দৃষ্টিনন্দন শট, দারুণ ব্যাটিং, স্কয়ার কাট করে বল পাঠিয়ে দিলেন সীমানার বাইরে। খেলার সময় বাংলাদেশ বেতার খুললে এমন কথা শোনা যায় প্রায়ই। কয়েকটি কণ্ঠ আপনার সামনে খেলা তুলে ধরেন প্রতিনিয়ত।
কৃষিকাজের মাঠ কিংবা চলাচলের সময় বাস, ট্রেন খেলাপাগল মানুষের জন্য রেডিওই ভরসা। আর ভরসায় পাশে থাকেন খোদা বকস মৃধা, চৌধুরী জাফরউল্লাহ শারাফাত, আলফাজ উদ্দিন আহমেদ ও আনোয়ার কবিরের মতো কিছু মানুষের কণ্ঠ।
রেডিওর মাধ্যমে মানুষদের খেলার ধারাবিবরণী শোনানো এসব মানুষের গল্পও একটু অন্যরকম, তাদের সবাই বিভিন্ন পেশায় জড়িত। কেউ জাতীয় সংসদ সদস্য, কেউ শিক্ষক, কেউ ব্যবসায়ী কেউবা ব্যাংকার। তবে খেলার সময় ঠিকই ছুটে আসেন বেতারে। মানুষকে শোনান খেলার কথা। ক্রিকেট, ফুটবল কিংবা হকি, ধারাভাষ্যতেই কাটে তাদের সময়, তাদের জীবন।
এই তালিকায় ছিলেন জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার বজলুল হুদা চৌধুরী এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরীদের মতো মানুষও।
বিভিন্ন বয়স এবং ‘পেশার’ এই ধারাভাষ্যকারদের সঙ্গে কাজ করছেন তরুণ ধারাভাষ্যকার আনোয়ার কবির। ২০১২ সালে বাংলাদেশ বেতারে যোগ দেয়া এই ধারাভাষ্যকার ইতোমধ্যে কাজ করেছেন দুটি বিশ্বকাপে। সুযোগ হয়েছিলো সর্বশেষ ভারতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি যাওয়ার। সেখান থেকেই দেশবাসীকে শুনিয়েছেন খেলার কথা।
তবে তরুণ এই ধারাভাষ্যকারের উঠে আসার গল্প বেশ করুণ ও অনেক সংগ্রামের। ১৯৮৩ সালে মনপুরা উপজেলার চরফয়েজউদ্দিন গ্রামে জন্ম নেয়া আনোয়াররে পরিবারে কোনো অভাব ছিলো না।
তবে ১৯৯৫ সালে ক্লাস ফোরে পড়ার সময় হঠাৎ তার পরিবারে দুর্গতি নেমে আসে। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ার পর অভাবের তাড়নায় ছাড়তে হয় পড়াশোনাকে। বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান। একটা সময় চলে যান বড় ভাইও। সব দায়িত্ব তখন আনোয়ারের উপর।
ছোট কাঁধে বড় দায়িত্ব নিয়ে তখন পরিবারকে এগিয়ে নিতে থাকেন। কখনও নৌকা চালিয়ে, কখনও কৃষিকাজ করে পরিবারের জন্য কাজ করতে থাকেন। সেই কৃষিকাজের সময়ই শুনতেন রেডিও। ১৯৯৭ সালে প্রথম রেডিওতে শোনেন খোদা বকস মৃধা ও জাফরউল্লাহ সারাফতের কণ্ঠ।
তখন থেকেই তার স্বপ্ন ধারভাষ্যকার হবেন। এলাকায় ছোটো ছোটো খেলায় ধারাভাষ্য দিতেও থাকেন। তার নাম ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশে।
একটা সময় পরিবার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে থাকে। কিন্তু তিনি আর পরিবারের সঙ্গে থাকতে চান না। তার স্বপ্ন আরো বহুদূরের। আশপাশের সবাই তাকে বাধা দিতে থাকে। একটা সময় বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। সাড়ে চার হাজার টাকার মূলধন নিয়ে শুরু করেন একটি চায়ের দোকান।
সেই চায়ের দোকান থেকেই ঘুরতে শুরু করে তার ভাগ্যের চাকা। একটা সময় চিন্তা করেন আবার শুরু করবেন পড়াশোনা। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করে না। যাকেই জিজ্ঞাসা করেন সেই হেসে উঠেন।
কিন্তু দমে যাননি। ফৈজুউদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গেলে তাকে হেডমাস্টার ভর্তি করতে চায়নি। কিন্তু হাল ছাড়েননি। চেষ্টা চালিয়ে যান। একটা সময় ক্লাস সেভেনে ভর্তি হন। বয়স তখন ১৭, সবাই হাসাহাসি করতে থাকে। পড়াশোনা থেকেও তিনি অনেক দূরে। প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় সব বিষয়ে ফেল করলেন। তখনও ধারাভাষ্য চলছিলো।
হেডমাস্টার তাকে বের করে দিতে চাইলে আরেকটা সুযোগ চান তিনি। দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষাতেই হলেন তৃতীয়। আর বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হন।
এরপর ২০০৫ সালে হাজিরহাট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উপজেলায় তৃতীয় হন এবং ২০০৭ সালে মনপুরা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতে উপজেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেন।
সবাই তখন পড়াশোনা ছেড়ে দেয়ার কথা বললেও তিনি ঢাকা যেতে চান। পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্বেও সুযোগ পান। তবে শেষ পর্যন্ত ভর্তি হন তিতুমীর কলেজের ইংরেজি সাহিত্যে।
তবে ধারাভাষ্যকার হবার স্বপ্ন তখনও রয়ে গেছে। এই স্বপ্ন পূরণ করতেই ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব কলা কেন্দ্রে। আঞ্চলিকতা মুছে প্রমিত বাংলা উচ্চারণ শিখলেন।
বাংলাদেশ বেতারে ধারাভাষ্যকার হওয়ার জন্য আবেদন করলেন। তার সাক্ষাতকার নিলেন খোদা বকস মৃধা। পছন্দও হলো। কিন্তু ২০১২ সালে এর এক সপ্তাহ পরেই চিরবিদায় নেন খোদা বকস মৃধা। নিজের আইডলের সঙ্গে কাজ করতে না পারার দুঃখ থেকে যায় তার।
তবে এর কিছুদিনই সুযোগ হয় চৌধুরী জাফরউল্লাহ সারাফতের সঙ্গে কথার। তিনিই মূলত আনোয়ারকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘আমি চৌধুরী জাফরউল্লাহ সারাফত বলছি। ওয়েলকাম টু বাংলাদেশ বেতার।’
আনোয়ার বলেন, এই অনুভূতি বলে বোঝানোর মতো নয়। এর পরে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
সামনের গল্প শুধু সাফল্যের। ২০১২ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার খেলায় প্রথম ধারাভাষ্য দেন আনোয়ার কবির। এরপর থেকেই বাংলাদেশ বেতারের চেনা কণ্ঠ তিনি।
সর্বশেষ ইডেন্স গার্ডেনে ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি ফাইনালের ধারাভাষ্য দিয়েছেন, সঙ্গে ছিলেন তার আদর্শ চৌধুরী জাফরউল্লাহ সারাফত।