পদ্মায় পানি বাড়ছেই, চার জেলায় বহু গ্রাম প্লাবিত

পদ্মাসহ কয়েকটি নদীর পানি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারত ফারাক্কা বাধের গেট খুলে দেয়ায় প্রভাব পড়েছে এসব নদীতে। কোথাও কোথাও পানি বিপদসীমা ছুঁয়ে যাওয়ায় নতুন করে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা। কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোরে বহু গ্রাম পানিতে ডুবে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক পরিবার। কোথাও কোথাও তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:
 
ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা জানান, ভারতের বিহার অঞ্চলে ফারাক্কা বাধের গেট খুলে দেওয়ার প্রভাব পড়েছে কুষ্টিয়া জেলায়। সমপ্রতি বন্যার পানি কমে যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে আবার আকস্মিকভাবে পদ্মা ও গড়াই নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। পদ্মা নদীতে হার্ডিঞ্জ সেতু এলাকায় পানি বিপদসীমা ছুঁইছুঁই করছে। প্রতি ঘণ্টায় দশমিক ৫ সেন্টিমিটার পানি বাড়ছে পদ্মায়। পানি বাড়ার গতি অব্যাহত থাকলে আগামী ১ দিনের মধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তারা। এদিকে হঠাত্ করে পদ্মায় পানি বাড়ায় দৌলতপুর উপজেলার চিলমারি, ফিলিপনগর ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ৪০টি ও ভেড়ামারা উপজেলার মোকারিমপুর, বাহাদুরপুর ও জুনিযাদহ ইউনিয়নের ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে দিনযাপন করছে।
 
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ফারাক্কা বাঁধের ১০৮টি গেটের মাত্র ৪টি বাদে সব কটি গেটই খুলে দিয়েছে ভারত সরকার। যার কারণে পদ্মায় অব্যাহত ভাবে পানি বৃদ্ধির ফলে কুষ্টিয়া জেলার মানুষ ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা করছে। পদ্মার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত পানির লেভেল এসে দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ১৪ সেন্টিমিটারে, যা বিপদসীমার ১১ সেন্টিমিটার নিচে। বিপদসীমা অতিক্রম করতে লাগবে ১৪ দশমিক ২৫ সেন্টিমিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে প্রতি ঘণ্টায় দশমিক ০৫ সেন্টিমিটার পানি বাড়ছে। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার গোলাপনগর-রায়টা ও দৌলতপুরের রায়টা-মহিষকুন্ডি বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ এখন চরম হুমকির মুখে। পানি বৃদ্ধির ফলে পদ্মার ভাঙনে ভেড়ামারা উপজেলার মোকারিমপুর ইউনিয়নের ছলেমন   নগর পুরোপুরি ও ঢাকাপাড়ার অধিকাংশ ঘর-বাড়িসহ ভেড়ামারা-দৌলতপুরের শত শত আবাসস্থল নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে পা বাড়িয়েছে নতুন গন্তব্যে।
 
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নৈমূল হক জানান, ‘ভারত ফারাক্কা বাঁধের দরজা খুলে দিয়েছে। এতে পদ্মায় পানি বেড়ে যাচ্ছে।’ পানি বাড়া কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। উপজেলার চিলমারি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সৈয়দ আহম্মেদ জানান,‘ পদ্মায় আকস্মিক পানি বাড়ায় চিলামারির সবগুলো (২৫টি) গ্রাম প্লাবিত হয়ে ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।’ চিলমারী ইউনিয়নের ২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠ দান বন্ধ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিরাজ মন্ডল জানান, মাত্র দুই দিনের পানি বৃদ্ধিতে ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের মধ্যে ১৭টি গ্রামের ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। আর ভেড়ামারা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আশিকুর রহমান ছবি জানান, তার ইউনিয়নের ঢাকাপাড়া গ্রামের চরটি তলিয়ে গেছে। সেখানে ১ হাজার পরিবার বসবাস করতো। এছাড়া গোলাপনগর এলাকার ৭৫ ভাগ প্লাবিত হয়েছে।
 
শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ভারত ফারাক্কা বাঁধের গেট খুলে দেয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে ৬টি ইউনিয়নের ৩০/৩৫টি গ্রাম আকস্মিক তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পদ্মা ও পাগলা নদীতে বন্যা বৃদ্ধি ফলে পাঁকা, দুর্লভপুর, উজিরপুর, সত্রাজিতপুর, ঘোড়াপাখিয়া ও মনাকষা ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকা প্ল­াবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাঁকা ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের একটি গ্রাম আংশিক এবং বাকি সবগুলো গ্রাম নদীর পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পাঁকা ইউনিয়নের চরাঞ্চলের ৬টি ওয়ার্ড এবং ২৪টি গ্রামের প্রায় ১৬ হাজার মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছে। পাঁকা ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের প্রায় আড়াই হাজার বিঘা জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।
 
লালপুর (নাটোর) সংবাদদাতা জানান, ফারাক্কা বাঁধের সব গেট খুলে দেওয়ায় গত দুই তিন দিনে পদ্মার পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে লালপুর উপজেলার লালপুর, বিলমাড়ীয়া, নওসারা সুলতানপুর, চরজাজিরা, চর বন্দবস্ত গোবিন্দপুর, চাকলার চর, দিয়াড় বাহাদুরপুরসহ পদ্মার চরাঞ্চলের হাজার হাজার একর জমির আখ, ধৈঞ্চা, শীতকালীন সবজি, কচু, হলুদ, পেয়ারা, কুলবরই ও চালকুমড়া ক্ষেত জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। চরাঞ্চলের কোনো কোনো জমির ফসলের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। প্লাবিত হচ্ছে জনপদও। চরাঞ্চল ছাড়াও নদী তীরবর্তী লালপুর, বিলমাড়ীয়া, দুড়দুড়িয়া ও ঈশ্বরদী ইউনিয়নের দু’একটি ক্যানাল দিয়ে পদ্মার পানি ঢুকতে শুরু করেছে। পদ্মা চরের বাসিন্দারা জানান, নওপাড়া, সুলতানপুর, রামকৃষ্ণ, চকরাজাপুর, চর লালপুর, দিয়াড় বহাদুরপুর ও খানপুর গ্রামের অনেক বাড়িতে পানি উঠেছে। পানি বাড়তে থাকলে রামপাড়া, রাধাকান্তপুর, মোল্লাপাড়া, জয়রামপুর, জয়পুর, জয়কৃষ্টপুর, বেরিলাবাড়ী, গোখুরাবাদ, মিয়াপাড়া, পাইকপাড়া প্রভৃতি গ্রাম প্লাবিত হয়ে যাবে।
 
গোদাগাড়ী  (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, রাজশাহীর গোদাগাড়ীর চরে পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নদী ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। গত দুই দিনে নদীগর্ভে  বিলীন হয়েছে শতাধিক বাড়ি। হুমকির মুখে পড়েছে আরো ৮ শতাধিক বাড়ি-ঘর। উপজেলার চর আষাডিয়াদহ ইউনিয়নে হুমান্তনগর থেকে চর বয়ারমারী  ঢ্যাংগা পাড়া পর্যন্ত  প্রায় ১৫ কিলোমিটার জুড়ে পদ্মা নদীর পাড় আগে থেকেই ভাঙছে। তবে ফারাক্কা ব্যারেজের গেট খুলে দেয়ায় পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধিতে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। চর আষাডিয়াদহ ইউনিয়নের হুমান্তনগর, চর নওশেরা, ডাকরি পাড়া, খাসমহল আমতলা এলাকায় নদী ভাঙন দেখা দিলেও চর বয়ারমারী নিচু পাড়া, হঠাত্ পাড়া, আমিন পাড়া ও ঢ্যাংগা পাড়ায় পদ্মা নদীর পাড় বেশি ভাঙছে।
 
বাঘা (রাজশাহী) সংবাদদাতা জনান, রাজশাহীর বাঘায় গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। ক্রমাগত পানি বৃদ্ধির ফলে ডুবে গেছে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জমির ফসলসহ প্রায় দেড় হাজার ঘরবাড়ি। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ১১টি বিদ্যালয়ের তিন হাজার শিক্ষার্থীর পড়ালেখা। বিশুদ্ধ পানি ও খাবার অভাবে অনেকেই অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। নদীতে পানি বাড়ার পর থেকে চরাঞ্চলের চকরাজাপুর, চৌমাদিয়া, আতারপাড়া, দিয়ার কাদিরপুর, লক্ষ্মীনগর, মানিকের চর এবং  টিকটিকি পাড়াসহ ১৫টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। চরাঞ্চলের বাসিন্দা আলিম মোল­্যা জানান, পদ্মার পানি বাড়ার সাথে সাথে তলিয়ে গেছে তার নয় বিঘা জমির ফসল। এ ছাড়াও  ক্রমাগত স্রোতে ভেঙে পড়েছে ১০টি আমগাছ।
 
আনিসুজ্জামান, রাজশাহী থেকে জানান, গতকাল শনিবার পদ্মায় পানি না বাড়লেও শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্লুইসগেট দিয়ে পানি নগরীতে প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে গতকাল শনিবার সকালে নগরীর প্রাণকেন্দ্র সাহেব বাজার বড় মসজিদের কাছে ফুদকিপাড়ার মুন্নুজান প্রাইমারি স্কুলের নিকটস্থ স্লুইসগেট দিয়ে প্রবেশ করা পদ্মার পানি ড্রেন উপচে রাস্তা ডুবে যাওয়া দেখা গেছে। 
 
সারিয়াকান্দি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, নৌবাহিনীর নদী তীর সংরক্ষণ কাজ চলমান থাকলেও ভাঙন আতঙ্ক দূর হচ্ছে না যমুনা পাড়ের ধলিরকান্দি ও বয়ড়াকান্দি গ্রামের মানুষের। পানি কমতে থাকায় যমুনার পশ্চিম তীরে বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। গত এক মাসের ভাঙনে ধলিরকান্দি গ্রামের দেড় শতাধিক বাড়িঘর যমুনার গর্ভে বিলীন হয়েছে। নদী পাড়ের আতঙ্কগ্রস্ত লোকজন বাড়িঘর নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিচ্ছে।
 
 

ইত্তেফাক/এএন