হুদায়বিয়ার সন্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিচুক্তি। শক্তির অবস্থানের দিক দিয়ে মুসলমানেরা সবল হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা দুর্বল প্রতিপক্ষের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিলেন সংঘাত এড়াতে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আজকের দুনিয়ায় শান্তির লক্ষ্যে যারা কাজ করে যাচ্ছেন, সেসব সবল পক্ষ এই চুক্তি থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। মানবেতিহাসে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এই সন্ধি চুক্তিটিও শিক্ষণীয় একটি দলিল।
খন্দক ও বনি কুরাইযার যুদ্ধের পর যখন রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁর সাহাবিগণ আভ্যন্তরীণ ও বাইরের শত্রুদের আক্রমণ থেকে মুক্ত থাকার বিষয় অনেকটা নিশ্চিন্ত হলেন তখন আল্লাহর ঘর জিয়ারত করার জন্য তাঁদের অন্তর অতিমাত্রায় ব্যাকুল হয়ে উঠল। ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ (স) স্বপ্নযোগে দেখতে পেলেন যে, ‘তিনি সাহাবিগণকে সঙ্গে নিয়ে মক্কায় মসজিদুল হারামে গিয়েছেন। সেখানে কা’বাঘর তাওয়াফ করছেন। রাসূলুল্লাহর (স)-স্বপ্নের কথা সূরা আল-ফাতাহে উক্ত হয়েছে। এ সুসংবাদ শ্রবণে সকলেই উত্ফুল্ল হলেন। সুতরাং সকলেই বায়তুল্লাহ জিয়ারতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগলেন। কুরাইশদের দলপতি সুহায়লকে সম্বোধন করে মহানবী (স) বললেন, সুহায়ল! কা’বা ঘরের মর্যাদা রক্ষার্থে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরাইশগণ আজ আমার নিকট যা কিছু চাইবে, আমি তাই দিব। তোমাদের শর্তেই আমি সন্ধি করতে রাজি আছি। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খণ্ড., পৃ. ৫৫৬) দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর সন্ধি করার সিদ্ধান্ত হলো। হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রধান প্রধান শর্ত ছিল নিম্নরূপ : ১. মুসলিমগণ এ বছর হজ না করে মদীনায় ফিরে যাবে। ২. আগামী বছর তাঁরা হজ করতে আসতে পারবে। কিন্তু তিনদিনের বেশি মক্কায় অবস্থান করতে পারবে না। এ তিনদিন কুরাইশগণ মক্কা ত্যাগ করে অন্যত্র আশ্রয় নেবে। ৩. আত্মরক্ষার জন্য পথিকদের যেটুকু প্রয়োজন, মুসলিমগণ আসার সময় শুধু সে পরিমাণ অস্ত্রই সংগে আনতে পারবে। কিন্তু সে অস্ত্রও প্রথমে খাপের মধ্যে এবং পরে খাপসহ অস্ত্র থলির মধ্যে বন্ধ করে আনতে হবে। ৪. মদীনার কোনো মুসলিম মদীনা থেকে মক্কায় ফিরে গেলে মক্কাবাসী তাকে প্রত্যর্পণ করতে বাধ্য থাকবে না। কিন্তু কোনো মক্কাবাসী মদীনায় আশ্রয় গ্রহণ করলে তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে হবে। ৫. মক্কার মুসলিমদেরকে হযরত মুহাম্মদ (স) মদীনায় নিয়ে যেতে পারবেন না। ৬. আরবের যে-কোনো গোত্র কুরাইশদের সঙ্গে কিম্বা হযরত মুহাম্মদ (স)-এর সঙ্গে স্বাধীনভাবে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হতে পারবে। ৭. সন্ধির মেয়াদকালে জনসাধারণের পূর্ণ নিরাপত্তা রক্ষা করা হবে এবং একে অপরের কোনো ক্ষতি সাধন করবে না। ৮. হজের সময় মুসলিমদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। ৯. মুসলিমগণ নির্বিঘ্নে ধর্ম প্রচার করতে পারবে। ১০. মুসলিমগণ বাণিজ্য উপলক্ষে যে-কোনো স্থানে যাতায়াত করতে পারবে। ১১. মক্কার ব্যবসায়ীরাও বাণিজ্য উপলক্ষে মদীনার পথ ধরে সিরিয়া, মিসর প্রভৃতি দেশে যেতে পারবে। ১২. এ সন্ধি দশ বছরকাল বহাল থাকবে এবং এ সময়ের মধ্যে কোনো পক্ষই অপর পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবে না প্রভৃতি। আপাতদৃষ্টিতে হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তাবলী মুসলিমদের জন্য অপমানজনক বলে মনে হলেও এ সন্ধিকে নিরঙ্কুশ বিজয় হিসেবে অভিহিত করে আল্লাহ মহানবী (স)-এর নিকট ওহী প্রেরণ করেন। পবিত্র কুরআনে এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে : ‘তারা যদি সন্ধির প্রতি ঝুঁকে পড়ে, তবে তুমিও সন্ধির দিকে ঝুঁকবে এবং আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে। তিনিই সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।’ (৮:৬১) আবার বলা হয়েছে- ‘সুতরাং তোমরা হীনবল হইও না এবং দুঃখ করিও না। যদি তোমরা মুমিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে। আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে আছেন, তিনি তোমাদের কর্মফল কখনও ক্ষুণ্ন করবেন না’। (৩:১৩৯,১৭১)
lলেখক :সাবেক অধ্যক্ষ, সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা