মানুষ এই পৃথিবীতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অবস্থান করে। তার দেহ নশ্বর কিন্তু কোনো কোনো মানুষ এই পৃথিবীতে তাঁর মেধা, ত্যাগ, জ্ঞান ও কর্মদক্ষতার বলে এমন সৃষ্টি রেখে যান যা অবিনশ্বর। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তেমনি এক অবিস্মরণীয় মহামানব এবং তার অবিনশ্বর কীর্তি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। তিনি কেবল পুঁথিগত তত্ত্ব বর্ণনা করে তাঁর কর্তব্য শেষ করেননি বরং তা সাফল্যজনকভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। এর ফলে বাঙালি জাতি প্রথমবারের মত তার নিজস্ব আবাসভূমি পেয়েছিল।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে শাহাদাতবরণ পর্যন্ত এই পৃথিবীতে অবস্থান করেছেন। ৫৫ বছর পাঁচ মাসের এই সংক্ষিপ্ত আয়ুষ্কালে তিনি একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে পেরেছিলেন। এটা সম্ভব হয়েছিল তাঁর দেশপ্রেম, ত্যাগ ও বিপুল সাংগঠনিক শক্তির কারণে। বঙ্গবন্ধুকে অনেকে অনেকভাবে মূল্যায়ন করেন। কেউ কেউ তার বিপুল ত্যাগের কথা বলেন, কেউ কেউ তাঁর রাজনৈতিক সাহসের কথা বলেন, কেউ তাঁর অসাধারণ বাগ্মীতার কথা বলেন, কেউ তাঁর জনগণের ওপর আস্থার কথা বলেন। এগুলো সবই সত্য। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর জীবনের যে অধ্যায়টি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় তা হলো বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ সাংগঠনিক প্রতিভা ও ক্ষমতা। বঙ্গবন্ধুর নিজের লিখিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পাঠ করলে তাঁর বিপুল সাংগঠনিক প্রতিভা প্রতি ছত্রে ছত্রে আবিষ্কার করা যায়।
তিনি শূন্য থেকে অনেক সংগঠনকে তাঁর সাংগঠনিক প্রতিভা দিয়ে বিশাল সংগঠনে পরিণত করেছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ আওয়ামী লীগের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর মতো নেতৃত্ব থাকা সত্ত্বেও তাঁরা সংগঠন গড়ে তোলার দায়িত্ব এ কারণেই বঙ্গবন্ধুকে প্রদান করতেন। তাঁর বিপুল সাংগঠনিক প্রতিভা দিয়ে এবং যুগোপযুগী কর্মসূচি প্রণয়নের মাধ্যমে আওয়ামী লীগেকে তিনি ১৯৭০ সালে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যখন এই দলটি বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছিল। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলই এই বক্তব্যের সত্যতার প্রমাণ দেয়। বঙ্গবন্ধুর সাংগঠনিক ক্ষমতা ও দক্ষতা প্রয়োগের যে কৌশল তা রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়।
একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে প্রথমত আমার কাছে মনে হয়েছে যে, তিনি প্রধান কৌশল যেটি অবলম্বন করতেন তা হলো নিজে সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব প্রদান। এজন্য জীবনের ঝুঁকি নিতেও তিনি পিছপা হননি। দ্বিতীয় কৌশলটি ছিল জনগণের মনের ভাষা বুঝতে পারা এবং সেটাকে সামনে রেখে দলীয় কর্মসূচি প্রণয়ন করা। তৃতীয়ত জনগণের ওপর তাঁর আস্থা ছিল সর্বোচ্চ এবং সেজন্যই তিনি রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক সংকটকালে তত্ত্ব বা নেতৃত্বের ওপর ভরসা না করে জনগণের কাছে চলে যেতেন। চতুর্থত নেতা ও কর্মীদের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও স্নেহ, দলীয় নেতা ও কর্মীরা তাঁর উপরে আস্থা রাখতেন এবং জানতেন যে, যে কোনো বিপদে তাদের প্রিয় মুজিব ভাই তাদের পাশে থাকবেন। পঞ্চমত বঙ্গবন্ধুর দরজা রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের জন্য সবসময় উন্মুক্ত থাকত। তিনি তাদের কথা শুনতেন সমস্যা জানার চেষ্টা করতেন ও সমাধান দিতেন, এবং কাজের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতেন। হাজার হাজার নেতা ও কর্মীর চেহারা ও তার নাম উভয়ই বঙ্গবন্ধুর কাছে পরিচিত ছিল। একবার পরিচয়ে তিনি তাদের আজীবন মনে রেখেছেন এমন শত শত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়। ষষ্ঠত বঙ্গবন্ধু সাংগঠনিক কাজ করতেন অত্যন্ত আন্তরিকতা ও গুরুত্বসহকারে।
উপরে আমি যা উল্লেখ করলাম তা কেবল তাঁর বিপুল সাংগঠনিক প্রতিভার সামান্য অংশ। তাঁর সাংগঠনিক প্রতিভা নিয়ে গবেষণা করলে আরও হয়ত অনেক নতুন দিক উন্মোচন করা সম্ভব। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘৃণ্য ঘাতকের দল তাঁকে আমাদের মাঝ থেকে ছিনিয়ে না নিলে আজ বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশের চেহারা অন্যরূপ থাকত। তাঁর নেতৃত্বে এতদিনে আমরা একটি উন্নত জাতির মর্যাদা পেতাম, বিশ্ব সভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারতাম। শান্তি, গণতন্ত্র ও সমাজ প্রগতির লক্ষ্য অভিযাত্রায় বাংলাদেশ হতো দৃষ্টান্ত।
লেখক:সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় পার্টি (জেপি)