জঙ্গিবাদ রুখতে চাই জনগণের ঐক্য

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া জঙ্গি হামলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সময়ের মত দল-মত, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবাইকে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। সেই  সঙ্গে দেশি-বিদেশি সকল চক্রান্ত নস্যাত্ করতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশ গভীর সংকটে পড়বে। গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সেক্টর কমান্ডারস্্ ফোরাম আয়োজিত ‘জঙ্গিবাদী অপশক্তির উদ্বেগ ও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে অংশ নিয়ে তারা এ কথা বলেন।
 
জাতীয় সংলাপে অংশ নেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হাসান বাদশা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান, সাবেক সেনা প্রধান লে. জে (অব.) হারুন-অর-রশীদ, শিক্ষাবিদ ড. আনোয়ার হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মহিউদ্দিন আহমেদ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ শফিকুর রহমান, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইশফাক ইলাহী চৌধুরী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম. হামিদ, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার প্রমুখ। ফোরামের সহ-সভাপতি নূরুল আলমের সভাপতিত্বে সঞ্চালনা করেন মহাসচিব হারুন হাবীব।
 
তথ্যমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক সময় গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলা প্রমাণ করে যারা জঙ্গি-সন্ত্রাসী তারা নামাজ না পড়ে হামলা করে, তারা মানুষরূপী দানব। তারা ইসলামের হাজার বছরের রীতি-নীতিতে বিশ্বাস করে না। এ আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের রীতি-নীতি ধ্বংস ও অসাম্প্রদায়িক সরকারকে বিপদে ফেলা। খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, তিনি যদি জামায়াত-যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখতেন, তাহলে বাংলাদেশ থেকে জঙ্গিবাদ অনেক আগেই দূর হত। তিনি জামায়াত-জঙ্গিবাদ সঙ্গ না ছেড়ে বারবার পরীক্ষায় ফেল করছেন। তিনি বলেন, জঙ্গিদের সঙ্গে কোনো সমঝোতা সম্ভব না। তাদেরকে নির্মূল করতে হবে, ধ্বংস করতে হবে। এর জন্য জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।
 
খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গিবাদ দমনে আমরা অবশ্যই বিদেশি সাহায্য-সহযোগিতা নেবো, কিন্তু এমন কোনো সহযোগিতা নেয়া হবে না যাতে বাংলাদেশর স্বার্থহানি হয়, সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট হয়।
 
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দলীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতার বাইরে এসে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।
 
ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, জামায়াতকে বাদ দিয়ে জঙ্গিবাদের হিসাব করা যাবে না। ইসলামী ব্যাংককে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এদেশে জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধ করা সম্ভব না। জঙ্গি মদদে এখন আর পাকিস্তানের টাকা লাগে না। ইসলামী ব্যাংক অনেক বড় ব্যবসায়ী তৈরি করেছে, তারাই জঙ্গিবাদে অর্থায়ন করছে।
 
ড. আব্দুল মান্নান বলেন, সরকারি কর্ম কমিশনের পরীক্ষা নিতে গিয়ে দেখেছি, শতকরা ৯০ শতাংশই শিক্ষার্থী বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস জানে না। কারণ, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জাতীয় সঙ্গীত ও বাংলাদেশের ইতিহাস পাঠ করান হয় না। এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা উঠে আসে, তারা জঙ্গি হওয়ার জন্য উত্কৃষ্ট হতে পারে।
 
হারুন-অর-রশীদ বলেন, জঙ্গিবাদ উত্থানের জন্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দায়ী। আর জঙ্গিবাদের উত্স ও পরিচর্যা কেন্দ্র হলো শিক্ষা ব্যবস্থা। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সবাইকে নিয়ে জঙ্গি প্রতিরোধ করতে হবে। কিন্তু তিনি তার উপায় বলেননি। সরকারকে জঙ্গি দমন করে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
 
আনোয়ার হোসেন বলেন, অনেক কঠিন মূল্য দিয়ে আমাদের বোধোদয় ঘটেছে। জঙ্গিরা যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তা রাজনৈতিকভাবে লড়তে হবে। শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করা প্রয়োজন। তা চিহ্নিত করতে না পারলে এ যুদ্ধে জয়লাভ করা যাবে না।
 
মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, সাত বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার ক্ষমতায় আছে, বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও বড় বড় সংগঠন থাকতেও আমরা হেরে যাচ্ছি। আমি আতঙ্কিত, কারণ যুক্তরাষ্ট্র আমাদেরকে জঙ্গিবাদ দমনে সহযোগিতা করতে চাচ্ছে। তাদের সহযোগিতা নিলেও সমস্যা, না নিলেও সমস্যা।
 
ডা. সারওয়ার আলী বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে সরকার যতটা আন্তরিক ছিল, জঙ্গিবাদকে ততটা গুরুত্ব দেয়নি। ধর্মের কটূক্তি বন্ধ করা যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, ধর্মের নামে বিদ্বেষ ছড়ানকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়নি।
 
মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে এ দেশে জঙ্গিবাদের বিষবৃক্ষের চারারোপণ করেছে জিয়াউর রহমান। তা আজ বড় বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। জিয়া যদি যুদ্ধাপরাধীদের দেশ ফিরিয়ে এনে রাজনীতি করার সুযোগ না দিতেন, তাহলে আজকের এ পরিস্থিতি হতো না। জামায়াত-শিবির হচ্ছে, এ দেশে জঙ্গি মদদের আঁতুড়ঘর। এদের বাদ দিয়ে জঙ্গিবাদ দমন করা সম্ভব না।
 
মোস্তফা জব্বার বলেন, বাঁশের কেল্লা নামের ৫২টি ফেসবুক পেজ, পর্নোগ্রাফি সাইটগুলো বিটিআরসি এখনো বন্ধ করতে পারেনি। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে জঙ্গিবাদ দমন করা সম্ভব না।
 
সুজনের মানববন্ধন
 
অন্যদিকে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজন। তারা বলেন, শুধু বল প্রয়োগ করে সমস্যা সমাধান হবে না। আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
 
গতকাল শনিবার রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ও শান্তি-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐক্যের আহ্বান’ শীর্ষক মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্টজন এ কথা বলেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এ মানববন্ধনের আয়োজন করে।
 
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জঙ্গিবাদ সকলের সমস্যা, জাতীয় সমস্যা। এটি মোকাবিলা করতে হবে জাতীয়ভাবে। জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় বল প্রয়োগের কৌশল নয়, প্রয়োজন সুচিন্তিত কৌশল।
 

এছাড়া বক্তব্য রাখেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ, গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুর।