মেগাসিটি ঢাকা ক্রমেই আরো কংক্রিটময় হয়ে উঠছে। আর অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রভাবে আশঙ্কাজনক হারে কমছে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের জলাভূমি। জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ-বিসিএএস-এর এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ৫৩ বছরে ঢাকা ও এর আশেপাশে জলাভূমি, নিম্নাঞ্চল ও কৃষিজমি ভরাট হয়েছে ৮৪ শতাংশ। বিশ্বের ৯টি শহরের উপর পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রভাবে ঢাকায় ভয়াবহ হারে কমেছে জলাভূমি ও কৃষিজমি।
পরিবেশবিদদের শঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে ঢাকা ও এর নাগরিকদের জন্য অপেক্ষা করছে দুর্বিষহ সময়। কারণ জলাভূমির মাধ্যমে জল চুঁইয়ে ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডার তৈরি হয়। জলাভূমিতে তৈরি হওয়া এমন অনেক উদ্ভিদ আছে, যারা অন্যান্য অনেক গাছের থেকে বেশি কার্বন শোষণ করে এবং অনেক অক্সিজেন তৈরি করে। বহু ধরনের প্রাণের সঞ্চার হয় জলাভূমিতে। এই উত্পাদিত প্রাণের অনেকগুলো যেমন মানুষের খাদ্য, আবার অনেকগুলো অন্যান্য প্রাণির খাদ্য। জলাভূমি পরিবেশের উষ্ণায়ন কমাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। জলাধার সংরক্ষণ আইনে জলাভূমি ভরাটে কড়াকড়ি থাকলেও একটি স্বার্থান্বেষী মহল এ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যত্ প্রজন্মের স্বার্থে এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে হারিয়ে যাওয়া জলাভূমি উদ্ধার এবং তা সংরক্ষণ জরুরি বলে মনে করছেন।
‘ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং’ (আইডাব্লিউএম) এর ২০১৩ সালের গবেষণার তথ্য মতে, ১৯৭৮ সালে ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় জলাভূমির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৯৫২ হেক্টর। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৩৫ হেক্টরে। এতে দেখা যাচ্ছে যে, গত ৩৬ বছরে ১ হাজার ১৭ হেক্টর জলাভূমির পরিমাণ কমেছে। আইডব্লিউএমের তথ্য মতে, ১৯৮৮ সালের পর দুদশকে বেশির ভাগ জলাশয় ভরাট করা হয়েছে। ১৯৮৮ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যেই ঢাকার প্রায় অর্ধেক নিম্নভূমি বিলীন হয়ে গেছে।
জানা গেছে, ‘প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০’ এ নদী, খাল, বিল, দীঘি, ঝরণা বা জলাশয় হিসাবে মাষ্টারপ্ল্যানে চিহ্নিত বা সরকার, স্থানীয় সরকার বা কোনো সংস্থা কর্তৃক, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, বন্যা প্রবাহ এলাকা হিসাবে ঘোষিত কোনো জায়গা এবং বৃষ্টির পানি ধারণ করে এমন ভূমিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব ভরাট আইনত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ রাজধানীর খালগুলোকে সংকুচিত করে নির্মাণ করা হয়েছে বক্স কালভার্ট। এতে ক্রমেই হারিয়ে গেছে রাজধানী এবং আশপাশের খাল-বিল ও জলাভূমি।
অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা নিম্নভূমি তথা প্লাবনভূমিগুলোর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য জলাভূমি সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। একটি শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ২৫ ভাগের বেশি জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল থাকা প্রয়োজন। অথচ নগরায়ণের নামে ঢাকা ও এর আশপাশে বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল ভরাট ও দখল করা হয়েছে।
পানি নিষ্কাশন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত ঢাকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বাড্ডা, সাঁতারকুল, খিলক্ষেত, রামপুরা, দক্ষিণ ও উত্তরখানের বেশিরভাগ এলাকায় একসময় জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল ছিল। গত এক যুগে এই জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চলের ৯০ শতাংশ ভরাট হয়ে গেছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের বাইরে কিছু কৃষিজমি ও জলাশয় থাকলেও তা ধ্বংস হচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। ঢাকা মহানগরের ৩৫৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে বর্তমানে জলাভূমির পরিমাণ ৭০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে আবার রমনা পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, সংসদ ভবন লেক, ধানমণ্ডি, উত্তরা, বনানী, গুলশান লেকসহ মোট ১০টি পার্ক ও লেক মিলিয়ে ২০ কিলোমিটার এলাকা রয়েছে। অথচ এক যুগ আগেও ঢাকায় জলাভূমি ছিল ১০০ কিলোমিটারের বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহমান কাল থেকে মানুষের জীবনের সঙ্গে জলাভূমির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। জীববৈচিত্র্যের আবাস এসব জলাধার। কিন্তু দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমি যেমন কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে পতিত ও অনাবশ্যক জমি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে জলাভূমি। ফলে দিন দিন তা দখল ও ভরাট করে গড়ে উঠেছে স্থাপনা। তাদের মতে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক জলাধারগুলোকে চিহ্নিত করে এর নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের এখই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, যেভাবে জলাভূমি ভরাট করে বাড়ি-ঘর তৈরি করা হচ্ছে, তাতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকছে না। এর ফলে নগরবাসী নিজেরাই একসময় ভুগবেন, সে আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ এর সিনিয়র গবেষক ড. আবু ছৈয়দ বলেন, ঢাকায় প্লাবনভূমি যেমন থাকার কথা তেমন আর নেই। আমাদের ধ্বংস আমরা নিজেরাই ডেকে আনছি।