লাউয়াছড়ায় ২৫ হাজার গাছ কাটতে চায় রেলওয়ে

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এলাকায় রেলপথের দু পাশের গাছ কাটতে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। নির্বিঘ্নে ট্রেন চলাচলের জন্য ও দুর্ঘটনা এড়াতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এই উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এতে আপত্তি জানিয়ে বন্যপ্রাণী বিভাগের কর্মকর্তা চিঠির জবাবে বলেছেন, রেলওয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী  রেলপথের দু পাশের ৫০ ফুট পর্যন্ত সকল গাছ কাটা হলে উদ্যানের প্রায় ২৫ হাজারের বেশি গাছ কাটা পড়বে এবং এতে অসংখ্য বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল লাউয়াছড়ার জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। এদিকে রেলওয়ে ইতোমধ্যেই লাউয়াছড়া উদ্যান সংলগ্ন কমলগঞ্জের রাজকান্দি রেঞ্জ এলাকার সংরক্ষিত বনের ২ কি.মি. এলাকায় রেলপথের দু পাশের চার সহস্রাধিক গাছ কাটার কাজ শুরু করে দিয়েছে।
 
১৯৯৬ সালে পশ্চিম ভানুগাছের সংরক্ষিত বনের ১২৫০ হেক্টর জায়গা নিয়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। বন বিভাগের    তথ্য মতে এই বনে বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় বেশ কিছু বন্যপ্রাণীর বসবাস। জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পর থেকেই এখানে গাছ চুরির মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্যানের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে ট্রেনে দুর্ঘটনা ও ঝুঁকি এড়ানোর জন্য রেলওয়ে শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ স্টেশন পর্যন্ত রেলপথের দু পাশের ৫০ ফুট পর্যন্ত গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রেলওয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক লাউয়াছড়া বনের সংযুক্ত রাজকান্দি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে রেলপথের দু পাশে দুই কি.মি. এলাকায় সামাজিক বনায়নের গাছ কাটা শুরু হয়েছে। কমলগঞ্জের রাজকান্দি রেঞ্জ কর্মকর্তা শেখর রায় চৌধুরী জানান, রেলপথের দুই কি.মি. এলাকায় সামাজিক বনায়নের প্রায় ৪ হাজার গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। ইতোমধ্যে মাগুরছড়া এলাকায় প্রায় ৫শ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এদিকে জাতীয় উদ্যান এলাকায় রেলপথের দু পাশে গাছ কাটার জন্য বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
 
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, গত ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ মো. আরমান হোসেন স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, ঢাকা-সিলেট রেলপথের শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সেকশনের ২৯৩/১ থেকে ২৯৮/১ কিলোমিটারের পাহাড়ি এলাকায় ঝড়-বৃষ্টিতে গাছ উপড়ে ও ভেঙে রেলপথের ওপর পড়ছে। এতে যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ও যাত্রীসাধারণের প্রাণহানি ঘটতে পারে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের ২১ এপ্রিল রাতে ঝড়ে ৩০-৩৫টি গাছ রেলপথের ওপর ভেঙে পড়ে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। এছাড়া চলতি বছরের ৭ এপ্রিল রাতে ঝড়ে আরো ৩০টির মতো গাছ রেলপথের ওপর পড়ে। এতে আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস ইঞ্জিনের একটি হেডলাইট ভেঙে যায় ও ট্রেনটি আটকা পড়ে। এ অবস্থায় উদ্যান এলাকার রেললাইনের উভয় পাশের ন্যূনতম ৫০ ফুট পর্যন্ত গাছ কাটতে হবে। নইলে পরবর্তী সময়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ‘দ্য রেলওয়েজ অ্যাক্ট, ১৮৯০’-এর ১২৮ ধারা মোতাবেক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
 
গত ১২ মে রেলওয়ের চিঠির জবাবে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মিহির কুমার দে চিঠিতে লিখেছেন, মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া উদ্যানটি ১৬৭ প্রজাতির বৃক্ষ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ীসহ অসংখ্য বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল। এর ভেতরে শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সেকশনের রেললাইনের ২৯৩/১ থেকে ২৯৮/১ এই পাঁচ কিলোমিটারের উভয় পাশে ৫০ ফুট এলাকার মধ্যে জরিপে দেখা গেছে, এখানে পাঁচ বছর থেকে শতবর্ষী ও তার অধিক বয়সী ২৫ হাজারের বেশি গাছ রয়েছে। এ ছাড়া এই এলাকার প্রতি বর্গমিটারে আছে ২০টি করে চারাগাছ ও অন্যান্য লতাপাতা-ঝোপঝাড়। যেখানে বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য বন্যপ্রাণি বাস করে। এই বিপুলসংখ্যক গাছ কাটা পড়লে বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছে বন্যপ্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ। তাদের মতে, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান সরকার ঘোষিত সংরক্ষিত এলাকা এবং এই বনাঞ্চল থেকে সব ধরনের গাছ কাটা ও অপসারণ নিষিদ্ধ। পরবর্তীতে গত ১৮ মে রেলওয়ে থেকে বন কর্মকর্তাকে পুনরায় চিঠি দিয়ে বলা হয়, রেলপথের উভয় পাশের গাছপালা কাটার অনুরোধ জানানো হলেও এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে গাছগুলো না কাটলে রেলওয়ে আইন অনুযায়ী রেল কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে।
 
বাংলাদেশ রেলওয়ে সিলেটের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মুজিবুর রহমান ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চিঠি দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে ইত্তেফাককে বলেন, গাছ কাটার বিষয়ে দুই বছর আগ থেকে লেখালেখি হয়েছে। জয়েন্ট সার্ভেতে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সামাজিক বনায়নের বাইরে কিছু গাছ আছে সেগুলো কাটার জন্য এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, রেল চালাতে হলে বৃহত্তর জনস্বার্থে এই গাছগুলো কাটতে হবে। বন্যপ্রাণি বিভাগ এগুলো না কাটলে রেলওয়ে ডিপার্টমেন্ট কেটে ফেলবে। তিনি আরও বলেন, ২৫ হাজার গাছ কাটতে হবে না। বন্যপ্রাণি বিভাগ একগুঁয়েমি করছে।
 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিহির কুমার দে বলেন, বনের ভেতর দিয়ে রেললাইন থাকলে কিছু ঝুঁকি থাকবে। রেললাইনের পাশে বিপুলসংখ্যক ভালো গাছ আছে। এসব গাছ কাটা হলে পরিবেশ, উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি হবে। তিনি বলেন, সরকারি গাছ চাইলেই কাটা যাবে না। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য আইনগতভাবে ভ্রান্ত। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নিজে গাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ নিলে রিজার্ভ ফরেষ্ট এ্যাক্ট আইনে মামলা করা হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।