এমনও দিনে তারে ‘শুভেচ্ছা’ বলা যায়

 
আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের গ্রামীণ পটভূমিকায় নির্মিত ছবির সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক ফারুকের জন্মদিন আজ। পঞ্জিকা অনুযায়ী মধ্যষাট অতিক্রম করে গেছেন সত্তর ও আশির দশকের কুশলী এই অভিনেতা। ১৯৭১-এর অগ্নিগর্ভ মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র এইচ. আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ মুক্তি পায়। ছবিটির নায়িকা সেই সময়ের ব্যস্ততম অভিনেত্রী কবরী। চলচ্চিত্র অভিষেকের পূর্বে ফারুক পুরোনো ঢাকায় মঞ্চ নাটকেও কিছু সময় অভিনয় করেছিলেন। সরাসরি যুক্ত ছিলেন ১৯৬৬-এর ছয় দফা ও ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনে। বলাবাহুল্য ওই সময়ে যুবসমাজ নিখাদ দেশপ্রেম থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত হতো। ফারুকের ক্ষেত্রেও এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ফারুক অংশগ্রহণ করেন, তত্কালীন দুর্ধর্ষ ছাত্রলীগ নেতা মোস্তফা মহসিন মন্টুর নেতৃত্বে। স্বাধীন মাতৃভূমিতে ফারুক ব্যবসা কিংবা চাকরি কোনো দিকে না গিয়ে চলচ্চিত্রে এলেন কেন? যতদূর জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ে পুরান ঢাকায় তার বিচরণ ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা, যা কিনা পরবর্তীতে বিশাল বাধা সৃষ্টি করে তার অগ্রযাত্রায়, অনেকটা আত্মরক্ষার জন্যই মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ফারুক নিজেকে চলচ্চিত্রে সঁপে দেন। এক্ষেত্রে ব্যাপারটি পরবর্তীতে শাপেবর হিসেবে পরিগণিত হয়।
 
স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত নায়ক রাজ্জাক নিজেকে সেই সময়ে ঢাকার চলচ্চিত্রের অপরিহার্য নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। স্বাধীনতার পর ফারুকের উল্লেখযোগ্য ছবি (১৯৭২-১৯৭৪) ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘দুরন্ত দুর্বার’, ‘আলোর মিছিল’। ১৯৭৫ সালে নারায়ণ ঘোষ পরিচালিত ‘লাঠিয়াল’ ছবিটি ফারুকের অভিনয়জীবনের একটি মাইলফলক। ওই সময়ে প্রবর্তিত প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের রাষ্ট্রীয় সম্মান লাভ করা ছাড়াও এই ছবির মাধ্যমে ফারুক নিজের অভিনয় ক্ষমতার ব্যাপ্তি দর্শকদের বোঝাতে সক্ষম হন। ১৯৭৫ সালে খান আতার ‘সুজন সখি’ ছবিটি ফারুককে গ্রামভিত্তিক ছবির রোমান্টিক ও প্রতিবাদী প্রেমিক পুরুষের চরিত্রে সুনিপুণভাবে দর্শক ও সমালোচকদের হূদয়ে স্থান করে দেয়। ১৯৭৬ সালে আমজাদ হোসেনের ‘নয়ন মনি’ এবং ১৯৭৮ সালে একই পরিচালকের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ওই সময়ের জনপ্রিয়তম নায়িকা ববিতার সঙ্গে ফারুকের করা এই দুইটি ছবি দর্শক ও চলচ্চিত্র মহলে তার খ্যাতি ও আস্থার ক্ষেত্রকে প্রসারিত ও মজবুত করে। বিশেষত আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবিতে তার নীরব অভিব্যক্তি, সোচ্চার প্রতিবাদ এবং ছবির শেষাংশে তার শেকল ভাঙার অবিস্মরণীয় ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ’ তাকে একজন বলিষ্ঠ অভিনেতার মর্যাদায় উন্নীত করে। অতঃপর ফারুক এই সময়ে (মধ্য সত্তর থেকে মধ্য আশি) কবরী, শাবানা, ববিতা ও রোজিনার সঙ্গে জুটি বেঁধে প্রায় শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেন। তার মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির সংখ্যা প্রায় ১৭৫টি। এই সময়ে তার উল্লেখযোগ্য ছবিসমূহ—‘ঘর জামাই’, ‘প্রিয় বান্ধবী’, ‘সীমার’, ‘নদের চাঁদ’, ‘নাগরদোলা’, ‘জীবন-মৃত্যু’, ‘এতিম’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘দোস্তি’, ‘কথা দিলাম’, ‘সাহেব’, ‘মান-অভিমান’, ‘সুখের সংসার’, ‘তাসের ঘর’, ‘আশা’, ‘সোনারতরী’ ‘শক্তিশালী’। এর মাঝে এ জে মিন্টুর ‘প্রতিজ্ঞা’ ছবিতে প্রতিনায়কের চরিত্র, ‘শক্তিশালী’ ছবিতে একসঙ্গে তিন প্রজন্মের তিনটি চরিত্র, ‘কথা দিলাম’-এ রাগী প্রেমিক যুবক, ‘সাহেব’ ছবির সংসারের সবার স্নেহের ছোট ভাই—নায়ক ফারুকের অভিনয়জীবনের উজ্জ্বলতম অভিনীত চরিত্রসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। মধ্য আশির পর থেকে ঢাকার চলচ্চিত্রে সুস্থ বিনোদনমূলক বক্তব্যধর্মী ছবি নির্মাণের ধারা ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে আসে। তার পরেও ফারুক এই সময়ে চাষী নজরুল ইসলামের ‘বেহুলা লখিন্দর’, ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, মহিউদ্দিন ফারুকের ‘বিরাজ বউ’, আওকাত হোসেনের ‘সুখের স্বপ্ন’ ও ‘বন্ধু আমার’, এম. এ মালেকের ‘লায়লা আমার লায়লা’ এই সব ছবিতে তার অভিনয় কুশলতার প্রমাণ রেখেছিলেন। প্রায় দুই দশক বিস্তৃত ফারুকের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে অসংখ্য ব্যবসাসফল ছবি থাকলেও কাজের স্বীকৃতি হিসেবে চলচ্চিত্র পুরস্কার তার সমসাময়িক নায়কদের তুলনায় তার ভাগ্যে কমই জুটেছে বরাবর। এর কারণ কী? নিজের মুখে কখনো ফারুক এ বিষয়ে খোলাসা করেননি কিছুই। বোধগম্য কারণ হিসেবে বলা যায়—এক অদ্ভুত, গোপন, দুরভিসন্ধিমূলক চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন এই শিল্পী অভিনয়জীবনের সূচনালগ্ন থেকেই। ’৭২ পরবর্তী সময়ে ভারতের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋতিক কুমার ঘটক যখন ঢাকায় এসে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ তৈরি করেন কিংবা মধ্য সত্তর-এ ‘সুজন সখি’ ছবিটি দেখার পরে মৃণাল সেন কবি জসীম উদ্দিনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ ছবিটি নির্মাণের সময়ে ফারুকের কথাই চিন্তা করেছিলেন। শেষ অবধি যদিও ‘তিতাস’-এ কবরীর নায়ক হয়েছিলেন প্রবীর মিত্র। মৃণাল সেন তার কাঙ্ক্ষিত ছবিটি বানাতেই পারেননি এদেশের একদল স্বার্থেন্বষী চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের অসহযোগিতার কারণে। মধ্য আশি থেকে চলচ্চিত্র অভিনয়ের পাশাপাশি নায়ক ফারুক চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গ্রুপের নেতৃত্বে চলে আসেন। এক্ষেত্রে চলচ্চিত্র পরিবেশক সমিতির নেতৃত্ব তার হাতে আরও বেগবান হয়ে উঠে। তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজক ও শিল্প সমিতির প্রতিষ্ঠার পিছনেও নেপথ্যে কুশীলব হিসেবে কাজ করেন। নব্বই দশকের গোড়ায় ফারুক ঢাকার চলচ্চিত্রে নবাগত শিল্পীদের আগমনে তার দুই দশকের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের ধারা বদল করেন। ওই সময়ে তাকে চলচ্চিত্রে সালমান শাহ, শাবনূর, রিয়াজ ফেরদৌস, মৌসুমী ও পপির অভিভাবকের চরিত্রে সময়োচিত গেটআপ ও অভিব্যক্তিতে গাম্ভীর্যপূর্ণ ইমেজে দেখা যায়। এই সময় তার উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলো—‘কোটি টাকার কাবিন’, ‘ঘরের লক্ষ্মী’, ‘জীবন সংগ্রাম’ প্রভৃতি।
 
ফারুকের আড়াই দশকের বিবাহিত জীবনে রয়েছে দুই সন্তান—ফারিহা তাব্বাসুম তুলসি ও রওশন হোসেন শরত্। সহধর্মিণী ফারজানা পাঠান। তার দুই সন্তান বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অধ্যয়নরত। তিনি নিজেও বিগত দুই দশক থেকে একজন শিল্পপতি হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন। তিন বছর আগে তার কিডনিতে সমস্যা দেখা দিলে তাকে প্রায় মাস ছ’য়েক সিঙ্গাপুরে চিকিত্সাধীন থাকতে হয়। সফলভাবে তার শরীরে সে সময়ে একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। ছাত্রাবস্থা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তার আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ, পরীক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য একজন লড়াকু সৈনিক আমাদের এই আকবর হোসেন পাঠান ওরফে নায়ক ফারুক। আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সবসময়ে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট থাকলেও তাকে কখনো কোনো দলীয় পদে দেখা যায়নি। তিনি সফলতার সঙ্গে বিগত তিন দশক বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন।
 
বিশাল, উদার ও একজন নিখাদ দেশপ্রেমিক হিসেবে নায়ক ফারুক তার শিল্পীজীবনে সবসময় সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। তার সমসাময়িক নায়কদের মাঝে সচারচর এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়নি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি চলচ্চিত্রের এই সফলতম অভিনেতা দ্রুততম সময়ে লাভ করবেন—সকলের সঙ্গে এই প্রত্যাশা আমাদেরও। শুভ জন্মদিন শিল্পী ফারুক।