তরু দত্ত ভিন্ন ভাষায় কাব্য সাধক এক বাঙালি কবি

১৯ দশকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছাড়াও অপর যে বাঙালি কবি ও লেখক ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে পশ্চিমা বিশ্বের স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন, তিনি হচ্ছেন তরু দত্ত (৪ মার্চ ১৮৫৬-৩১ আগস্ট ১৮৭৭) নামে একজন স্বল্পায়ু তরুণী। তবে তরু দত্ত যুগপত্ ইংরেজি এবং ফরাসি, উভয় ভাষাতেই সাবলীলভাবে কবিতা এবং গদ্য রচনা করেছিলেন। ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালিদের পক্ষে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চা করাটা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার ছিল, কেননা ইংরেজি সাহিত্যের পণ্ডিতেরা ভারতীয় লেখকদের কঠোর সমালোচনা করতেন। তারপরও সেই যুগে তরু দত্তের রচনা প্রশংসিত হয়েছিল এবং পুনর্বার প্রকাশিত হয়েছিল। তবে তিনি তা দেখার জন্য বেঁচে থাকেননি, তিনি  ছিলেন প্রথম ভারতীয় নারী, যিনি একাধারে ফরাসি এবং ইংরেজি ভাষায় কবিতা রচনা করেছিলেন।

সাম্প্রতিক কালে তাঁর রচিত ‘আমাদের ঝাউ গাছ’(আওয়ার ক্যাসুয়ারিনা ট্রি) কবিতাটি ভারত জুড়ে বিভিন্ন স্কুলে ইংরেজি পাঠ্যসূচির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

 ‘এই ঝাউগাছ আমার আত্মার আপনজন :

এর নিচে আমরা খেলা করেছি; যদিও অনেক বছর পার হয়ে গেছে,

আমার প্রিয় সাথী, তীব্র আবেগের সাথে যাকে ভালোবেসেছি,

আমাদের জন্য হলেও, এই গাছটি চিরকাল আমাদের প্রিয় হয়ে থাকুক।’

তিন ভাই-বোনের মধ্যে তরু ছিলেন সবার ছোট। বোন অরু আর ভাই আব্জুর যেরকম ক্ষয়রোগে অকালমৃত্যু হয়েছিল, তেমনি তরু দত্তেরও ক্ষয়রোগে অকাল প্রয়াণ হয়েছিল, কেননা ১৮৭৬ সালে তিনি যখন মারা যান, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র একুশ বছর। ইংরেজ কবি জন কিটস-এর মতো তিনিও অপূর্ণ খ্যাতি নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আর তাই কেউ হয়তো ভাবতে পারেন যে, কবিতা এবং গদ্যে তিনি যে উচ্চমানের সাহিত্যকর্ম রেখে গেছেন, সেকথা বিবেচনায়, তিনি যদি তিনি আরো বেশি দিন বাঁচতেন, তাহলে না জানি কী বিশাল সাহিত্যকীর্তি রেখে যেতে পারতেন।

‘অ্যানসিয়েন্ট ব্যালাড অ্যান্ড লিজেন্ডস অব হিন্দুস্তান’ (১৮৮২) (Ancient Ballads and Legends of Hindusthan) শিরোনামে তাঁর বিখ্যাত কবিতা সংকলন ছাড়াও, তিনি ফরাসি ভাষায় ‘শিফ গ্লিন্ড ইন ফ্রেঞ্চ ফিল্ড’ (১৮৭৫) নামে একটি কাব্যসংকলন, দুটো উপন্যাস ‘লা জার্নাল দা মাদমোয়োজেল দ’ এভার্স’ (১৮৭৯) এবং ‘বিয়াঙ্কা’ বা ‘দি স্পেনিশ মেইডেন (অসমাপ্ত) রচনা করেছিলেন। সর্বশেষ উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে জানুয়ারি ১৮৭৮ থেকে এপ্রিল ১৮৭৮ পর্যন্ত বেঙ্গল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল।

তরুর অন্যতম বিখ্যাত ‘আওয়ার ক্যাসুয়ারিনা ট্রি’ কবিতাটি অ্যানসিয়েন্ট ব্যালেড গ্রন্থের শেষে তাঁর ‘বিবিধ কবিতা’ অংশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তরুর কবিতাগুলোর মধ্যে এই কবিতাটিকে সবচেয়ে অধিক দৃষ্টিগ্রাহ্য বিবেচিত করা হয়েছে এবং এর অতীত স্মৃতিবিধুরতা এবং মহিমান্বিত সৌন্দর্যের ‘অন্তর্দৃষ্টির’ জন্য ই.জি টমাস কবিতাটির ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, ‘এটি নিশ্চিতভাবে একজন বিদেশির রচিত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটি কবিতা।’ এগার লাইনের পাঁচটি পঙিক্ত নিয়ে কবিতাটি রচিত হয়েছে।

প্রথম পঙিক্ততে গাছটির বাস্তব বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে, যাতে অজগরের মতো লতাপাতার বিশাল গলবস্ত্র গায়ে জড়ানো একটি দৈত্যের ছবি কল্পনা করা হয়েছে। পরবর্তী পঙিক্ততে দিনের বিভিন্ন সময়ে গাছটি দেখে বর্ণনাকারী যে আনন্দ পান, তার বর্ণনা রয়েছে। তৃতীয় পঙিক্ততে রয়েছে মধুময় অতীত স্মৃতির মুহূর্তগুলো, বিশেষত ভাই আর বোনের সাথে কাটানো ছোটবেলার দিনগুলো। সর্বশেষ পঙিক্ততে রয়েছে জন কিটস-এর ‘ওড টু অ্যা নাইটিংগেল’-এর মতো গাছটির অনন্ত জীবনের জন্য শ্রদ্ধা।   

তাঁর পুরো নাম ছিল তরুলতা দত্ত, তবে তিনি তরু নামেই পরিচিত ছিলেন। কোলকাতার মানিকতলা স্ট্রিটে রামবাগানে তাঁর জন্ম। তিনি এমন এক পরিবার থেকে এসেছিলেন, যেখানে শিক্ষা, শিল্পকলা এবং ভাষার চর্চা হতো। তরুর বাবা গোবিন্দ চন্দ্র দত্ত ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকতা ছিলেন। তিনিও তাঁর জীবত্কালে মাঝে মাঝে কিছু কবিতা প্রকাশ করেছিলেন। তরুর মা ক্ষেত্রমনি মিত্র হিন্দু পুরাণের ভক্ত ছিলেন, তবে তিনিও ‘দি ব্লাড অব ক্রাইস্ট’ নামে একটি ইংরেজি পুস্তক বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। তাই জন্ম থেকেই তরুর রক্তে সাহিত্য ও শিল্পকলার প্রতি আগ্রহ ছিল।

তাঁর এই সংক্ষিপ্ত জীবত্কালে তরু অনেক আকস্মিক পরিবর্তন এবং মর্মান্তিক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। ১৮৬২ সালে যখন তাঁর ছয় বছর বয়স, তখন তাঁর পরিবার খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল। ১৮৬৫ সালে তাঁর ভাই আব্জু মারা যাওয়ার পর ১৮৬৯ সালে গোবিন্দ দত্ত পরিবারসহ ফ্রান্সে চলে যান। দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সে নিস শহরে দুই বোন স্কুলে ভর্তি হন। তরুর তখন তের বছর বয়স এবং সেখানেই তরু এবং তাঁর বোন অরু ফরাসি ভাষা, ইতিহাস এবং ললিত-কলার শিক্ষালাভ করেন। দুই বোনই বই পড়তে ভালোবাসতেন এবং উভয়েই ফরাসি ভাষায় যথেষ্ট ব্যুত্পত্তি লাভ করেন।

কিছুকাল পর তরুর পরিবার ব্রিটেনে চলে আসেন এবং সেখানে তিনি কেমব্রিজে লেখাপড়া চালিয়ে যান। লন্ডনে অবস্থানের সময় তাঁরা দুই বোন ফরাসি থেকে ইংরেজিতে সাহিত্যকর্ম অনুবাদ করা শুরু করেন। সেখানে তাঁর এক নতুন বন্ধু মেরি মার্টিনের সাথে চিঠিপত্রের আদানপ্রদান শুরু হয়, যিনি পরবর্তীকালে তরুর জীবনের তথ্য সম্পর্কে একটি উত্স হয়ে ওঠেন। ১৮৭৩ সালে তরুর পরিবার বাংলায় ফিরে আসেন।

১৮৭৪ সালের ২৩ জুলাই অরু মারা যান। বোনের অকালমৃত্যুতে তরু অত্যন্ত শোককাতর হয়ে পড়েন। ১৮৭৫ সালে তিনি সংস্কৃত ভাষা শেখা শুরু করেন এবং দশ মাসের মধ্যেই বিভিন্ন সংস্কৃত চিরায়ত গ্রন্থ, রামায়ণ, মহাভারত, শকুন্তলা এবং ভগবত পুরাণ পড়তে সক্ষম হন। তারপর তিনি প্রাচীন ভারতীয় লোককাহিনিগুলো সংস্কৃত থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করা শুরু করেন। তবে তিনি তাঁর রচিত ‘অ্যানসিয়েন্ট ব্যালাড অ্যান্ড লিজেন্ড অব হিন্দুস্তান’ বইটি ছাপা অবস্থায় দেখে যেতে পারেননি। ১৮৭৭ সালে ৩১ আগস্ট কোলকাতায় তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর প্রিয় ভাই ও বোনের পাশে মানিকতলা খ্রিস্টান সমাধিক্ষেত্রে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

বাংলা, ইংরেজি এবং ফরাসি—এই তিন ভাষায় তরুর দখল ছিল। তবে দেশে ফিরেই তিনি ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষায় কবিতা লেখা শুরু করেন। তাঁর প্রথম রচনা “দি ডায়েরি অব মিলি ডি’আর্ভারস” ১৮৮১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল (The Diary of Mademoiselle D'Arvers )। বইটির অলঙ্করণ করেছিলেন তাঁর বোন অরু, যিনি দীর্ঘদিন রোগে ভোগার পর মৃত্যুবরণ করেন। বোনের শোকে কাতর তরু, তাঁর ছোটবেলার সুখময় স্মৃতি নিয়ে ‘আওয়ার ক্যাসুয়ারিনা ট্রি’ কবিতাটি (Our Casuarina Tree) রচনা করেন। এই কবিতাটির মাধ্যমে তিনি তাঁর  মৃত বোনের স্মৃতি রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন।   

১৮৭৬ সালে (A Sheaf Gleaned in French Fields) ‘অ্যা শিফ গ্লিন্ড ইন ফ্রেঞ্চ ফিল্ড’ বইটির প্রথম সংস্করণ ভবানিপুরের সাপ্তাহিক সংবাদ প্রেস প্রকাশ করে। এটি ১৮ শতকের শেষভাগের এবং ১৯ শতকের প্রথমদিকের আশি জন ফরাসি কবির কবিতার ইংরেজি অনুবাদের একটি সংকলন। এতে ভিক্টর হুগো, সেইন্ট বিউভ, গথার এবং আরো অনেকের কবিতা ছিল। কবিতাগুলোর অনুবাদের সাথে বিস্তারিত টীকাও তিনি সংযুক্ত করেছিলেন। উল্লেখ্য, ২০০৭ এই অসামান্য কীর্তির জন্য ফরাসি সরকার তরু দত্তকে ফ্রাংকোফনি উত্সবে সম্মানিত করেছিলেন। তবে নিম্নমানের কাগজে ছাপা বইটি পাঠকসমাজের তেমন মনোযোগ আকর্ষণ করেনি। ভারতে অনেকেই বিশ্বাস করেননি যে এটা একজন ভারতীয় নারীর রচনা। অনেকেই মনে করতেন এটা কোনো আ্যাাংলো-ইন্ডিয়ান লোকের রচনা, যিনি বিখ্যাত হওয়ার আশায় নিজের পরিচয় গোপন করেছিলেন। আর যে পরিস্থিতিতে বইটি ছাপা হয়েছিল, তাতে ফরাসি এবং ইংরেজ পাঠকসমাজেও এর তেমন কদর হয়নি।

সৌভাগ্যবশত বইটি ফ্রান্সের কবি ও ঔপন্যাসিক এম. আন্দ্রে থিউরিয়েটের নজরে আসে এবং তিনি এর একটি ইতিবাচক সমালোচনা করেন। ১৮৭৭ সালে বইটি লন্ডনের এক্সামিনার পত্রিকার সম্পাদক প্রফেসার ডব্লিউ মিন্টোর হাতে পড়ে, তিনি বইটির একটি সমালোচনা প্রকাশের জন্য কবি ও সমালোচক স্যার এডমুন্ড উইলিয়াম গোসের (১৮৪৯-১৯২৮) হাতে তুলে দেন। বইটির চেহারা দেখে গোস প্রথমে এটা ওয়েস্ট বাস্কেটে ছুড়ে ফেলতে যাচ্ছিলেন, তবে যখন এর কবিতাগুলো পড়লেন, তখন তিনি রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেলেন। ফলে বইটির একটি প্রশংসামূলক সমালোচনা করেন, যা পরে ‘ক্রিটিকেল কিটক্যাট’ (১৮৯৬) শিরোনামের একটি সমালোচনামূলক পুস্তকে বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।

উইলিয়াম গোসের মতে, গীতিধর্মী বৈশিষ্ট্যের চেয়েও, তরুর রচনার অত্যন্ত আকর্ষণীয় দিকটি হচ্ছে, এটি উনিশ শতকের একজন ভারতীয় নারীর কাছ থেকে এসেছে। তিনি এই সত্যটির প্রশংসা করে বলেন যে, বিভিন্ন ভাষায় তরুর উল্লেখযোগ্য জ্ঞান ছিল, অথচ তিনি সেইসব দেশের অধিবাসী ছিলেন না। তিনি আরো একটি সত্য তুলে ধরেন যে, তরু তাঁর কাজে নিজস্ব মধুর স্বভাব বজায় রেখে গেছেন, কার্যকরভাবে তাঁর আবেগ তুলে ধরলেও কখনো অতি নাটকীয়তার প্রশ্রয় দেননি।

তরু দত্ত ইতোমধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন, তবে বিছানায় শুয়েও তিনি ফরাসি লেখিকা ক্লারিস বাডের রচিত ‘অন অ্যানসিয়েন্ট ওমেন ইন ইন্ডিয়া’ পুস্তকটি অনুবাদের চেষ্টা করে যান, এবং ক্লারিসকে শেষ চিঠিটিও লেখেন। তারপর মাত্র একুশ বছর ছয় মাস বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। এবং মৃত্যুর পরই তাঁর অধিকাংশ রচনা প্রকাশিত হয়। তরুর মৃত্যুর পর তাঁর বাবা, তাঁর কাগজপত্র ঘেঁটে তরুর কর্মগুলো প্রকাশের উদ্যোগ নেন। ‘অ্যা শিফ গ্লিন্ড ইন ফ্রেঞ্চ ফিল্ড’ পুস্তকটি সম্পাদনার পর ১৮৭৮ সালে দ্বিতীয় ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। এরপর লেখক ও প্রকাশক কেগান পলের সম্পাদনায় তৃতীয় সংস্করণটি ১৮৮০ সালে লন্ডনে প্রকাশিত হয়। তবে তরু অবশ্য তাঁর এই বিজয়কীর্তি দেখে যেতে পারেননি।

১৮৭৩ সালে দেশে ফিরে আসার পর কোলকাতার বাগানঘেরা বাড়িতে বসেই পরবর্তী চার বছর তরু সাহিত্যচর্চা করে চলেন। মৃত্যুর সময় তিনি দুটো অপ্রকাশিত উপন্যাস রেখে যান—লা জার্নাল দে মাদমোয়াজেল ডি’ আর্ভাস (ফরাসি ভাষায় রচিত একজন বাঙালি এবং ভারতীয় লেখকের প্রথম উপন্যাস) এবং বিয়াঙ্কা, বা ইয়াং স্পেনিশ মেইডেন (একজন ভারতীয় নারী-লেখকের প্রথম ইংরেজি ভাষার উপন্যাস)।

অ্যানসিয়েন্ট ব্যালাড পুস্তকটির ভূমিকায় উইলািম গোস বলেন, ‘তাঁর নাম... আর কোনো পাঠকের কাছে অজানা নয়।’ ভূমিকার শেষে তিনি বলেন, ‘যখন আমাদের দেশের সাহিত্যের ইতিহাস রচিত হবে, তখন সেখানে একটি পৃষ্ঠা নিশ্চয়ই এই নাজুক ভিনদেশি ফুটন্ত ফুলের গানের জন্য উত্সর্গ করা হবে। 

তরু দত্তের বিখ্যাত উপন্যাস লা জার্নাল বাংলায় অনুবাদ করেন পৃথ্রিন্দ্র মুখার্জি এবং বসুমতি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৫৬ সালে পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়। প্রেমেন্দ্রে মিত্র বইটির মুখবন্ধ রচনা করেন। অত্যন্ত কম বয়সে মারা গেলেও তিনি ইংরেজি সাহিত্যে একটি গভীর ছাপ রেখে যান। তাঁকে ইন্দো-ইংরেজি সাহিত্যের কিটস বলা হয়, কেননা তিনিও কিটস-এর (২৫ বছর বয়সে মৃত্যু) মতো অত্যন্ত কম বয়সে ভুগে ভুগে মৃত্যুবরণ করেন। সমালোচকরা তাঁকে নশ্বর বা নাজুক ফোটা ফুল হিসেবে বর্ণনা করেন, যে অতি দ্রুত শুকিয়ে মরে যায়। তাঁর সর্বশেষ কবিতা ‘অ্যা মন পেরে’ (A Mon Pere) বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয় এবং কবিতাটিকে একটি নিখুঁত রচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তরুর কাব্যগ্রন্থের সমালোচনামূলক প্রবন্ধে লেখক ও সমালোচক ই.জে. থমসন তাঁর সম্পর্কে বলেন, ... তরু দত্ত অত্যন্ত বিস্ময়কর একজন নারী ... এই কবিতাগুলোই যথেষ্ট, তরু দত্তকে সেই নারীদের ক্ষুদ্র তালিকায় স্থান দেবার জন্য, যাঁরা গুণমানে প্রমিত বা স্বীকৃত মানের ইংরেজি কবিতা রচনা করেছেন।

যে বাগানঘেরা বাড়িতে প্রকৃতিপ্রেমী তরু জীবনের শেষদিনগুলো কাটিয়েছিলেন, সেখানকার গাছ, ফুল, লতাপাতার প্রতি তাঁর যে গভীর মমত্ববোধ ছিল, তা তাঁর কবিতায় যথাযথ প্রতিফলিত হয়েছে। এখানে প্রকৃতি নিয়ে রচিত তাঁর দুটি কবিতার অনুবাদ তুলে ধরা হলো :

 

ভালোবাসা এসে ফ্লোরার কাছে একটি ফুল চাইল

ভালোবাসা এসে ফুল আর বসন্তের দেবী-ফ্লোরার কাছে একটি ফুল চাইল

যে হবে সকল ফুলের অবিসংবাদিত রানি,

লিলি আর গোলাপ, অনেক, অনেকদিন ধরে

এই উচ্চ সম্মানের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ক্ষমতার চারণেরা

ওদের দাবির কথা গেয়ে শোনাচ্ছিল। ‘গোলাপ কখনো

ফ্যাকাশে লিলির মতো উঁচু হতে পারবে না, তার সুন্দর চেহারা নিয়ে’—

‘কিন্তু লিলি তো আরো সুন্দর না?’ আর এভাবেই

ফুলের-দলাদলিতে মানস নিকুঞ্জে বিবাদের ঘণ্টা বেজে উঠলো।

‘আমাকে একটি ফুল দাও গোলাপের মতো মনোরম

আর অহংকারী লিলির মতো দৃষ্টিনন্দন’—

তাহলে রঙের কী হবে?’—‘লাল-গোলাপ’, ভালোবাসার প্রথম পছন্দ,

তারপর সে মিনতি করলো—‘না, সাদা-লিলি-কিংবা দুটোই দাও;’

আর তাই ফুলের দেবী-ফ্লোরা দিলেন পদ্ম, ‘ লাল-গোলাপের’ রঙের,

আর ‘সাদা-লিলি’-ফুলের রানির রূপে যে, প্রস্ফুটিত হলো।

 

সনেট

আমাদের বাগানকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে এক সাগর পত্রসম্ভার

তবে সে নয় কোনো নিষ্প্রভ, বৈচিত্র্যহীন সবুজ সাগর,

এখানে সব রঙের তীব্র বৈষম্যের বাহার রয়েছে;

উপচে পড়া হালকা সবুজ তেঁতুল গাছ শোভা বাড়িয়েছে

 ঝাড় বেঁধে লাগানো গাঢ় সবুজ রঙের আম গাছের মাঝে,

আর এর মাঝে মাঝে ধূসর স্তম্ভের মতো তাল গাছ উঠে গেছে;

আর শান্ত পুকুরের ওপর শিমুল গাছ ঝুঁকে রয়েছে,

লাল-লাল, হঠাত্ ভেড়ি  বাজানোর শব্দে চমকে ওঠার মতো।

তবে এর চেয়ে সুন্দর আর কিছুই হতে পারে না সারি সারি

পুবদিকের সেই বাঁশঝাড়, আর যখন চাঁদ

এর ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেয়, আর শ্বেতপদ্ম রঙ বদলে

রুপালি পেয়ালার মতো হয়। তখন কেউ হয়তো মূর্ছাই যাবে 

এই অপরূপ দৃশ্য দেখে মাতাল হয়ে, কিংবা তাকিয়েই থাকবে তাকিয়েই থাকবে

মহাবিস্ময়ে হয়ে এক আদিম স্বর্গের দিকে।