ে পড়েন পঞ্চপাণ্ডব। নিহত স্বজনদের জন্য অনুশোচনায় তীর্থযাত্রা গ্রহণ করেন পঞ্চপাণ্ডবরা। মহর্ষি বেদব্যাসের পরামর্শে হিমালয়ে গেলেন পঞ্চপাণ্ডব মহাদেবদর্শনে। শিব পালিয়ে বেড়ান একটি ষাঁড়ের আকার ধারণ করে। গুপ্তকাশী থেকে গৌরীকুণ্ডে পৌঁছে পিছু নেন শিবের। পালের অহংকারী ষাঁড় পায়ের নিচ দিয়ে পার হতে অস্বীকৃতি জানালে পঞ্চপাণ্ডব ভীম শিব বলে সন্দেহ করে মাটির গভীরে প্রোথিত করেন ষাঁড়টিকে। শুধুমাত্র লেজটি থেকে যায় ভীমের হাতে। এই অংশটিই প্রধানতম কেদার হিসেবে পরিচিত। অবশিষ্ট চারটি অংশ গাড়োয়ালে তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ, মদমহেশ্বর, কল্পেশ্বর ছড়িয়ে আছে। প্রধান কেদার ও অবশিষ্ট চারটি কেদার নিয়ে পঞ্চকেদার—তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ, মদমহেশ্বর, কল্পেশ্বর। ষাঁড়রূপী শিবের সম্মুখভাগ ছিটকে পড়ে নেপালে পশুপতিনাথে।

৩৮৮৬ মিটার উঁচুতে ভারতের সর্বোচ্চ মন্দির তুঙ্গনাথ। এ মন্দিরে দেবতা মহিষরূপী শিবের বাহু। জনশ্রুতি আছে, তুঙ্গনাথ দর্শনে তীর্থের পূর্ণতা মেলে। ধূসর রঙের পাথরের গুহারূপী রুদ্রনাথ মন্দির। সবুজে ছাওয়া-রঙ-বেরঙের রডোডেনড্রন, নানান রঙের আলপাইন ফুলে শোভিত পথ পেরুতে হয়। শীতে রুদ্রনাথ থেকে দেবতা নেমে এসে আসীন হন গোপেশ্বরে। মদমহেশ্বর নদীও নেমেছে এই পাহাড় থেকে। দীপাবলি থেকে অক্ষয় তৃতীয়ার মদমহেশ্বর মন্দির বন্ধ থাকে। মন্দিরে শিলাস্তূপ মহিষরূপী শিবের জটা কল্পেশ্বর। কল্পেশ্বর সারাবছর ধরে পরিদর্শন করা যায়।

কেদার দর্শনের রাস্তার দু’পাশে গভীর খাদ। হিমালয়ের শাদা বরফে সোনা রঙের রোদের তীব্র ছটায় মনে হয়, যেন পাহাড়ে আগুন ধরে গেছে। খালি চোখে তাকানো যায় না। রোদচশমায় তাকিয়ে দেখছিলাম বরফে সূর্যের তীব্র আলোর প্রতিফলন। অসাধারণ অপার্থিব। প্রতিমুহূর্তে বিমোহিত হয়েছি। পথের নৈসর্গিক দৃশ্য, মন্দাকিনীর সবুজ সুন্দর প্রবাহ, অসংখ্য ঝরনা, পাহাড়ের গা বেয়ে পাথর চিরে ছুটে যাচ্ছে প্রচণ্ড বেগে, কোথাও বা ঝিরঝিরিয়ে।

জীবন কী সুন্দর! চারপাশের শ্বেতশুভ্র তুষার ওপরে গাঢ় নীল আকাশ—চারপাশে আশ্চর্য আলো! অবাক বিস্ময়ে দেখছিলাম, শাদা বরফের শৃঙ্গ হিমালয়কে, শৈবতীর্থ কেদারনাথ শৃঙ্গকে।