কোপা সেন্টারিও’র ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি দ্ব্যর্থ কণ্ঠেই বলেছিলেন— ‘আমি জানি না, এটা আমার জন্য জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জয়ের জন্য শেষ সুযোগ কি-না। কিন্তু আমরা অবশ্যই এটা জিততে চাই, আমাদের ইতিহাস পরিবর্তন করতে চাই এবং চ্যাম্পিয়ন হতে চাই।’ কিন্তু কথা রাখতে পারলেন না তিনি। আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ২৩ বছরের শিরোপা খরা রয়েই গেল। শিরোপার খুব নিকটে এসে হতাশ হলো আর্জেন্টিনা। একবার-দুইবার নয়, টানা তিন বছর তিনটি বড় প্রতিযোগিতার ফাইনাল খেলে ট্রফিতে হাত না রাখার বেদনায় পুড়ছে দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি। আর এই ব্যর্থতার কাছে নতি স্বীকার করে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে দিলেন বর্তমান দুনিয়ার সেরা ফুটবলার মেসি!
আর্জেন্টিনা শিবির যখন ব্যর্থতার আগুনে পুড়ছে। তখন উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভাসছে চিলি। গত বছরের পর এবারো আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার কোপা আমেরিকায় শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখলো দলটি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যেন গত বছরের এল সান্তিয়াগোর সেই ফাইনালই ফিরে এলো। এতে এক বছর পর আবারও চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরেই শিরোপা খরা কাটানোর স্বপ্ন গুঁড়িয়ে গেল আর্জেন্টিনার। নির্ধারিত আর অতিরিক্ত সময় গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতলো দেশটি।
অনেকের বিবেচনাতেই সর্বকালের সেরা দুই খেলোয়াড় পেলে আর দিয়েগো ম্যারাডোনা কোপা আমেরিকা জিততে পারেননি। মেসির সুযোগ ছিল তাদেরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। ব্যর্থতার জন্য এখন নিজেকেই দায়ী করতে হবে বার্সেলোনার এই তারকা ফরোয়ার্ডের। টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার প্রথম শটেই গোল করতে পারেননি অধিনায়ক। পরে চিলি গোলরক্ষক ক্লদিও ব্র্যাভো ঠেকিয়ে দেন লুকাস বিগলিয়ার শট। এতেই নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার পরাজয়।
কোপা আমেরিকার শতবর্ষ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত বিশেষ এই টুর্নামেন্টে ফাইনালের আগে পাঁচ ম্যাচে আর্জেন্টিনা করেছিল ১৮ গোল, চিলি ১৬। তবে নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালে জ্বলে উঠতে পারেনি কোনো দলেরই আক্রমণভাগ। প্রথমার্ধের খেলা শেষ হওয়ার আগেই দশজনের দলে পরিণত হয় দু’দল। খেলার ২৮তম মিনিটে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়েন চিলির মার্সেলো। খেলার ৪৩তম মিনিটে মার্কো রোহো সরাসরি লাল-কার্ড পেলে ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনাও। প্রথমার্ধের খেলায় একবার হলুদ কার্ড দেখতে হয় আর্জেন্টিনা অধিনায়ক মেসিকেও। এই অর্ধের খেলায় রেফারির আধিপত্য ছাড়া তেমন কিছু নজর কাড়েনি। দ্বিতীয়ার্ধের খেলাও খুব বেশি জমেনি। দু’দলই বেশকিছু গোলের সুযোগ পেলেও কেউ সফল হয়নি।
পরে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের নবম মিনিটে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ভারগাসের ডাইভিং হেড ঠেকান আর্জেন্টিনা গোলরক্ষক রোমেরো। পরের মিনিটে মেসির ফ্রি-কিকে অ্যাগুয়েরোর হেডে বল জালে ঢোকার মুহূর্তে আঙুলের ছোঁয়ায় ক্রসবারের উপর দিয়ে পাঠিয়ে চিলিকে রক্ষা করেন গোলরক্ষক ব্রাভো।
টাইব্রেকার ফিরিয়ে আনে চিলিতে গত আসরের স্মৃতি। সেবার আর্জেন্টিনা হেরেছিল ৪-১ গোলে। সেবার মেসি প্রথম শটে গোল করলেও ব্যর্থ হয়েছিলেন হিগুয়াইন ও এভার বানেগা। এবার ভিদালের প্রথম শটই রোমেরো ঠেকিয়ে দেয়ায় মনে হচ্ছিল উল্টোটাই হতে যাচ্ছে। কিন্তু মেসি দেখালেন অমার্জনীয় ব্যর্থতা। বার্সেলোনা সতীর্থ ব্রাভোকে কোনো কষ্ট দেননি, উড়িয়ে মারেন ক্রসবারের উপর দিয়ে!
চিলির নিকোলাস কাস্তিও দ্বিতীয় শটে লক্ষ্যভেদ করেন। জাভিয়ের মাশ্চেরানোও বাঁ পাশ গিয়ে গোল করে আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরান। তৃতীয় শটে আরানগুইস রোমেরোকে নড়তে না দিয়েই বল জালে পাঠান। অ্যাগুয়েরোও নিচু শটে ডান কোন দিয়ে ব্রাভোকে ফাঁকি দেন। চতুর্থ শটে ঠাণ্ডা মাথায় উপরের বাঁ কোণ দিয়ে বল জালে পাঠান বোশেজু। কিন্তু বিগলিয়ার শট ডানে ঝাঁপিয়ে ঠেকিয়ে দেন ব্রাভো। ফ্রান্সিসকো সিলভা কোনো ভুল করেননি। বল জালে পাঠিয়ে হতাশায় পোড়ান আর্জেন্টিনাকে।