পরিবেশ ও বন মন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টি-জেপি’র চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য। জনগণ তাঁর সঙ্গে ছিল বলেই তিনি নেতৃত্ব দিয়ে দেশ স্বাধীন করতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার সমকালীন সময় বিশ্বের রাজনীতিতে অনেক দেশে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল।
তিনি গতকাল সোমবার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪১তম শাহাদাত্ বার্ষিকী উপলক্ষে ভান্ডারিয়া উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকালে বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি ব্যাখা করতে গিয়ে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, তখন জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনগণ স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগঠিত হয়ে স্ব স্ব ক্ষেত্রে সংগ্রামে ব্যাপৃত ছিল।
তিনি বলেন, এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের অনেক নেতাকে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কারণে তখন বঙ্গবন্ধুর মত দেশ ও জনগণের জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে। এসকল ঘটনাই ঘটানো হয় মানুষের অধিকারের আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখতে। আজ অনেক দেশই স্বাধীন হয়েছে। এমনকি কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও দেখা করছেন। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পরিবর্তিত বিশ্বের দেশে দেশে বঙ্গবন্ধুর মত সেসব মহান নেতার জন্মবার্ষিকী, মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হয়।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার জন্য আমাদের জীবনে অনেক পরিবর্তন ঘটেছিল। এই পরিবর্তন কেউ কেউ মেনে নিতে পারেননি বলে তারা এক সময় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে ১৫ আগস্টের মত ঘটনা ঘটায়। অনেকে তখন মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে বলতো দেশ স্বাধীন হলে বাংলাদেশের মসজিদে আজান হবে না, ইসলাম ধর্ম থাকবে না। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এসে এই মিথ্যাচার বন্ধের জন্য আজান চালু রাখেন। নিজে আগের মতই সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করেই দিনাতিপাত করতে থাকেন।
পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, যে সমস্ত আন্তর্জাতিক শক্তি বাংলাদেশকে মেনে নেয় নি, এ দেশের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে নি তাদের অনেকে ১৫ আগস্টের ঘটনার পরে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করে। এ ঘটনাগুলো তাত্পর্যবহ ও বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিতবহ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন পরিপূর্ণতা পায় ছাত্র সমাজের ১১ দফা দাবির মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা দাবির মধ্যে তখনকার বামপন্থি নেতারা ধর্ম নিরপেক্ষতার মত কর্মসূচির অভাব অনুভব করায় ছাত্র সমাজের ১১ দফার মধ্যে দেশের সকল মানুষের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হওয়ায় স্বাধীনতা আন্দোলন আরও বেগবান হয় এবং বাঙালি স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষায় সংগঠিত হতে থাকে।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ঢাকার রেসকোর্স বা বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্র সমাজই বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছিল। যার মধ্যদিয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালির কাছে ঐক্যের প্রতীক হিসাবে আবির্ভূত হন। তিনি বলেন, আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের নিশ্চয়তার জন্য। আমাদের রাজনীতিবিদরা তখন জেল-জুলুম-অন্যায়ের শিকার হয়েছিলেন। তাদের স্বপ্ন সফল করতে আমাদের চিন্তা করতে হবে। আমরা মনে করি, ক্ষমতার শক্তি যেমন মানুষ, তেমনি সকল ক্ষমতার উত্স মহান আল্লাহতালা। আল্লাহই নেতাদের ক্ষমতাবান করেন বলে এই ক্ষমতা জনগণের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়।
তিনি বলেন, আমি গত ৩২ বছর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত আছি। এ অঞ্চলের মানুষ আমাদের সঙ্গে রয়েছে বলে স্বাধীনতার সুফল সামান্য হলেও মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছি। মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দেশে ১৫ আগস্ট পালনের সময় একটি তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে তাহলো বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এই দিনটিতে তাঁর জন্মদিনে কেক কাটার কর্মসূচি বন্ধ রেখেছেন। এটি শুভবুদ্ধির পরিচয়। এর মধ্যদিয়ে দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন তথা রাজনৈতিক ঐকমত্যের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত হলো।
ভান্ডারিয়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন বিশেষ অতিথি ভান্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম তালুকদার উজ্জল, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফায়জুর রশীদ খসরু, উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আসমা আক্তার, উপজেলা জেপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার, জেপি’র সদস্য সচিব ও ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু, টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক হাফিজুর রশীদ তারেক, জেপি নেতা গৌরীপুর ইউপি চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান চৌধুরী, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহকারী কমান্ডার (সাংগঠনিক) মফিজুর রহমান মুন্সী, উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক তালুকদার এনামুল কবির টিপু, যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ লিটন পেশকার, যুগ্ম আহ্বায়ক শফিক মান্নান ও ছাত্রলীগের সভাপতি এহসাম হাওলাদার।
এ সময় মঞ্চে ছিলেন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের উপজেলা সাধারণ সম্পাদক মিরাজুল ইসলাম, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুজ্জামান তালুকদার, ভিটাবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান খান এনামুল করিম টিপু প্রমুখ। আলোচনা সভা শেষে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের শহীদ সদস্যদের রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। এরপর ১৫ আগস্ট উপলক্ষে যুবকদের মধ্যে ঋণ বিতরণ, প্রতিবন্ধী ও দুস্থ অসহায় মহিলাদের মধ্যে আর্থিক অনুদান এবং শ্রেষ্ঠ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, ব্যবস্থাপনা কমিটি, শিক্ষানুরাগী এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সনদপত্র বিতরণ করা হয়।
শোক দিবসে জেপির আলোচনা সভা
জাতীয় পার্টি-জেপি’র ভাণ্ডারিয়া উপজেলা শাখার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত শোক দিবসের এক আলোচনা সভায় পার্টির চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু যখন জেলে ছিলেন তখন দৈনিক ইত্তেফাকও বন্ধ করে দেয়া হয়। ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে কারাভোগ করতে হয়। ছাত্র সমাজ ও জনতা আন্দোলন গড়ে তুলে বঙ্গবন্ধু, মানিক মিয়া ও ইত্তেফাককে মুক্তি করে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেন “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতা সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম”। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিরা এ দেশে নিরীহ মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, পাকিস্তানিরা যখন বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে নিয়ে যায় তখন অনেকেই মনে করেছিল তাঁর ফাঁসি হবে। আবার অনেকে মনে করেছিল ফিরে আসবেন। মুক্তিযুদ্ধকালে নেতাদের মধ্যে এ নিয়ে বিভক্তিও দেখা দিয়েছিল। অন্যদিকে ইরানের বাদশা রেজা শাহ পাহলবী পাকিস্তান নাম বাদ দিয়ে অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু তা প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধিতাকারীরা এ দেশের জন্মকে মেনে নিতে পারেনি। এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, অনেকে এখনো তাদের ধ্যান-ধারণায় পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখে। তাদের স্বপ্ন সফল হবে না। বাংলাদেশের মানুষ সুন্দরভাবে জীবন-যাপন করবে এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। এ স্বপ্ন পূরণ অনেক কষ্টসাধ্য। তারপরও মানুষ স্বপ্ন দেখে কি করে ভাল জীবন-যাপন করা যায়।
গতকাল সোমবার রাতে ভাণ্ডারিয়া বন্দরে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় উপজেলা জেপি’র আহ্বায়ক মনিরুল হক মনি জোমাদ্দার সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্য রাখেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফায়জুর রশীদ খসরু, জেপি’র উপজেলা যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার, সদস্য সচিব সিদ্দিকুর রহমান টুলু, উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক হাফিজুর রশীদ তারেক, উপজেলা ছাত্র সমাজের সদস্য সচিব সালাউদ্দিন রাহাত জোমাদ্দার ও সাবেক সভাপতি মোস্তফা সিকদার। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের পিরোজপুর জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ, উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা জেপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক আতিকুল ইসলাম তালুকদার উজ্জল, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিরাজুল ইসলাম প্রমুখ।
ইত্তেফাক / এ এন