ট্রানজিস্টার

 
শফি তালুকদারের তালুকদারি এখন নেই। এখন কি, কখনোই তালুকদারি ছিল না। নামেই কেবল তালুকদার। অবশ্য দাদা কোরবান তালুকদারের মুখে শুনেছে, কোনো এক কালে নাকি তারা অনেক বড় তালুকদার ছিল। শত শত বিঘা জমির মালিক ছিল। বছরের নির্দিষ্ট দিনে প্রজারা খাজনা দিত। গোলা ভরা ছিল ধান। এলাকার লোজজন সম্মান করত। কোথায় সেসব তালুকদারি হারিয়ে গেছে, জানে না শফি তালুকদার। জন্ম থেকেই দেখেছে টেনেটুনে জীবন চলছে। বাবা দয়াল তালুকদার হালটাল করে সংসার চালাচ্ছে। বাড়ির কাছে বোথলা হাইস্কুল থেকে মেট্রিকটা পাস করলেও বাবার সঙ্গে ক্ষেতে খামারে কাজ করেছে। সেই কাজ এখনো সে করছে। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে সকালের দিকে শফি তালুকদারের বোথলা বাজারে আসা চাই, কেবল জাকিরের দোকানের এক কাপ চা খাওয়ার জন্য। আজও চা খাচ্ছিল সে, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তাকায় সাদাকালো টিভির দিকে। নিচের স্ক্রলে নানা সংবাদ একের পর এক ভেসে উঠছে। হঠাত্ একটা সংবাদে চোখ আটকে যায় শফি তালুকাদের, আগামীকাল...।
 
সঙ্গে সঙ্গে শফি তালুকদারের বুকের মধ্যে অনেক অনেক দিন ঘুমিয়ে থাকা একটা সিংহ বিকট শব্দে জেগে ওঠে। শব্দটা তাকে কাঁপিয়ে দিলেও সেই শব্দটা কেবল শফিই শুনতে পায়। দ্রুত চা খেয়ে জাকিরকে টাকা দিয়ে হন হন করে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরে। বোথলা বাজার থেকে বাড়ির দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। এক প্রকার দৌড়ে বাড়িতে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে স্ত্রী হালিমাকে ডাকে, ‘এই এদিকে আসো।’
 
হালিমা গরুর গোয়াল থেকে বের হয়ে সামনে দাঁড়ায়, ‘কী অইচে আপনের?’
 
কয়েক মুহূর্ত স্ত্রী হালিমার দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করে, ‘আমাগো রেডিওটা কই?’
 
‘রেডিও?’ হালিমা হাতের আগল নিচে নামিয়ে রেখে তীক্ষচোখে স্বামীর দিকে তাকায়, ‘কীয়ের রেডিওর কতা কইতেছেন আপনে?’
 
‘আমাগো বাড়িতে একটা রেডিও ছিল না? আমরা হারাদিন গান-বাজনা হুনতাম...’
 
হালিমা বেগম অবাক চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবে, মানুষটা কি কোনোদিন মানুষ হবে না? সেই একুশ-বাইশ বছর আগের রেডিও কি এখনো আছে? আর রেডিও তো এই মানুষটাই বন্ধ করে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘আমার ঘরে আর রেডিও বাজবে না।’
 
সারাদিন-রাত, যতক্ষণ যন্ত্রটার ভিতরে গান আর অনুষ্ঠান হতো, খোলাই থাকত। হাঁটতে বসতে কাজ করতে করতে কত নাটক শুনেছে। আরও শুনেছে দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক নেতাদের সাক্ষাত্কার। কেবল কি ঘরের মানুষে শুনেছে? আশপাশের দুই-চার বাড়ির মানুষও শুনেছে। রেডিওটা তো খায়েরের বাবাই কিনে এনেছিল মুক্তিযুদ্ধ থেকে আসার পর। বাড়ির সবাই আনন্দে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছিল। সবাই টানাটানি করলে খায়েরের বাপ বলেছিল, ‘তোমরা যা ইচ্ছা হোনো, আমি হুনবো শেখ মুজিবরকে।’
 
সেই সময়ে রেডিওতে প্রায়ই শেখ মুজিবের কণ্ঠ শোনা যেত, সন্ধ্যার দিকে। সারাদিন কাম-কাজের পর সন্ধ্যা হলে মানুষটা রেডিওটা নিয়ে ঘরের বড় চৌকিতে শুয়ে থাকত। রেডিও শুনতে শুনতে রাতের ভাত খেয়ে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে যেত।
 
সকালে উঠে কাজে চলে গেলে, আর সারাদিনে রেডিওটার খবর থাকত না। একবার পাশের বাড়ির জয়তুনের মায়ের পায়ে ধাক্কা লেগে রেডিওটা বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যায় বাড়ি এসে খায়েরের বাবা শফি তালুকদার নব ঘুরায় রেডিওর, চড় চড় শব্দ হয় কিন্তু কথা শোনা যায় না। যে মানুষটা কথা বলে না প্রায়ই কারো সঙ্গে, থাকে চুপচাপ, সেই মানুষটা রাগে কেঁপে উঠল, ‘রেডিও কতা কয় না ক্যা?’
 
ভয়ে ভয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় হালিমা, ‘ওটা তো যন্ত্রর। যন্ত্রর নষ্ট অইতে পারে না? হারাদিনই তো বাজে...’
 
‘বাজান!’ ছয় বছরের খায়ের গলা বাড়ায়, ‘ওই বাড়ির জয়তুনের মায়ে পা দিয়া লাড়া দিছে।’
 
শফি ভাটার চোখ নিয়ে তাকায় স্ত্রী হালিমার দিকে, ‘তুমি আমারে ছাগল পাইছ? আর ওই খাটাইসা বিডি আইছিল ক্যা? আইছে, হেয় আইছে আমার রেডিওতে ধাক্কা দিল ক্যা?’
 
‘আরে হোনেন, রেডিও তো ছিল মাটির উপর, রান্নাঘরে। হে আইচে রোদ চোহে লইয়া, খেয়াল হরে নাই। আর তেমন বেশি তো ধাক্কা লাগে নাই।’
 
‘আইজ আর আমার ঘুম অইবে না,’ শফি তালুকদার রেডিওটা বিছানার এক পাশে ধাক্কা দিয়ে রাখতে রাখতে বলে। ‘এহন আমি কী হুনমু? কী করুম?’
 
হালিমার ঠোঁটে বিপন্ন হাসি, ‘একরাইত রেডিও না হোনলে আপনের ঘুম অইবে না?’
 
‘তুই বুঝবি না। রেডিওডারে আমি শ্যাক মুজিব মনে করি। জীবনে তো হের কাছে যাইতে পারি নাই, কেবল কতা হনুছি। রেডিওর সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে হেয় কত কতা কয়, আমি হুনি আর হেরে ভাবি। হেয় কত বড় নেতা তুই পাইলা মাইঝা বুঝবি কেমনে?’
 
‘আমার বোঝনের কাম নাই—আমার রান্দন ঘরে অনেক কাম পইরা রাইচে,’ হালিমা রান্না ঘরে চলে যায়। শফি তালুকদার একটা কাঁথা টেনে মুখের উপর এনে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। অন্ধকার রাত। আকাশে তারার ঝিকিমিকি। মনে পড়ে, এই তো মাত্র তিন বছর আগের ঘটনা।
 
বোথলা গ্রামটা একেবারে গ্রামই। শহরের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম রেডিও বা ট্রানজিস্টার। গ্রামের সকল মানুষ কৃষিজীবী। নিস্তরঙ্গ। কোনো উত্তেজনা নেই। হঠাত্ একদিন শোনা গেল, ‘এই দেশে, যুদ্ধ শুরু অইচে।’ কোথায়? ঢাকা শহরে। দুই একজন মানুষ, যারা ঢাকা শহরে ছিল, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পনেরো-বিশদিন পরে গ্রামে এসে যে বিবরণ দিয়েছে, শুনে অবাক। গ্রামের মানুষ মানতে পারছে না, ‘একই দেশের মানুষ অইয়া এইভাবে মানুষ মারতে পারে?’ আবার কয়েকদিন পরে শোনা গেল, দেশে রাজাকার বাহিনী হয়েছে। লোকজনের মুখে কোনো কথা নেই। সবাই যেকোনো ঘটনার জন্য প্রস্তুত।
 
ঘটনার আগে যে ভোট হয়েছিল, গ্রামের মানুষ একজোট হয়ে শেখ মুজিবের নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছিল। সেই ভোটে অংশ নিয়েছিল শফি তালুকদারও। শফি তালুকদার খুব নির্বিরোধী মানুষ। কারো সঙ্গে ঝগড়া করেছে, গ্রামের কেউ বলতে পারবে না। পাশের গ্রাম উজানগাঁওয়ের চেতন মাঝির কথাবার্তা খুব ভালা লাগত শফি তালুকদারের। চেতন মাঝি লেখাপড়া জানা মানুষ। কয়েকবার ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও ছিল। সেই চেতন মাঝি নৌকার ভোটের সময়ে বোথলা বাজারে মাইক নিয়ে শেখ মুজিব, ছয় দফা, পাকিস্তানের মধ্যে ফাঁকিস্তানের অনেক ঘটনা বলতে শুরু করলে, তরকারি বিক্রি বন্ধ রেখে শফি তালুকদার গোগ্রাসে শুনেছিল। শুনে বুঝতে পেরেছিল, শেখ মুজিবের নৌকায় উঠতে হবে। ফলে, শফি তালুকদার চেতন মাঝির সঙ্গে যোগ দিয়ে নৌকার ক্যানভাসে নামে। আর যেদিন রেডিওতে শেখ মুজিব নির্বাচনী ভাষণ দিয়েছিলেন, সেদিনই প্রথম চেতন মাঝির উঠোনে বসে গলা শুনে মনে হয়েছিল, এমন সাহসী আর দরদি গলার মানুষটা খুব আপন। এমন করে দেশের মানুষের জন্য কেউ কথা বলেনি।
 
নির্বাচনের পর গ্রামে আবার সব কিছু চুপচাপ। কিন্তু এখন একি শোনা যাচ্ছে? পাশ্চিম পাকিস্তানিরা আক্রমণ করছে নিজেদের দেশ? চেতন মাঝি বলল, যুদ্ধ করতে হবে। মাস খানেকের মধ্যে এলাকায় একটা মুক্তিযোদ্ধাদের দল গড়ে ওঠে। চেতন মাঝির এক মামাতো ভাই, ইকবাল মিয়া পুলিশে চাকরি করত, এখন বাড়িতে। সে এসে ট্রেনিং দিতে আরম্ভ করে স্কুলের মাঠে। শফি তালুকদার ভিড়ে যায় দলে। আট মাসের মধ্যে শফি একদিনের জন্য বাড়ি আসে নাই। অনেক জায়গায় যুদ্ধ করেছে, সুন্দরবনে গেছে, কচা নদীতে যুদ্ধ করে গানবোট ডুবিয়ে দিয়েছে। সেই সময়ে থেকেই শফির একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠেছিল, একটা দুই ব্যান্ডের ট্রানজিস্টার। স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রথম শোনে সাতই মার্চের ভাষণ, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আরও শোনে, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে করতে হবে, এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে...।’
 
যুদ্ধ করতে করতে দেশটা হঠাত্ স্বাধীন হয়ে গেল। চেতন মাঝির কাছে থ্রি নট থ্রি রাইফেলটা দিয়ে ট্রানজিস্টারটা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে শফি। কোনো চাহিদা নেই। কোনো দাবি নেই। স্বাভাবিক জীবন শুরু করে। তবে গ্রামের মানুষ অবাক হয়েছিল নির্বিরোধী গোবেচারা টাইপের মানুষ শফি তালুকদারও যুদ্ধে গিয়েছিল জেনে!
 
আবার জমি চাষ, বাজারে তরিতরকারি বিক্রি করে সংসার যাত্রা চালানো। আর রাতে রেডিওতে শোনে, শেখ মুজিবের খবর। দেশে বিদেশে যায় নেতা, দেশের উন্নতির জন্য কাজ করছে, মানুষদের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেন, শফি তালুকদার ট্রানজিস্টার বুকের কাছে নিয়ে শোনে। শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে উঠে রেডিওটা ছেড়ে আবার স্বাভাবিক কাজে লেগে যায়। এক সকালে সেই রেডিও থেকে শুনতে পায়, ‘আমি মেজর ডালিম বলছি... শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে...।’
 
পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে যায় শফি তালুকদার। মনে হলো, বুকের গভীর গোপন থেকে কেউ একজন এক খাবলে কলিজাটা উপরে নিয়েছে। মানুষটা একেবারে বোবা হয়ে যায়। মনে হলো, রেডিওটা মিথ্যা বলছে। যন্ত্রটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। শফি তালুকদার ট্রানজিস্টারটার নব টিপে বন্ধ করে জানিয়ে দেয়, এই ঘরে আর রেডিও বাজবে না।
 
হালিমার যদিও খারাপ লাগছিল কিন্তু স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে, স্বামীর শোক ও বেদনাকে অনুভব করে ট্রানজিস্টারটাকে উপরে মাচায় উঠিয়ে রাখে। সেই ট্রানজিস্টার আর কেউ কোনোদিন চালায়নি। একসময় বাতিল জিনিসের সঙ্গে একটা পুরানা বাক্সে ভরে রেখে দিয়েছিল পিছনের বারান্দায়। সে কত বছর আগের ঘটনা? এখন এই পাগল মানুষকে কী বলবে হালিমা?
 
‘কতা কও না ক্যা?’ শফি তালুকদার স্ত্রী হালিমার চোখের উপর চোখ রাখে। ‘তুমিই তো রাখচো। কোতায় রাখচো?’
 
‘হেই রেডিও কি আছে?’
 
‘আছে নাতো কী? ভাইজা খাইচো?’
 
‘রেডিও কি ভাইজা খাওনের জিনিস?’
 
চেতে যায় শফি তালুকদার, ‘এত কতা কও ক্যা? রেডিওটা কোতায়?’
 
‘বারিন্দায়, বড় টিনের বাক্সটার মইধ্যে রাকছি কবে! এহনও কি আছে? ইন্দুরে কাইটা রাখছে কিছু?’
 
শফি তালুকদার এক দৌড়ে বারান্দায় যায়। অনেক ময়লা, ছেঁড়া কাঁথার স্তূপের ভিতর থেকে টেনে টিনের বাক্সটা বের করে সামনে আনে। বাক্সটার উপরের ঢালায় জং ধরে ক্ষয়ে গেছে। ভিতরে তেলাপোকা আর ইঁদুরের বিষ্টার বিকৃত গন্ধ। নাক চেপে টেনে বাক্সটা বাইরে এনে ফেললে, বাক্সটা চারদিকে খুলে পড়ে। শফি দ্রুত হাতে ভিতরের সব বের করে আনতে আনতে ট্রানজিস্টারটা পেয়ে যায়। কিন্তু অবস্থা খুবইা খারাপ। ট্রানজিস্টারের পিছনের মাইকের ঢাকনা ক্ষয়ে ক্ষয়ে একেবারে জীর্ণ। ধরার সঙ্গে সঙ্গে খুলে হাতে আসে তালুকদারের। ব্যাটারি পচে শুকিয়ে আমচুর হয়ে আছে। হালিমা এসে অবাক চোখে শফির কাজ দেখে, ‘আপনে এইডা দিয়া কী করবেন?’
 
হালিমার দিকে এক পলক তাকিয়ে, পরনের লুঙ্গি দিয়ে ট্রানজিস্টারটাকে মুছতে থাকে। মুছতে মুছতে ময়লা, দাগ কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে। খুব যত্ন করে ট্রানজিস্টারটাকে বুকের কাছে নিয়ে ঘরে ঢোকে। পিছনে পিছনে হালিমা। ট্রানজিস্টারটাকে খাটের উপর রাখলে ছয় বছরের নাতনি কাকলী জিজ্ঞেস করে, ‘দাদা এইডা কী?’
 
‘কিছু না। ধরবা না তুমি।’ তাকায় হালিমার দিকে, ‘খাওন আছে? আমারে খাইতে দাও। আমি গোসল কইরা আইতেছি।’ হাতে আর একটা লুঙ্গি নিয়ে শফি তালুকদার দৌড়ায় পুকুরঘাটের দিকে। হালিমার দেওয়া খাবার খেয়ে ট্রানজিস্টারটা একটা কাপড়ের ব্যাগে ভরে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। দ্রত হেঁটে বোথলা বাজারে এসে একটা বাসে উঠে উপজেলা ভান্ডারিয়ায় নামে দুপরের সময়। খুঁজে বের করে টেলিভিশন মেরামতের দোকান। কেরামত মাইক সার্ভিসের দোকানের ভিতরে বসে আছে কেরামত আলী। আজকাল মাইকও তেমন চলে না। ঘরে ঘরে টিভি। ট্রানজিস্টার তো শোনা বাদ দিয়েছে আরও দশ বছর আগে। দোকানের দশাও ফকিরি। মাঝেমধ্যে দু-একটা টিভি সারাতে আসে কেরামত আলীর কাছে। গত কয়েক বছরে কেরামত রেডিও-টিভি বাদ দিয়ে ফ্রিজের কাজ করছে। কোনো রকমে টিকে আছে আর কি!
 
শফি তালুকদারকে দেখে তাকায় কেরামত আলী, ‘কী ভাই?’
 
‘আমার একটা কাম কইরা দিতে পারবেন?’
 
‘কী কাম?’
 
শফি তালুকদার খুব যত্নের সঙ্গে কাপড়ের ব্যাগের ভিতর থেকে ট্রানজিস্টারটা বের করে সামনের টেবিলের উপর রাখে। কেরামত মিস্ত্রী অবিশ্বাস্য চোখে ট্রানজিস্টারের দিকে তাকায় একবার তাকায় শফি তালুকদারের দিকে। শফি তালুকদার অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে মিস্ত্রীর কোটরাগত ঘোলাটে চোখের ফ্যাকাসে মণির উপর। মনে হচ্ছে, ভীষণ কোনো অন্যায় করে কেরামত মিস্ত্রীর হাতে ধরা খেয়েছে।
 
‘এইডা আনছেন ক্যান?’
 
‘ঠিক কইরা দেন...’
 
অবিশ্বাস্য কণ্ঠে উত্তর দেয় কেরামত মিস্ত্রী, ‘এই জিনিস ঠিক করাবেন? আপনে কি পাগল অইছেন?’
 
খপ করে হাত ধরে শফি তালুকদার, ‘আপনে টাকা-পয়সা লইয়া চিন্তা কইরেন না। আপনি অনেক পুরানা দিনের মানুষ, আপনে পারবেন।’
 
কেরামত মিস্ত্রী পিছনের ঢাকনাটা খুলে ট্রানজিস্টারের ভিতর যন্ত্র, যন্ত্রাংশ নাড়াচাড়া করতে করতে বলে, ‘বড় অসম্ভব একটা কাম লইয়া আইচেন ভাই।’
 
‘দয়া করে একটু চেষ্টা করেন,’ শফি তালুকদারের গলায় মিনতি।
 
‘ঠিক আছে, তিনশ টাকা রাইখা যান। তিনদিন পরে আসেন, দেখি কী করতে পারি...’
 
আবারও হাত ধরে শফি তালুকদার, ‘মিস্ত্রী সাব, আমার আইজ দিনের মইধ্যে রেডিওটা দেতে অইবে।’
 
‘কন কী আপনে?’
 
‘হয়, আইজই দেতে অইবে। আমি আপনেরে পাঁচশ টাহা দিমু।’
 
কেরামত মিস্ত্রীর অভিজ্ঞতা কম না। জীবনে এই প্রকারের অনেক পাগলের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে। এখন বুড়ো বয়সে আর একজন পাগলের দেখা পাওয়া গেল। খুব তীক্ষ চোখে ট্রানজিস্টারের ভিতরটা ড্রাইভার দিয়ে দেখে বুঝতে পারে, ঠিক করতে পারবে।
 
তাকায় শফি তালুকদারের দিকে, ‘আপনে বসেন। দেখি আমি কী করতে পারি। তয়, আগেই কইয়া রাখলাম, আমি সাধ্যমত চেষ্টা করমু। যদি না পারি, আমারে কিন্তু টাকা দিতে অইবে।’
 
সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝাঁকায় শফি তালুকদার, ‘আপনে চিন্তা কইরেন না, দিমু।’
 
দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতার সকল সুঁই-সুতো নিয়ে বসে কেরামত মাইক সার্ভিসের অভিজ্ঞ কেরামত আলী, শফি তালুকদারের ততোধিক পুরানো পরিত্যক্ত, পোকায় খাওয়া, ইঁদুরে কাটা ট্রানজিস্টার নিয়ে। সারাদিনের পরিশ্রম আর মেধার কারুকাজে সন্ধ্যার আগে আগে ট্রানজিস্টারটা ঠিক করে দেয় কেরামত মিস্ত্রী। একটি মুহূর্তের জন্য কেরামতের দোকান থেকে বাইরে যায়নি শফি তালুকদার। তার অনুপস্থিতিতে যদি অন্য কেউ টিভি বা ফ্রিজ নিয়ে আসে, তাহলে তার ট্রানজিস্টার মেরামতের কাজ ফেলে রেখে সেই কাজ করবে। তালুকদার কোনো সুযোগ দিতেই চায়নি কেরামত মিস্ত্রীকে। নতুন ব্যাটারি কিনে, ট্রানজিস্টারের ভিতরে বসিয়ে, কয়েক মিনিট অনুষ্ঠান শুনে একাত্তরের যুদ্ধ জয়ের আনন্দে কাপড়ের ব্যাগে ভরে বোথলার দিকে যাত্রা করে শফি তালুকাদার।
 
রাত ন’টার দিকে বাড়ি ফিরে, খেয়ে শুয়ে পড়ে। বিছানায়, মাথার কাছে ট্রানজিস্টার। হালিমার ভিতরে এক ধরনের স্মৃতি সুখ বাঘে তাড়া খাওয়া হরিণের গতিতে হানা দেয়। কত মজার মজা গান, কৌতুক, নাটক শুনেছে এই রেডিওতে। এত বছর পর সেই রেডিও আবার বাজবে!
 
‘একটু বাজান না...’ আবদার করে হালিমা।
 
‘আইজ না। কাইল বাজামু,’ নির্লিপ্ত উত্তর দেয় স্বামী শফি তালুকদার।
 
‘ক্যা... এহন বাজাইলে কী অইবে? একটু বাজান। কতদিন হুনি না গান...’
 
শফি তালুকদার উল্টোদিকে ফিরে শুয়ে ট্রানজিস্টারটাকে বুকের সঙ্গে রাখে। হালিমার বেগমের মধ্যে এক ধরনের ক্রোধ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, ‘মানুষটা সারাজীবন কথা কইল কম, আর যা একবার মনে লাগে কইরাই ছাড়ে।’ এই রাতে পাশাপাশি শুয়ে সেই পুরোনো দিনর মতো রেডিও শুনলে কি হয়? স্বামীর সঙ্গে রাগ করে সেও, বিপরীত দিকে মুখ করে ঘুমিয়ে যায়।
 
খুব ভোরে হালিমার ঘুম ভাঙে পবিত্র কোরআন পাঠের শব্দে। মাথার কাছে ট্রানজিস্টার থেকে পবিত্র সুর ভেসে আসছে। শফি নিমগ্ন মনে ট্রানজিস্টারের সামনে উবু হয়ে বসে আছে। শুনবে আজ এই ট্রানজিস্টার থেকে প্রচারিত সংবাদে শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের বিচারের রায়...।’