ইসলামে মানবজাতির দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় উপকরণ ও মৌলিক অধিকারসমূহ যথা- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিত্সা প্রভৃতি চাহিদা পূরণের যথার্থ ব্যবস্থা রয়েছে। কেউ ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, পীড়িত, ক্ষতিগ্রস্ত, অভাবগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত বা শীতার্ত হয়ে পড়লে তাদের প্রতি অত্যন্ত সদয় হওয়া, তাদের দুঃখ-দুর্দশা মোচনে যথাসাধ্য চেষ্টা করা ধর্মপ্রাণ মানুষের অবশ্যকর্তব্য ও ঈমানী দায়িত্ব। অসুস্থ ও রুগ্ন লোকের চিকিত্সা এবং সেবা-যত্ন করা, ক্ষুধার্তকে অন্নদান করা, বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান করা, নিরাশ্রয়কে আশ্রয়দান করা, বিদ্যাহীনকে বিদ্যা শিক্ষা দেওয়া, বিপথগামীকে সত্পথ প্রদর্শন প্রভৃতি মানবসেবা ও জনকল্যাণমূলক কাজ ইসলামের পরিভাষায় খিদমতে খালকের অন্তর্ভুক্ত। মানুষের মধ্যে সেই উত্তম ব্যক্তি যে মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত। নবী করিম (স) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজে পেট ভরে খায় আর তার প্রতিবেশী তার পাশে ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকে, সে প্রকৃত ঈমানদার নয়।’ (বায়হাকী)
নিঃস্ব ও বিপন্ন অসহায় মানুষের জীবনধারণের মৌলিক অধিকার পূরণের জন্য দরকার প্রচুর পরিমাণে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য, বিশুদ্ধ খাবার পানি, শীতবস্ত্র ও পরিধানের কাপড়-চোপড়, আবাসস্থল, গৃহনির্মাণের আসবাবপত্র, শিক্ষার উপকরণ ও চিকিত্সার সামগ্রী প্রভৃতি। এজন্য রাসূলুল্লাহ (স) জনগণকে উদাত্ত আহবান জানিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, রুগ্ন ব্যক্তির সেবা কর এবং বন্দিকে মুক্ত কর অথবা ঋণের দায়ে আবদ্ধ ব্যক্তিকে ঋণমুক্ত কর।’ (বুখারী)। একইভাবে আর্তমানবতার কল্যাণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের সেবায় ও মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষায় এগিয়ে আসার জন্য নবী করিম (স) বলেছেন, ‘তোমরা পৃথিবীর অধিবাসীদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করো, তাহলে আকাশের অধিবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন।’ (তিরমিযী)
অন্ন, বস্ত্র, চিকিত্সা, বাসস্থানহীন মৌলিক অধিকার বঞ্চিত অসহায় মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করলে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত আছে, নবী করিম (স) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন বলবেন: হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম, তুমি আমার সেবা করোনি। সে বলবে: হে প্রভু! আপনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক! কীভাবে আপনার সেবা করব? আল্লাহ বলবেন: আমার অমুক বান্দা পীড়িত অবস্থায় কষ্ট পাচ্ছিল, তুমি তার সেবা করোনি। তুমি কি জানতে না তার সেবা করলে তুমি আমাকে তার কাছে পেতে? হে আদমসন্তান! আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছি, তুমি খাবার দাওনি। সে বলবে: হে প্রভু! কীভাবে আপনাকে খাবার দিব? আল্লাহ বলবেন: আমার অমুক বান্দা ক্ষুধার্ত হয়ে তোমার কাছে গিয়েছিল, তুমি তাকে খাদ্য দাওনি। তুমি কি জানতে না যে, তাকে খাবার দিলে তুমি তার প্রতিদান আমার কাছে পেতে? হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে পান করতে চেয়েছি অথচ তুমি আমাকে পান করাওনি। সে বলবে: হে প্রভু! কীভাবে আপনাকে পান করাব? আল্লাহ বলবেন: আমার অমুক বান্দা তৃষ্ণার্ত হয়ে তোমার কাছে পান করতে চেয়েছে অথচ তুমি তাকে পান করাওনি। তুমি তাকে পান করালে তার প্রতিদান আমার কাছে পেতে এবং আমি সন্তুষ্ট হতাম।’ (মুসলিম)
সমাজে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণের কাজে আলেম সমাজকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। পবিত্র কোরআনের বাণী ‘ইক্রা’র চেতনায় ও সুন্নাহর শিক্ষার আলোকে উন্নত করতে হবে জাতিকে। নবী করিম (স) জ্ঞানার্জনের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘বিদ্যা অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর ওপর ফরজ।’ (ইবনে মাজা) রাসূলুল্লাহ (স) আরো বলেছেন, ‘তোমরা দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা অর্জন করো।’ (তিরমিযী)
মূলত ইসলামই সর্বপ্রথম মানুষের সার্বজনীন অধিকার নিশ্চিত করেছে। ইসলামি হুকুম সামগ্রিকভাবে বাস্তবায়িত হলে অসহায় মানুষ আর মৌলিক মানবাধিকার বঞ্চিত থাকবে না।
lলেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইনস্টিটিউট অব ল্যাংগুয়েজ স্টাডিজ। উপদেষ্টা, ইসলামিক স্টাডিজ ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা। সাবেক পরিচালক, এশিয়ান ইনস্টিটিউট, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ