প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নির্মূলে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করে বলেছেন, ছেলেমেয়েরা কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে সেটি মা-বাবাসহ অভিভাবকদের সার্বক্ষণিক নজর রাখতে হবে। তাদের বিপথে যাওয়া থেকে থামানোর দায়িত্ব সবার। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকরাও খোঁজ-খবর রাখবেন। সবার মনে রাখা উচিত বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের কোনো ঠাঁই হবে না। বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদের বীজ অঙ্কুরিত হতে দেবে না। এদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। তাই সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিমুক্ত করতে পারবো ইনশালাহ। প্রত্যেক ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলায় জঙ্গি-সন্ত্রাসবিরোধী কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, এই সন্ত্রাসবিরোধী কমিটিগুলো কারও জঙ্গি সম্পৃক্ততা থাকলে তা খুঁজে বের করবে। একই সঙ্গে কারা বিপথে যাচ্ছে এবং কারা বিপথে নিচ্ছে তাদের শনাক্ত করাসহ জনসচেতনতা সৃষ্টি করবে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গণভবনে ?আয়োজিত এক ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতে শেখ হসিনার উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের ১৬ জেলার মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, মসজিদের ইমাম, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মতবিনিময়ের জন্য এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
দেশকে জঙ্গিবাদে নিমজ্জিত করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণকে উদ্দীপ্ত করতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা ইসলামের নাম করে মানুষ হত্যা করছে, তারা দেশে-বিদেশে আমাদের পবিত্র ধর্মের বদনাম ও ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই অশুভ শক্তির চক্রান্ত প্রতিহত করতে হবে। কারণ আমাদের ধর্মে আছে মানুষের কল্যাণে কাজ করা। কিন্তু তারা রমজানে তারাবি না পড়ে, ঈদের দিন ঈদের নামাজ না পড়ে মানুষ হত্যা করছে। এটা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার কল্যাণে কাজ করতে চাই, এটাই আমাদের লক্ষ্য। জঙ্গি দমনে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক ঘটনা ঘটেছে। আমি চাই দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে বাংলাদেশ। সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, জনগণের সমর্থন নিয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। আপনাদের নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের ফলেই এসব কাজ সম্ভব হচ্ছে। দেশবাসীও সমর্থন করছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, সবক্ষেত্রে উন্নয়ন হচ্ছে। বাংলাদেশের চলমান এই উন্নয়ন দেখে অনেকে ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেছে। দেশের এই অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করাও জঙ্গি হামলার একটা কারণ হতে পারে।
জঙ্গি হামলায় উচ্চশিক্ষিতদের জড়িত থাকার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা উচ্চশিক্ষিত, ইংরেজি মিডিয়ামে পড়াশোনা করছে, সেই ছেলে-মেয়েরা কীভাবে ধর্মান্ধ হয়ে যাচ্ছে? তারা কিভাবে নিখোঁজ হয়ে যায় পরিবার থেকে? অথচ প্রশ্ন আসে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর। এ নিয়ে রিপোর্ট দিতো মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এখন দেখা যায় অনেকে স্বেচ্ছায় গুম হয়ে এখন এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করছে। তবে আমরা এর উত্স খুঁজে বের করবো। এ ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ সবাইকে নিজ নিজ কর্মস্থল থেকে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে নির্দেশনা দেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, আমার বিশ্বাস আমরা এ অবস্থার পরিবর্তন করতে পারবো। ইসলাম ধর্মকে যেনো কেউ কলুষিত করতে না পারে সেজন্য সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। কেউ বিপথে পাঠাতে চাইলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় উন্নত দেশ হিসেবে পরিণত কর?ার লক্ষ্যমাত্রার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলবো। এ লক্ষ্যে নানা প্রকল্প রয়েছে, সেখানে বিদেশিরা কাজ করেন। তাদের নিরাপত্তা জরুরি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও এলাকার মানুষ এক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করবেন। আমরা পারবো। এ বিশ্বাস আম?ার আছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় সর্বস্তরের মানুষকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবাই একযোগে কাজ করলে সাধারণ মানুষের ভাগ্য নিয়ে কেউ ছিনিমিনি করতে পারবে না।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিকালে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের ১৬ জেলার মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে একই ধরনের মতবিনিময় করেন। জঙ্গি দমনের কৌশল নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন, ইসলামী চিন্তাবিদ, জনপ্রতিনিধিরাও মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। স্থানীয় পর্যায় থেকেও উঠে আসে বিভিন্ন মতামত। একাত্তরের চেতনায় সবাইকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ হবে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশ। আমরা শান্তি চাই, নিরাপত্তা চাই। হামলা, সন্ত্রাস চাই না। প্রত্যেক মসজিদে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলাম ধর্ম যে শান্তির ধর্ম, এই ধর্মকে কেউ যেন কলুষিত করতে না পারে, সেই সচেতনতাটা জনগণের মাঝে সৃষ্টি করতে হবে।