কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার এবং ঘাতকরা তার পরিচিত।’ মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি এ বিষয়ে অনেকটা নিশ্চিত হলেও এখনই ঘাতকদের গ্রেফতারে কোনো অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেই তাদের। সব দিক দেখেশুনে তদন্তের সব ধরনের কলাকৌশল অনুসরণ করে ধীরগতিতে এগোচ্ছে সিআইডি। শুক্রবার সিআইডি-কুমিল্লার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
সিআইডি সূত্র জানায়, তনুর দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ফলাফল যা-ই আসুক, সিআইডি এ মামলার তদন্তের শেষ পর্যন্ত দেখবেই। এরই মধ্যে সিআইডি সন্দেহভাজনদের মোবাইল কল লিস্ট, তনুর পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, বিভিন্নজনকে জিজ্ঞাসাবাদ ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের একটি লিস্ট তৈরি করেছে। তবে সিআইডি এখনই তাদের আটক করে কোনো ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। ঘাতকদের শনাক্তে সর্বাধুনিক ডিএনএ প্রযুক্তির সহায়তা নিতে যাচ্ছে সিআইডি। এ ক্ষেত্রে সিআইডি যে কোনো সময়ই আদালতের অনুমতি নিয়ে সন্দেহভাজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজটি শুরু করতে চাচ্ছে বলেও সিআইডি সূত্র নিশ্চিত করেছে। সিআইডি সূত্র আরো জানায়, তনুর ঘাতকদের শনাক্ত করতে লিস্টের সন্দেহভাজনদের হাতের ছাপ, দন্ত, রক্ত ও বীর্যসহ শরীরের আরো কিছু অংশের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে। এ ছাড়াও তনুর শরীরে থাকা আঙুলের ছাপ ঘাতকদের থেকে বিভক্ত করতে তার স্বজন, পুলিশ, ডাক্তার, ডোমের অর্থাত্ তনুর লাশ উদ্ধার, ময়নাতদন্ত, দাফন পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের আঙুলের ছাপের ডিএনএ নেওয়া হতে পারে বলেও সিআইডি সূত্র জানিয়েছে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া কবে নাগাদ শুরু করা হতে পারে সে বিষয়ে মামলার তদন্তকারী সংস্থার কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গত ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি জঙ্গল থেকে তনুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গত ৩০ মার্চ দ্বিতীয় দফায় ময়নাতদন্তের জন্য তনুর লাশ কবর থেকে উত্তোলন ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। গত ১৪ মে কুমিল্লার আদালতে এসে পৌঁছায় নিহত তনুর সাতটি বিষয়ের ডিএনএ প্রতিবেদন। গত ১৬ মে তনুর ভেজাইনাল সোয়াবে ৩ পুরুষের শুক্রাণুু (বীর্য) পাওয়া যায়। কিন্তু এর আগে গত ৪ এপ্রিল দেওয়া প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুকে হত্যা ও ধর্ষণের আলামত না পাওয়ার প্রতিবেদন দেওয়া হয়। প্রথম ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও ডিএনএ প্রতিবেদনের তথ্যে ভিন্নতা থাকায় ঝুলে যায় দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। এদিকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. শারমিন সুলতানা দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তনুর প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিলেও গত ৭২ দিনেও দেওয়া হয়নি দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। তবে এরই মধ্যে আদালতের নির্দেশে ফরেনসিক বিভাগের চাহিদা মোতাবেক গত মঙ্গলবার তনুর ভেজাইনাল সোয়াব, দাঁত, চুল, অন্তর্বাস, কাপড়সহ সাতটি বিষয়ের ডিএনএ রিপোর্ট ফরেনসিক বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে। আগামীকাল রবিবার দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিন সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান ডা. কামদা প্রসাদ সাহা।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের ৮২ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো সিআইডির তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছে তনুর পরিবার। তনুর বাবা ইয়ার হোসেন শুক্রবার বিকালে জানান, ‘পত্রিকা পড়ে জানতে পেরেছি রবিবার দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেবেন ডাক্তাররা, জানি না কী দেবে এই প্রতিবেদনে। এবারও ডাক্তাররা ‘মৃত্যুর কারণ’ উল্লেখ করবে কি না, বা তনুর ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হয়েছে এমন কথা লিখে দেয় কি না এ নিয়ে সংশয়ে আছি।’ তিনি ময়নাতদন্তকারী চিকিত্সকদের উদ্দেশে আরো বলেন, ‘জঙ্গল থেকে আমার মেয়ের লাশ আমি নিজেই উদ্ধার করি, সেখানে তো তার স্বাভাবিক মৃত্যু হওয়ার কথা নয়, এখন তনুর মৃত্যুর কারণ আপনাদেরকেই (ডাক্তার) বলতে হবে।’ বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা কুমিল্লা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট নাজমুল আলম চৌধুরী নোমান বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আসার আগেই অনেক হত্যাকাণ্ডের রহস্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা ভেদ করেছে। কিন্তু তনুর মামলার ক্ষেত্রে সিআইডির ভূমিকা ক্রমেই সমালোচিত হচ্ছে। ডিএনএ এবং প্রথম ময়নাতদন্তের ফলাফল জটিলতা নিয়ে সিআইডি ব্যস্ত থাকায় তনুর ঘাতকরা এখন স্বস্তিতে আছে। তাই ঘাতকদের গ্রেফতারে সিআইডির এখনই অভিযান চালানো উচিত বলে তিনি দাবি করেন। এদিকে তনু হত্যা মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করেও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিমের বক্তব্য নেওয়া যায়নি।