ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়ে গেছে আমেরিকা। কারণ ইইউ-এর একজন শক্তিশালী সদস্য হিসেবে ব্রিটেনকে ঘিরে আমেরিকার অনেক প্রত্যাশা ছিল, বিশেষ করে রাশিয়ার হুমকি মোকাবেলায় ইইউ ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ন্যাটো যে নিরাপত্তা বিষয়ক চুক্তি সম্পাদন করেছে তার ভবিষ্যত্ নিয়ে অনেকটাই চিন্তায় পড়ে গেছে আমেরিকা। সেই দুশ্চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ন্যাটো সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বক্তব্যে। ওবামা তার বক্তব্যে ইউরোপের নিরাপত্তায় যুক্তরাজ্য আগের মতই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাবে- এমন আশাবাদই ব্যক্ত করেন। সেই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়াটাও ‘সুশৃঙ্খলভাবে’ ঘটবে বলে আশা প্রকাশ করেন ওবামা। যদিও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন গণভোটের আগে বেশ জোরের সঙ্গেই বলেছেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে গেলেও ইউরোপের নিরাপত্তার প্রশ্নে ব্রিটেন কখনই পিছু হটবে না, মিত্র দেশ হিসেবে সবসময়ই ইইউভুক্ত দেশগুলোর পাশে থাকবে। ন্যাটো ইতিমধ্যেই পোল্যান্ডে চার ব্যাটালিয়ন সৈন্য পাঠিয়ে দিয়ে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে। ওয়ারস’তে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী পোল্যান্ডে অবস্থানরত ন্যাটো বাহিনীতে যুক্তরাষ্ট্রের আরো ১০০০ সৈন্য পাঠানোর কথা রয়েছে। এদিকে ন্যাটো জোট ও মস্কোর মধ্যে উত্তেজনা আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাশিয়া ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়াকে বিচ্ছিন্ন করায় এবং ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলে চলমান যুদ্ধে রাশিয়ার অংশগ্রহণই এই উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণ। ন্যাটোর দৃষ্টিতে রাশিয়ার এই ভূমিকার কারণে ‘শীতল যুদ্ধ’ পরবর্তী বিশ্বে গৃহীত নিরাপত্তা বিষয়ক সমস্ত নিয়মনীতি লঙ্ঘিত হয়েছে।
হাইব্রিড হুমকি: রাশিয়া ২০১৪ সালে ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়াকে পৃথক করে ফেলার পর ইইউ ও ন্যাটো এক যৌথ ঘোষণায় তথাকথিত ‘হাইব্রিড হুমকি’ মোকাবেলায় নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির অঙ্গিকার করে। এই ‘হাইব্রিড হুমকি’র মধ্যে রয়েছে ইইউ ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা ও তাদেরকে মানসিক চাপে ফেলতে প্রতিপক্ষের ক্রমাগত ক্যাম্পেইন, সাইবার হামলা এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি এবং জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার হুমকি। তবে ন্যাটো প্রধান জেনস স্টটেনবার্গ একথাও বলেন যে, ন্যাটো সংঘাতের পথ বেছে নিতে চায় না, বরং সমস্যা সমাধানে রাশিয়ার সঙ্গে তারা সংলাপ চালিয়ে যেতেই আগ্রহী। তিনি বলেন, আমরা নতুন করে কোন ‘শীতল যুদ্ধ’ চাই না। কারণ শীতল যুদ্ধ এখন ইতিহাস মাত্র এবং সেটি ইতিহাস হয়েই থাকুক। তবে এর জবাবে ন্যাটোতে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার গ্রাসকো বলেন যে, নতুন কোনো ‘আয়রন কার্টেইন’ (বিশেষ ভূসীমা) নির্ধারণ সকল পক্ষের জন্যই ঝুঁকি বয়ে আনবে। বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে তিনি আরো বলেন, এরকম একটি সিদ্ধান্ত ‘সামরিক পরিণতি’ ডেকে আনতে পারে। উল্লেখ্য, ন্যাটো এবং ইইউ’র মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী এস্টোনিয়া, লাতভিয়া, লিথুনিয়া ও পোল্যান্ডে ৩০০০ সৈন্য মোতায়েন করবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং কানাডা। এর মধ্যে এস্টোনিয়ায় ৫০০ এবং পোল্যান্ডে ১৫০ জন সৈন্য মোতায়েন করার কথা ব্রিটেনের। তাছাড়া এই তিন হাজার ন্যাটো বাহিনীর নেতৃত্বও দেবে ব্রিটেনই। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন তো বলেই দিয়েছেন যে, যুক্তরাজ্যই হচ্ছে ন্যাটো বাহিনীতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সৈন্য প্রদানকারী দেশ এবং ইউরোপের নিরাপত্তা খাতে এক চতুর্থাংশ ব্যয় ব্রিটেনই করে থাকে। ক্যামেরনের একথার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিছুটা আশ্বস্ত হলেও হতে পারেন।
পোল্যান্ডের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ নিয়েও উদ্বিগ্ন ওবামা: প্রেসিডেন্ট ওবামা পোল্যান্ডের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কারণ পোল্যান্ডের ডানপন্থি সরকার দেশটির সর্বোচ্চ আদালতের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে এবং রাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলোকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করার পদক্ষেপ নিয়েছে। ওবামা বলেছেন, পোলিশ প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেজ দুদার সঙ্গে বৈঠককালে তিনি তাকে তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।