মানবতা নেতা মহাত্মা গান্ধী আত্ম-কথায় লিখেছেন, ‘এমন কতগুলি বস্তু অবশ্যই আছে, যাহা আত্মাই জানে, আর জানে তাহার স্রষ্টা। এই বস্তুকে বাহিরের আলোকে ব্যক্ত করা সম্ভব নয়।’ গান্ধীজী এক ভক্তকে অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে লিখেন, ‘আমার জীবনই আমার বাণী।’ বিশ্ব মানচিত্রে বাংলা ও বাঙালির অস্তিত্বের গৌরবময় প্রকাশ ঘটিয়ে কবিগুরুর সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা নামে বঙ্গভূমিকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে লেখার সাহস, প্রজ্ঞা, জ্ঞান বুদ্ধি নেই বিধায় সে চেষ্টা করব না। বঙ্গবন্ধুর শারীরিক অনুপস্থিতির সময়কাল যতই অতিবাহিত হচ্ছে, তত যেন বাঙালির চোখের জলের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়ে হূদয়ের ক্ষত গভীরতায় প্রবেশ করে রক্ত ক্ষরণের প্রবাহের স্রোতধারা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বাঙালি জাতির সেই প্রবহমান স্রোতধারা দু’কূল ভাসিয়ে সকল জঞ্জাল নিয়ে সাগর মহাসাগরের দিকে দুর্বার গতিতে ধাবমান। সেই স্রোতধারার অসীম শক্তিতে বলীয়ান সমগ্র বাঙালির সঙ্গে আমার অতি ক্ষুদ্রতম রশ্মিও একাত্ম। তাইতো ১৯৭৬/৭৭ সালে টুঙ্গীপাড়ায় মহানায়কের সমাধিস্থলে দাঁড়িয়ে দুই লাইন লিখতেই ঘেমে অস্থির হয়ে গেলেও আজ শুধু আবেগ প্রকাশের ব্যাকুলতায় নিন্দ্রাহীন অস্থিরতা।
মহাত্মা গান্ধী কোনো কোনো বস্তুর বাহিরের আলোকে ব্যক্ত করা সম্ভব নয় বলে অপকটে স্বীকার করেছেন। সেখানে ২/৩শত বছরের পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করে একটি জাতি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মহাজাগরণের কবি হিমালয়সম বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তত্ত্বকথা আমার মত ক্ষুদ্রজনের পক্ষে লেখা সম্ভব নয়। যা লেখার অভিপ্রায় তা শুধুই আবেগ এবং আবেগালুপ্ত প্রকাশ। গান্ধীজীকে অনুসরণ করে আমি বলতে চাই, বঙ্গবন্ধুর জীবনই বাঙালি জাতির চেতনা, আদর্শ ও জাতির সামগ্রিক মুক্তি-সমৃদ্ধি ও চলার পথনির্দেশনা।
আমরা যদি বলি বাঙালি ও বাংলার অপর নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যদি বলি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একটি অন্যটির পরিপূরক। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশে অবিচ্ছেদ্য নাম। একজন আদর্শিক মানুষ ও স্বভাবজাত মানবিক গুণাবলীর মাধ্যমে তিনি নেতৃত্বের কারিশমায় মানুষের হূদয়ের গভীরে সহজে পৌঁছে যেতে পেরেছেন। দীর্ঘ পরীক্ষিত রাজনৈতিক কর্মের মধ্য দিয়ে তিনি দুঃখী-বঞ্চিত-শোষিত বাঙালির আস্থা অর্জন করেছেন। যা পরবর্তীতে তাকে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করেছে এবং কালক্রমে তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী পরাধীন একটি জাতি কেন অন্ধের মত তাঁর উপর নিজেদের ভাগ্য বদলের বিশাল কর্মযজ্ঞ ন্যস্ত করেছিল, জাতির প্রতিটি যুগসন্ধিক্ষণে সেটি খোঁজা প্রয়োজন।
কি ছিল তাঁর নেতৃত্ব কারিশমায় (!) সে প্রেক্ষাপটে যেতে হলে আমাদের নেতৃত্ব ধারণার বিষয়টি আলোকপাত করতে হবে। অধ্যাপক এন মেরি ই ম্যাকসোয়ানের মতে, ‘নেতৃত্ব আসলে ক্ষমতা, নেতাদের শোনার ও পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা, সব স্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আলোচনা শুরু করায় উত্সাহদানের জন্য নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতাকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষমতা, জোর করে চাপিয়ে না দিয়ে নিজেদের মূল্যবোধ ও দূরদর্শিতাকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা। নেতৃত্ব মানে শুধুই সভায় আলোচ্য বিষয়সূচির প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়, নিজে সেই কর্মসূচি স্থির করা, সমস্যা চিহ্নিত করা এবং শুধুই পরিবর্তনের সঙ্গে সামাল দিয়ে না চলে নিজেই এমন পরিবর্তনের সূচনা করা, যা উল্লেখযোগ্য উন্নতির পথ প্রশস্ত করে।” অন্যভাবে নেতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যে কোনো পরিস্থিতিতে যে ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে সফল হওয়ার ক্ষমতা রাখেন এবং কোনো সংস্থা বা সমাজের প্রত্যাশা পূরণকারী হিসেবে স্বীকৃতি পান, তিনিই কার্যকর নেতা’। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র যুক্তফ্রণ্ট নির্বাচন, ৫৮’র আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭০’র নির্বাচন এবং সর্বশেষ বাঙালি জাতিকে একত্রিত করে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ঐতিহাসিক ৭ মার্চের কালজয়ী ভাষণে তিনি যে দিক- নির্দেশনা দিয়েছিলেন যে কোনো মুক্তি সংগ্রামের নেতৃত্বে তা ছিল প্রায় বিরল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ছিলেন নিরহংকারী মানুষ। প্রবল আত্মবিশ্বাসী ও স্বাধীনচেতা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। মানবতাবাদী, বিনয়ী, নির্লোভ এ মানুষটিকে ইতিহাস ভিন্নতা দিয়েছে তাঁর স্পষ্টবাদিতার জন্য। একজন সংগঠক ও রাজনৈতিক নেতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষকে আপন করার শক্তি। সেই শক্তিগুণে তিনি চরম শত্রুকেও আপন করে নিয়েছেন, সহানুভূতি দিয়ে সংশোধনের পথ দেখানোর চেষ্টা করেছেন। রাজনীতির দর্শনে ত্যাগ, ন্যায্যতা, সততা, সহমর্মিতা, ভালোবাসার অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র-সমাজ প্রতিষ্ঠায় ছিলেন চিরব্রতী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর সাধনা ছিল শোষিত, বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। এ জন্য তিনি মানবিকতা ও ভালোবাসাকে সামনে নিয়ে এসেছেন। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, মানুষকে ভালোবাসা দিয়ে মন জয় করতে পারলে সামগ্রিক কল্যাণ সাধন একজন রাজনৈতিক নেতার পক্ষে অধিকতর সহজ হয়। যা একালের সংগঠক ও নেতাদের মাঝে তেমন একটা পরিলক্ষিত হয় না।
এই মহান নেতার ত্যাগ এবং জনগণের প্রতি অগাধ ভালোবাসার মূল্য আমরা বুঝতে পারিনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে পুনর্গঠনে তিনি যখন মহাকর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছিলেন তখন এক দল বিপথগামী সেনাসদস্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। থামিয়ে দেয় বাঙালির অগ্রযাত্রাকে। পরাজিত শক্তির ভাবধারায় দেশকে চালাতে শুরু করে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের বুকে সাম্প্রদায়িকতার কালিমা লেপন করে দেওয়া হয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য। স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসিত করা হয়। দুর্নীতি ও লুটপাটের রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে দেয়। পেশাদারিত্বের পরিবর্তে জনপ্রশাসনে ঢুকে পড়ে চরম দলবাজি। ছাত্র রাজনীতি হয় কলুষিত। সামাজিক বৈষম্য বেড়ে যায় গাণিতিক হারে। শিক্ষা ব্যবস্থার বহুমাত্রিকতায় একক জাতিসত্তা সৃষ্টি হয়নি। যে জনগণকে পুঁজি করে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শে গড়ে উঠেছি, সকল অপশক্তি প্রতিহত করে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণে সেই রাজনীতি শক্তির পুনঃজাগরণ ব্যতীত কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। সমাজ রাষ্ট্রে যে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও উগ্রপন্থা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তা প্রতিরোধে শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সফল কার্যক্রমে সন্তুষ্ট থাকলে তা হবে সমস্যা সমাধানে এডহকইজম। যে কোনো সময় এই স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি ফোঁসকে ছোবল মারতে পারে।
তাই, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস প্রতিরোধের পাশাপাশি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান চেতনা বাস্তবায়নে সাংগঠনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত জাতির পিতার নেতৃত্বে যেমনিভাবে সমগ্র জাতি বার বার ’৫২’র একুশ থেকে প্রেরণা পেয়েছে, তেমনি জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রতিহত করতে জাতিকে বার বার ’৭১ এ ফিরে যেতে হবে। পাশাপাশি এ অপশক্তির প্রকৃত উত্থানরোধে আমাদের অবশ্যই ফিরে যেতে হবে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনে। যে দর্শন আমরা লক্ষ্য করি মানুষ ও নেতা বঙ্গবন্ধুর মাঝে। জাতীয় শোক দিবসে সেটি হোক আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক: সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)