প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মানুষকে ইসলামের সংস্কৃতি শিক্ষা দিতে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় একটি করে মসজিদ ও ইসলামি সাংস্কৃতিক শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। এক্ষেত্রে সৌদি সরকার আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ যাতে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে সমাজের ক্ষতি করতে না পারে সেজন্যই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আসলে ইসলাম ধর্ম কী, আমাদের জীবনযাত্রায় ইসলাম কী শিক্ষা দেয়, এসব ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে কেউ আর বিপথগামী হবে না। আর ইসলামের নামে যারা বিপথগামী হয়েছে তাদের কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায় সেটা আলেম-উলামাদের ঠিক করতে হবে। দেশ থেকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ উচ্ছেদে আলেম-উলামাদেরকে আরো সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষি ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বাংলাদেশ জমিয়তুল ওলামার উদ্যোগে আয়োজিত ‘ইসলামের দৃষ্টিতে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ এবং আমাদের করণীয়’ শীর্ষক উলামা সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ধর্মের নামে যারা জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে অশান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে, তাদের প্রতিহত করতেই ইসলামের সঠিক বার্তা নিয়ে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামা দেশব্যাপী প্রায় লক্ষাধিক উলামার স্বাক্ষর সম্বলিত বিশেষ ফতওয়া জারি করে। অনুষ্ঠানে ৩০ খণ্ড ‘ফতওয়ার’ একটি খণ্ড প্রতীকী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন শোলাকিয়া ঈদ জামাতের গ্রান্ড ইমাম ও বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার সভাপতি মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে দেওয়া এ ফতওয়া জঙ্গিবাদ দূর করার পাশাপাশি ইসলাম সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব দূর করতে সহায়ক হবে আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবকল্যাণ ও শান্তির জন্য আপনারা একটা মহত্ উদ্যোগ নিয়েছেন, এজন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাই। এটা আপনাদের নিজেদের কোনো সৃষ্টি নয়, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে পবিত্র কো?রআনে যা আছে, নবী করিম (স.) যা বলেছেন, তা থেকেই জাতির জন্য এই ফতওয়া তৈরি করেছেন আপনারা। নিশ্চয়ই এই এক লাখ আলেম কখনও মিথ্যা কথা বলবেন না। ইসলামের নামে অঘটন ঘটিয়ে যারা এ ধর্মকে খাটো করছে, এই ফতওয়া তাদের রুখে দেবে। এটা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। কারণ সবাই যেন বোঝে, যারা ইসলামের নামে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদী তত্পরতা চালাচ্ছে তারা আসলে এ ধর্মের কেউ নয়। আর মুষ্টিমেয় ব্যক্তির জন্য পবিত্র ধর্ম ইসলামকে খাটো করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে মানবিক ও উদার ধর্ম হলো ইসলাম। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখ লাগে তখন, যখন সামান্য কিছু লোক এই ধর্মকে ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়। তিনি বলেন, আমাদের পবিত্র ধর্মকে তারা মানুষের কাছে হেয় করে দিচ্ছে। আপনারা যারা ধর্ম শিক্ষা দেন এটা মানুষকে আরো ভালোভাবে বোঝাতে হবে এবং উলামায়ে কেরামগণ এখানে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। আর কেউ যেন এই ভুল পথে না যায়। ইসলামের সঠিক শিক্ষাটা যেন সকলে পায় সে ব্যবস্থাটা আলেম-উলামাগণকে নিতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, যখন কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যাই, কেউ ইসলামি টেরোরিস্ট বললে আমি সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিবাদ করি। সন্ত্রাসী কোনো ধর্মের হতে পারে না। কিন্তু ভাবতে আমার নিজেরও কষ্ট লাগে। সামান্য কয়েকটা লোক কোথায় নিয়ে গেল আমাদের শান্তির ধর্মকে। যারা সন্ত্রাস করে, মানুষ হত্যা করে তারা আদৌ কোনো ধর্মে বিশ্বাস করে কিনা সেটা দেখা দরকার। সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের নিন্দা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা কোরআন, হাদিস, ইসলামের পবিত্র বাণী মানবে না, নামাজ না পড়ে মানুষ খুন করতে যায়, তারা কী করে বেহেশেত যাবে? মানুষ হত্যাকারীরা বেহেশেত নয়, দোযখেই যাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করে। কিন্তু এখানে সুন্দর বিষয় হলো এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের মানুষকে শ্রদ্ধা, সম্মান ও সহযোগিতা করেন। এটা এদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন। এবারও ঈদের জামাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পাহারা দিয়েছে যেন নির্বিঘ্নে নামাজ আদায় করতে পারে। আবার মুসলমান ভাইয়েরা এভাবে হিন্দুরা যেন পূজা-অর্চনা করতে পারে নির্বিঘ্নে সে ব্যবস্থা করে।
বক্তৃতার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, লাখো শহীদ, জাতীয় চার নেতা এবং পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট শহীদ হওয়া বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই আগস্টে বারবার আঘাত এসেছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে, ওই হত্যাকাণ্ডের ক’দিন আগে স্বামীর কর্মস্থলে চলে গিয়েছিলাম বলে আমরা দু’বোন রক্ষা পেয়ে যাই। মানুষ এতো শোক সইতে পারে না, আল্লাহ আমাদের সে শোক সইবার শক্তি দিয়েছেন।
ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। শোলাকিয়া ঈদ জামাতের গ্রান্ড ইমাম ও বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার সভাপতি আল্লামা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, মন্ত্রী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানগণ, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান স্বামী ধ্রুবেশানন্দ মহারাজ, খ্রিষ্টান ধর্মীয় প্রধান আর্চবিশপ প্যাট্রিক ডি রোজারিও, বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সভাপতি শুদ্ধানন্দ মহাথেরোসহ বিভিন্ন ধর্মের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিকবৃন্দ এবং আলেম-উলামা সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের এবং সম্প্রতি জঙ্গি হামলায় নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন ফরিদ উদ্দীন মাসউদ।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত খুঁজে বেড়াচ্ছি কোথাও আইএস খুঁজে পাইনি। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের নিন্দা জানিয়ে মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ বলেন, ইসলাম উদারতা ও সহনশীলতার ধর্ম। কিছু সংখ্যক মতলববাজ ইসলামের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে পবিত্র এ ধর্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ফরিদ উদ্দীন মাসউদ বলেন, ইতিহাসে কারবালার ঘটনার পর এতো নিষ্ঠুর ও হূদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই।
ইত্তেফাক/এ এন