ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষ পাড়ে তিন ক্ষতবিক্ষত লাশ

যশোরের ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষ পাড় থেকে ৩টি ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, ডাকাতির চেষ্টাকালে গ্রামবাসী গণপিটুনি দিয়ে তাদের হত্যা করেছে। তবে গ্রামবাসী জানে না, কাদের বাড়িতে এরা ডাকাতি করতে গিয়েছিল কিংবা কারাই বা তাদের গণপিটুনি দিয়েছে। গতকাল বুধবার ভোরে ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষ পাড়ে কৃষ্ণনগর গ্রামের ‘বঙ্গবন্ধু পার্কের’ মধ্যে এই তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত তিন ব্যক্তির মধ্যে একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তিনি যশোর সদর উপজেলার রূপদিয়া বাজারের চা দোকানি খোরশেদ আলম। খোরশেদের মেয়ে ও ছেলে বুধবার দুপুরে জেনারেল হাসপাতালে এসে বাবার লাশ শনাক্ত করেন। অন্য দুইজনের লাশ ‘অজ্ঞাত’ হিসেবে দাফন করেছে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম।
 
স্থানীয়রা জানান, বুধবার সকালে তারা কপোতাক্ষ পাড়ে কৃষ্ণনগর গ্রামে ‘বঙ্গবন্ধু পার্কে’র মধ্যে তিনটি লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। তাদের একজনের বয়স ৩০-৩২ এবং অপর দু’জনের বয়স ৪৫-৫০। তাদের মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্ত থাকায় গুলি নাকি ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে— তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। তবে মাথা ও মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত হলেও শরীরের অন্য কোথাও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। আর পার্কের মধ্যে সামান্য দূরত্বে তিনটি স্থানে পর পর লাশগুলো ফেলান ছিল। তিন স্থানে ছিল অনেক জমাটবাঁধা রক্ত। সকাল ৮টার দিকে ঝিকরগাছা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। সকাল থেকে এলাকার অসংখ্য মানুষ লাশগুলো দেখলেও কেউ তাদের শনাক্ত করতে পারেনি।
 
ঝিকরগাছা থানার ওসি মোল্লা খবির আহমেদ জানান, মঙ্গলবার মধ্যরাতে একদল ডাকাত উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামে হানা দেয়। ডাকাতদের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয় লোকজন সংঘবদ্ধ হয়ে ডাকাতদের ধাওয়া করে। ধাওয়া খেয়ে ডাকাতরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে একপর্যায়ে কপোতাক্ষ পাড়ের কৃষ্ণনগর গ্রামের কাটাখাল এলাকায় ‘বঙ্গবন্ধু পার্কে’র মধ্যে ৩ জনকে ধরে ধরে ফেলে উত্তেজিত জনতা। তাদের গণপিটুনিতে এই তিন ডাকাত নিহত হয়। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করেছে। 
 
তবে পুলিশ ডাকাতিকালে গণপিটুনির কথা বললেও স্থানীয় কৃষ্ণনগরের বাসিন্দারা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা এলাকায় ডাকাতির চেষ্টা বা গণপিটুনির কোনো তথ্য দিতে পারেননি। বরং তাদের ধারণা, এসব মানুষকে ধরে এনে এখানে হত্যা করে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর শরিফুল ইসলাম জানান, তিনি সকালে লোকমুখে তিনজনের মৃত্যুর খবর শুনে এখানে                 এসেছেন। তবে গতরাতে কারও বাড়িতে ডাকাতির চেষ্টা বা রাতে গণপিটুনির কথা শোনেননি। বীমাকর্মী ইসমাইল হোসেন বলেন, আমার বাড়ি পার্কের ২শ’ গজ দূরে। কিছুই জানলাম না। সকালে এসে দেখি লাশ। এটা আসলে পুলিশেরই কাজ। পুলিশই জানে এরা কারা। কৃষ্ণনগর গ্রামের মেহেদি ও মেহেরুল জানালেন, লোকজনের মুখে লাশের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসেছেন। এখানে এসে শুনছেন, এরা নাকি গতরাতে গ্রামে ডাকাতি করতে ঢুকেছিল, আর গণপিটুনিতে মারা গেছে। কিন্তু গ্রামে তো এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। রংমিস্ত্রি মশিয়ার রহমান, মাছ ব্যবসায়ী ফকির আহমেদও বললেন একই কথা। সকালে ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে ঝিকরগাছা পুলিশের এসআই আকরাম হোসেন চৌধুরী লাশ ৩টির সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেছেন। তিনি জানান, নিহতদের তিনজনের মাথার সামনে, পেছনে এবং কানের পাশে আঘাতের একাধিক চিহ্ন রয়েছে।
 
দুপুরে শনাক্ত হওয়া খোরশেদ আলম (৫০) শার্শা উপজেলার কাগজপুকুর গ্রামের আলম আলী সরদারের ছেলে। তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে সদর উপজেলার চাউলিয়া গ্রামে সপরিবারে বসবাস করতেন। খোরশেদের মেয়ে সুমি জানান, ‘তার বাবা সোমবার নাভারণে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যান। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও তাকে পাওয়া যায়নি। ‘ঝিকরগাছায় তিন অজ্ঞাত ব্যক্তি মারা গেছেন’ শুনে ছোটভাই মনির হোসেনকে নিয়ে আমি হাসপাতালে আসি। তখন আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের লোকেরা লাশ তিনটি দাফনের জন্য নিয়ে যাচ্ছিল। আমরা বাবার লাশ চিনতে পারি। কর্তব্যরত পুলিশকে বলে লাশটি নিয়ে যাচ্ছি। সুমি জানান, একটি ‘বিশেষ ঘটনার কারণে’ তারা শার্শার কাগজপুকুরে না থেকে সদর উপজেলার চাউলিয়া গ্রামে ভাড়া বাসায় থাকতেন। তবে ‘বিশেষ কারণ’ কী তা তিনি স্পষ্ট করেননি। নিহত অন্য দুই ব্যক্তির লাশ ‘অজ্ঞাত’ হিসেবে বুধবার দুপুরে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামকে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। ঘোপ কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান আঞ্জুমানের কর্মকর্তা শেখ জাফরউদ্দিন কচি।
 
এর একদিন আগে সোমবার মধ্যরাতে ঝিকরগাছার ওয়াপদা বস্তি এলাকায় ডাকাতদের ছুরিকাঘাতে এএসআই তৌহিদুল ইসলাম আহত হন। বর্তমানে তিনি যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আছেন। নিহতরা ওই হামলার সাথে জড়িত কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে ওসি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে ওয়াপদা বস্তি এলাকায় তাণ্ডব চালায় পুলিশ ও সাদা পোশাকের মুখোশধারী একদল যুবক। তারা বস্তির দরিদ্রদের বাড়ি-ঘর ভেঙে তছনছ ও লুটপাট করেছে বলেও অভিযোগ। এরপর পুলিশ ওই পরিবারগুলোকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। বুধবার ওই পরিবারগুলো একে একে এলাকা ছেড়ে যাচ্ছে বলেও তারা জানিয়েছেন।