রংপুরে পুলিশি নির্যাতনে নূরুন্নবী (৩৫) নামে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। তবে পুলিশের দাবি, হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শনিবার ভোররাতে রংপুর মহানগরীর মাহিগঞ্জ বালাটারী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিজ বাড়িতেই পুলিশি নির্যাতনে নূরুন্নবীর মৃত্যুর খবরে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দুই ভ্যান ভর্তি পুলিশকে ভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টা পযন্ত আটকে রাখে। ওই দুই ভ্যান পুলিশ নূরুন্নবীকে গ্রেফতার করতে গিয়েছিল। পরে কোতোয়ালি থানার ওসি জাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নূরুন্নবী হত্যার সঙ্গে জড়িত সদস্যদের বিচারের আশ্বাস দিয়ে অবরুদ্ধ পুলিশ সদ্যসদের উদ্ধার করে নিয়ে আসে। নূরুন্নবী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে এলাকাবাসী। এলাকাবাসীর মাঝে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
রংপুরের পুলিশ সুপার মোঃ মিজানুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেনকে (গোয়েন্দা শাখা) প্রধান করে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৩ কার্যদিবসে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপরাধের সত্যতা পাওয়া গেলে এর দায় তাদেরকেই নিতে হবে। পুলিশবাহিনী তাদের কর্মের দায়-দায়িত্ব নেবে না।
এলাকাবাসী এবং নিহতের পিতা আব্দুর রশিদ ও স্ত্রী আরজিনা বেগমের সাথে কথা বলে জানা যায়, নুরুন্নবী দীর্ঘদিন ধরে তার ভাইদের সঙ্গে নিজ বাড়িতে বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে আসছিলেন। গতকাল ভোর রাত সাড়ে ৩টার দিকে রংপুর কোতোয়ালি থানার দুই ভ্যান ভর্তি পুলিশ নূরুন্নবীকে গ্রেফতার করতে তার বাড়িতে অভিযান চালায়। এ সময় কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে পুলিশ তাকে ঘরের ভিতরে মারতে মারতে বাইরে বের করে আনে এবং মাথায় ও কানে উপর্যুপরি কিল-ঘুষি মারতে থাকে। এতে ঘটনাস্থলেই নূরুন্নবীর মৃত্যু হয়। এ সময় নূরুন্নবীর ভাই গোলজারকেও পুলিশ পিটিয়ে জখম করে। পুলিশ ঘটনা ধামাচাপা দিতে কৌশলে ‘নূরুন্নবী অজ্ঞান হয়েছে’ বলে জানিয়ে তার লাশ রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।
নূরুন্নবীর বড় ভাই তোফাজ্জল হোসেন অভিযোগ করেন, ভাইয়ের চিত্কারের ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে বের হয়ে দেখি, নূরুন্নবীর ঘরভর্তি পুলিশ। তিনি তাদের পরিচয় জানতে চাইলে একজন কোতোয়ালি থানার এসআই তারিকুল ইসলাম তারেক ও আরেকজন এসআই মকবুল হোসেন বলে পরিচয় দেন। নুরুন্নবীকে মারধরের কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, নূরুন্নবী মোটরসাইকেল চুরির সঙ্গে জড়িত। তাই তাকে গ্রেফতার করতে এসেছি। সে আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করায় শিক্ষা দিচ্ছি। বড় ভাই তোফাজ্জল বলেন, অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়া নূরুন্নবীকে পুলিশ হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি এলাকার কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে হাসাপাতালে যান। জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখেন, পুলিশ নূরুন্নবীকে হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার ভাই মারা গেছেন বলে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্মচারীরা তাকে জানিয়েছেন বলে তোফাজ্জল জানান। নূরুন্নীর স্ত্রী আরজিনা জানান, তিনি দুই বছর দুবাইয়ে চাকরি করছেন। স্বামীকে নিয়ে যেতে ৩ মাস আগে দেশে আসেন। কাগজপত্র, পাসপোর্টসহ সব কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। ঢাকায় তার মেডিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষাও শেষ হয়েছে।
অভিযুক্ত কোতোয়ালি থানার এসআই তারিকুল ইসলাম তারেক ও মকবুল হোসেন বলেন, গত কয়েকদিন আগে একটি মোটরসাইকেল চুরির মামলার নায়ক ওলিকে গ্রেফতার করা হলে সে জানায়, তাদের সঙ্গে আর কারা ছিল তাদেরকে এই নূরুন্নবী চেনে। তাই নূরুন্নবীকে আটক করা হলে সে নিজের পরিচয় গোপন করে আকস্মিকভাবে মাটিতে পড়ে যায়। এসময় তার পরিবারের সদস্যরা আমাদেরকে জানায়, সে মৃগী রোগী। তার নাকে স্যান্ডেল ধরলে জ্ঞান ফিরে পাবে। তাদের কথা অনুযায়ী নাকে স্যান্ডেল লাগানোর পরও তার জ্ঞান ফিরে না এলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে।
কোতোয়ালি থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, নিহত নূরুন্নবী মোটরসাইকেল চোর চক্রের সদস্য। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে গেলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনি বলেন, প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে দেখা হবে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর কারণ জানা যাবে। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম তোতা বলেন, নূরুন্নবীর মাথায় ও কানে জখমের চিহ্ন রয়েছে। পুলিশের মারধরেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।