ইত্তেফাকের গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

ভূ-প্রকৃতিগত এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পড়ছে। মানুষও নির্বিচারে গাছ কেটে ও বন ধ্বংস করে পরিবেশ বিপন্ন করে তুলছে। প্রকৃতিসৃষ্ট বনের আকার ও ঘনত্ব কমছে। তবে এর মধ্যে সুখবর এনেছে সামাজিক বনায়ন। এ কর্মসূচির মাধ্যমে বনায়ন ও গাছের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য পরিকল্পিতভাবে বন সংরক্ষণ ও সৃজন এবং গাছ রোপণ করতে হবে।
 
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর কাওরান বাজারে দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যালয়ে মাজেদা বেগম মিলনায়তনে এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০১৬ উপলক্ষে এ বৈঠকের আয়োজন করে দৈনিক ইত্তেফাক। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ও এক্সপ্রেশন লিমিটেড আয়োজনে সহায়তা করে। এ বছর বৃক্ষরোপণ অভিযান ও মেলার শ্লোগান হলো—“জীবিকার জন্য গাছ, জীবনের জন্য গাছ।”
 
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, গাছ মানুষের জীবন ও জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ, এই অনুভূতি সমাজের সকল স্তরে তৈরি করতে হবে। বনায়ন কর্মসূচির সঙ্গে সকল শ্রেণির মানুষের স্বার্থের সমন্বয় করা জরুরি। স্থানীয় জনগণকে বন সংরক্ষণের কাজে দায়িত্বশীল ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করতে না পারলে টেকসই বনায়ন সম্ভব হবে না।
 
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, এ বছরের বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার প্রতিপাদ্য আমাদের দেশের জন্য খুবই যথার্থ। আমাদের বন রক্ষায় যেমন কাজ করতে হবে তেমনি সচেতনতাও বৃদ্ধি করতে হবে। বন বিভাগের অনেক ভূমি দখলে আছে তা মুক্ত করতে রেল মন্ত্রণালয়ের মতো নতুন আইনের সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয় বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, আইন বহু আছে তারপরও সরকার ১৯২৭ সালের বন আইনকে সময়োপযোগী করার জন্য কাজ করছে। জীব বৈচিত্র্য আইন-২০১৬ ইতোমধ্যে পাস হয়েছে। বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন আছে। এখন আমাদের দক্ষ জনগোষ্ঠী সৃষ্টির দিকে নজর দিতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। প্রধান বন সংরক্ষক মোঃ ইউনুস আলী বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় একটা বিশাল শূন্যতা আছে। যা দূর করতে জাতীয় ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা প্রয়োজন বলে তিনি গুরুত্ব দেন।
 
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. রইছ উল আলম মন্ডল বলেন, ভূপ্রকৃতি অনুযায়ী গাছ রোপণ করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে সবুজায়ন কার্যক্রম সফল হয়েছে। এখন হাওর এলাকায় বন সৃজন করেছি।
 
বিটিআরসির সাবেক চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস বলেন, এমডিজি লক্ষ্য পূরণে সাফল্য পেয়েছি, এসডিজির লক্ষ্য পূরণেও সফল হব। পার্বত্য শান্তি চুক্তির আওতায় ওই এলাকায় বনায়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।
 
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. নূরুল করিম বলেন, দাতানির্ভর প্রকল্প না করে দেশীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে বনায়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
 
সভাপতির বক্তব্যে দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, ইকোসিস্টেম একটা ব্যবস্থাপনা, যা নিয়ে আমাদের আগ্রহ আছে। জনগণকে সচেতন করতে এই গণমাধ্যম বিষয় নিয়ে কাজ করবে। তিনি বলেন, বৃক্ষমেলায় অনেক শেখার বিষয় আছে। আমাদের দরিদ্রতা আছে, বন আমাদের সম্পদ। দরিদ্রতা দূর করতে বনকে কাজে লাগানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেন তিনি।
 
সংসদ সদস্য নূরজাহান বেগম মুক্তা বলেন, গাছ পরিবেশ রক্ষা ও সতেজ রাখার প্রধান মাধ্যম। গরিব মানুষের জন্য গাছ হলো জীবনবিমা। এটি একদিকে ছায়া, ফল ও কাঠ দেয়; অন্যদিকে বিপদের দিনে বিক্রি করে অর্থ সংস্থান করা যায়।
 
সাবেক কৃষি সচিব শেখ এনায়েত উল্লাহ বলেন, দীর্ঘমেয়াদে বন ব্যবস্থাপনায় কাজ হচ্ছে না। নব্বইয়ের দশকে তৈরি বন মহাপরিকল্পনাটিও পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা যায়নি।
 
আইইউসিএন’র দেশীয় প্রতিনিধি ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ বলেন, বৃক্ষাচ্ছাদিত বনে প্রাণ ও প্রাণীর প্রাচুর্য থাকে। বিচ্ছিন্ন বনায়নে সৃষ্ট বনে তা থাকে না। তাই প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ ও এর বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া জরুরি। দেশের যেখানে বন থাকার কথা সেখানে বন নেই।
 
অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, দেশের উন্নয়নে ভূমি সংরক্ষণে বন খাতের অবদান বেশি হলেও খাতটি অবহেলিত রয়ে গেছে। এর প্রমাণ দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে বনখাতে ক্যাডার সার্ভিস থেকে কোনো নিয়োগ হয়নি।
 
বাংলাদেশ সেন্টার ফর এডভান্সড স্টাডিজের প্রধান নির্বাহী ড. আতিক রহমান বলেন, আমাদের প্রাকৃতিক বনভূমি বাড়েনি বরং কমেছে। পরিমাণ ও জাত বিবেচনায়ও বনে গাছ কমেছে। তবে রাস্তার দুইপাশ ও বাসাবাড়িতে গাছ রোপণ বেড়েছে। পেয়ারা ও আমড়াসহ ফল চাষে একটি বিপ্লব ঘটে গেছে।
 
বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দেশের গহীন অরণ্য কমে গেছে। উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ বন বাড়াতে হবে।
 
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এ এফ এম আখতারুজ্জামান বলেন, রাবার চাষ খুবই লাভজনক। কিন্তু দেশে এটির চাষ খুবই কম হয়। কেন কম হয় তা নিয়ে গবেষণা করা দরকার।
 
সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) লেখক ফিলিপ গাইন বলেন, বৃক্ষরোপণের আর্থিক লাভের দিকটি জনগণকে জানাতে ও বোঝাতে হবে। তাহলেই বনায়ন ও বন সংরক্ষণের কাজ সফল হবে।
 
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান মিহির কান্তি মজুমদার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. আনসারুল করিম।
 

অনুষ্ঠানে চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরের বার্তা প্রধান রাহুল রাহা, ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত, প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার ইফতেখার মাহমুদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।