তদবিরে কাজ হবে না, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ হবে না :প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত থাকবে বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেছেন, কোনো তদবিরেই এ বিচার বন্ধ হবে না। বিশ্বের অনেক দেশেই এ ধরনের বিচার কোনো নতুন ঘটনা নয়। দেশে প্রায় ২১ বছর যুদ্ধাপরাধী চক্র শাসন ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতি-লুটপাট ও মানিলন্ডারিং করে অবৈধ বিত্ত-বৈভবের পাহাড় গড়ে তুলেছে। এই অর্থ ঢেলে এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করতে বিদেশে লবিং ও তদবির করা হচ্ছে, নানাভাবে বিচারকে প্রভাবান্বিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এসব করে কোনো কাজ হবে না।   
 
গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অসুস্থ, অসচ্ছল ও দুর্ঘটনাজনিত আহত এবং নিহত সাংবাদিক পরিবারের জন্য বাংলাদেশ জার্নালিস্ট ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট (বিজেডব্লিউটি)-এর পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তার চেক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোট ১৯৬ সাংবাদিক ও নিহত সাংবাদিকদের পরিবারের মধ্যে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের আওতায় এক কোটি ৪০ লাখ টাকার অনুদানের চেক তুলে দেন।
 
জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমন করার অঙ্গিকার পুনর্ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির চরিত্রের কোনো বদল হয়নি। যুদ্ধাপরাধীদের সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজনদের নবগঠিত কমিটিতে স্থান দিয়ে বিষয়টি তারা পুরো জাতির কাছে স্পষ্ট করেছে।  
 
প্রধানমন্ত্রী অসুস্থ ও নিহত সাংবাদিকদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। অনেকের সুখ-দুঃখের কথা আগ্রহের সঙ্গে শুনে তা সমাধানের আশ্বাস দেন। এর আগে বক্তৃতা রাখতে গিয়ে সাংবাদিক নেতারা  সংবাদপত্রে নবম ওয়েজ বোর্ড গঠন, সব সংবাদপত্রে অষ্টম ওয়েজবোর্ডের পুরোপুরি বাস্তবায়ন, সাংবাদিকদের আবাসন এবং বঙ্গবন্ধু সরকার গঠিত ‘নিউজ পেপার এমপ্লয়িজ এ্যাক্ট- ১৯৭৪’ পুনর্বহালের দাবি জানান। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার কাছে কোনো কিছু চাইতে হয় না। নিজ থেকেই সবকিছু দেই। সাংবাদিকদের কল্যাণে বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট স্থাপনে আমার ব্যক্তিগত আগ্রহ কাজ করেছে। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা কেউ আমাকে কোনো পরামর্শ দেননি, কিংবা দাবিও জানাননি। নিজের ইচ্ছা ও উদ্যোগেই এটি করেছি। ৮ম ওয়েজ বোর্ড আমরা দিয়েছি। আপনারা নবম ওয়েজবোর্ডের দাবি তুলেছেন। এখানে মন্ত্রী আছেন (তথ্যমন্ত্রী), আমি বলব, যথাযথ ব্যবস্থা নিতে।
 
সাংবাদিকদের দায়িত্বের সঙ্গে কর্তব্য পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। আমরা জনগণের শক্তিতে বিশ্বাসী। জনগণের মাঝে যদি আমরা সচেতনতা গড়তে পারি, তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন। এদেশে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও যুদ্ধাপরাধীদের কোনো স্থান হবে না।
 
গণমাধ্যমকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সে স্বাধীনতা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে উপভোগ করতে হবে। যত খুশি সমালোচনা করুন, তাতে আপত্তি নেই। তবে সে সমালোচনা অবশ্যই গঠনমূলক হতে হবে। যেন গণমাধ্যমের সমালোচনা থেকে শিক্ষা নিয়ে যেকোনো ভুল সংশোধনের সুযোগও থাকে। নিজেকে গণমাধ্যম পরিবারের একজন হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, এ বিষয়ে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম জাতির পিতার কাছ থেকে। কেননা আমার বাবা জাতির পিতা ছাত্র রাজনীতি করার সময় পত্রিকায় কাজ করেছেন। তিনি পত্রিকা বের করে নিজ হাতে বিক্রিও করেছেন। জাতির পিতা কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার তত্কালীন পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধি ছিলেন। সেদিক থেকে আমিও গণমাধ্যম পরিবারেরই একজন সদস্য। 
 
অনলাইন পত্রিকার জন্যে নীতিমালা করা জরুরি মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছি। আশা করি, খুব তাড়াতাড়ি অনলাইন পত্রিকার নীতিমালা করে ফেলব। সাংবাদিকদের পেশাগত উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আমরা চাই দেশে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চা হোক। সাংবাদিক হত্যার বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি নিজেই আমার পরিবারের সব সদস্যকে হারিয়েছি। তাদের হত্যার বিচার পেতে আমাকেও ৩৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না। তবে একজন সাংবাদিক হত্যার বিচার হয়েছে, বাকিগুলোরও হবে।    
 
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও ডেইলি অবজারভার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হাতে ১০ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের মালিক রয়েছেন, যাদের কাছে কোটি টাকার অনুদান কোনো বিষয়ই নয়। তাদেরও আগ্রহী করে তুলতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে নিজেই এ ধরনের তহবিল গঠন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন- এমন ঘোষণা দিয়ে হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘আমি উপস্থিত থাকলে কেউ কম টাকার চেক নিয়ে আসতে পারবেন না। এর চেয়েও বড় অঙ্কে চেক আসতে পারে।’
 
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মনজুর আহমদ। আরো বক্তব্য রাখেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ কে এম রহমত উল্লাহ, বিএফইউজে’র সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, মহাসচিব ওমর ফারুক, ডিইউজে’র সভাপতি শাবান মাহমুদ এবং সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরী। অনুষ্ঠান শেষে বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক, প্রধান নির্বাহী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে প্রবীণ সাংবাদিক সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলমগীর, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ শফিকুর রহমান, দৈনিক বর্তমানের উপদেষ্টা সম্পাদক রাহাত খান, কালের কণ্ঠের সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, সাংবাদিক আবদুল জলিল ভূঁইয়া, স্বপন কুমার সাহা, প্রধান তথ্য কমিশনার গোলাম রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
 
ইত্তেফাক/এএন