সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবার পেটালো ছাত্রলীগ, আহত ৩০

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর আবার কয়েক দফা হামলা চালিয়েছেন ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা-কর্মীরা। হামলায় আনুমানিক ৩০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আহতদের কয়েকজনকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বেসরকারি সুমনা হাসপাতাল ও ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ডাকা তৃতীয় দফা ছাত্র ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন গতকাল সোমবার এ ঘটনা ঘটে।
 
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদকর্মীর উপর হামলার প্রতিবাদে সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের এক জরুরি সভায় ছাত্রলীগের ইতিবাচক খবর বর্জন করার সিদ্ধান্তের জের ধরে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ইন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াত-শিবিরপন্থী কয়েকজন অনলাইন সাংবাদিকরা সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে ভাংচুর করেছে।
 
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল সকাল ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট শুরু হয়। এ সময় সব বিভাগের শিক্ষার্থী ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে জড়ো হন। এরপর তারা হল নির্মাণের দাবিতে সেখানে বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শরিফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে মিছিলে হামলা চালানো হয়। তারা বিক্ষোভরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের চড়-থাপ্পড় ও কিলঘুষি মারতে থাকেন। একপর্যায়ে চেয়ার দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর উপুর্যপরি হামলা করা হয়। এতে সাধারণ শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম, আমজাদ হোসেনসহ ৮ থেকে ১০ জন আহত হন। তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সুমনা ক্লিনিক ও ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে কয়েকজন চিকিত্সা নেন।
 
সকাল ১০টার দিকে সব শিক্ষার্থী আবার জড়ো হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা এসময় তাদের উপর ফের হামলা চালান। এতে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এ সময় ১৫ থেকে ২০ জন আহত হন। তাঁদের কয়েকজনকে ন্যাশনাল মেডিকেলে নেওয়া হয়।
 
এরপর থেকে ক্যাম্পাসে একসঙ্গে পাঁচ-ছয়জন শিক্ষার্থীকে কথা বলতে দেখলেই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাঁদের চড়থাপ্পড় মারছেন। এতে শিক্ষার্থীরা বিভাগের ক্লাসরুমে ছড়িয়েছিটিয়ে আশ্রয় নিতে থাকেন।
 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে হলের দাবিতে যেমন আন্দোলন চলছে, ছাত্রলীগও তেমন আন্দোলন চায়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি নতুন হল নির্মাণ। তাদের বক্তব্য, পুরাতন জেলখানার জায়গাতেই হল হতে হবে এমনটি নয়। তবে যদি কাছাকাছি অন্য কোথাও হল করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে পুরাতন কারাগারের জায়গা হল নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হোক। কিন্তু ছাত্র্রলীগ নেতারা বলছেন, অন্য স্থানে হল হলেও পুরাতন কারাগারের জায়গায় জাতীয় চার নেতার নামে হল করতে হবে। এ বিষয়টি সামনে রেখে ছাত্রলীগ নেতারা ছাত্রলীগের ব্যানারে আন্দোলনে শামিল হতে গতকাল সকাল ১০টার দিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আন্দোলনকারীদের চাপ দেন। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের ব্যানারে আন্দোলন করতে রাজি না হয়ে ক্যাম্পাসের কাঠালতলায় অবস্থান নেন। এ সময় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কয়েকজন অনুগত কর্মী নিয়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থান বানচাল করতে যান। তারা শিক্ষার্থীদের মাইক কেড়ে নিয়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে শ্লোগান দিতে জোরাজুরি করেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীকে তারা টেনে নিয়ে ব্যাপক মারধর করেন। এ সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভয়ে অবস্থান ত্যাগ করে শান্ত চত্বরের সামনে যেতে চাইলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্টিনের সামনে এসে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক মারধর করে। এখানে দেখা যায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে লাঠি এবং চেয়ার দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। পরে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সমাজ বিজ্ঞান অনুষদে গিয়ে অবস্থান নেন। তখন ছাত্রলীগ প্রায় দুইঘন্টা পর্যন্ত আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে রাখেন। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।
 
উল্লেখ্য, পুরাতন ছাত্রাবাস উদ্ধার ও নতুন হল নির্মাণের দাবিতে গত বছরও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ক্যাম্পাসে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পরে এক পর্যায়ে ছাত্রলীগ সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজেদের দখলে নিয়ে নিলে আন্দোলন গতি হারায়। যে কারণে ছাত্রলীগের ব্যানারে এবারের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে চায় না সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাদের বক্তব্য, ছাত্রলীগ তো শুরু থেকে এই আন্দোলনে যুক্ত ছিল না। যখন আন্দোলন দানা বাধে তখন ছাত্রলীগ সেখানে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এক ধরণের কৃতিত্ব নিতে চায়। ছাত্রলীগের হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দিলে আগের মতো এবারও আন্দোলন মাঝপথে হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী।
 
এদিকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে না। বরং ক্যাম্পাসের সব সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ বাম সংগঠনগুলোই এ আন্দোলন পরিচালনা করছে।
 
এদিকে চলমান ছাত্রধর্মঘটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।
 
গতকালের হামলা প্রসঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আল আমিন বলেন, ছাত্রলীগের দফায় দফায় হামলার প্রায় ৪০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে আটনয়জনের অবস্থা গুরুতর। ছাত্রলীগের বাধার কারণে শিক্ষার্থীরা যথাযথভাবে বিক্ষোভ মিছিল করতে পারেনি।
 
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এফ এম শরিফুল ইসলাম হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কারও ওপর ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা হামলা করেননি। বরং হল নির্মাণের দাবিতে তারাও ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করছেন।
 
এদিকে ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে বেলা ৩ টায় সমাবেশ করা হয়। সেখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে আজ মঙ্গলবার সকাল ১০ টায় শহীদ মিনারে ছাত্র মহাসমাবেশের ডাক দেওয়া হয়।
 
উল্লেখ্য, গত রবিবার হল নির্মাণের দাবিতে ধর্মঘট চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সাধারণ ছাত্রদের ওপর কয়েক দফা হামলা চালায়। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।
 
জবি সাংবাদিক সমিতির কার্যালয় ভাংচুর ও লুটপাট
 
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদকর্মীর উপর হামলার প্রতিবাদে সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের এক জরুরি সভায় ছাত্রলীগের ইতিবাচক খবর বর্জন করার সিদ্ধান্তের জের ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াত-শিবিরপন্থী কয়েকজন অনলাইন সাংবাদিক নিয়ে সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। এতে কার্যালয় থেকে প্রায় দুই লক্ষাধিক টাকার মালামাল লুটপাট হয়েছে।
 
গত রবিবার জবি ছাত্রলীগ লেখাপড়াডটকমের বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতাকে মারধর করায় বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি ছাত্রলীগের সকল ইতিবাচক খবর সাময়িকভাবে বর্জন করার সিদ্ধান্তের জের ধরে গতকাল সকাল ১০টার দিকে এই ঘটনা ঘটে।
 
এ সময় সাংবাদিক সমিতি কার্যালয়ে উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিক বিষয়টি টের পেয়ে সেখান থেকে বের হয়ে আসেন। এ সময় ছাত্রলীগ কতিপয় অনলাইন সাংবাদিক নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারা কার্যালয়ের দুটো ল্যাপটপ ও একটি ডিএসএলআর ক্যামেরা ও এনড্রয়েড মোবাইলসহ অন্তত দুই লাখ টাকার মালামাল লুটপাট করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক সমিতির বর্তমান কমিটির নেতাকর্মীরা।
 
উদ্ভূত পরিস্থিতি টের পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন তাত্ক্ষণিকভাবে সাংবাদিক সমিতি কার্যালয় সিলগালা করে দেয়। পরে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালাতে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা ফের সাংবাদিক সমিতি কার্যালয় যান। তারা কাউকে না পেয়ে কার্যালয়ের তালা ভেঙ্গে আবার ভাংচুর করে।
 
এ সময় বিডি নিউজের সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা কাজী মোবারক হোসেন, অনলাইন জাগো নিউজের সাংবাদিক সুব্রত মন্ডল, সদ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলা মেইলের বহিরাগত সাংবাদিক ইমরান আহম্মেদ অপু, পরিবর্তন ডটকমের লুত্ফর রহমান সোহাগ, সংবাদ পত্রিকার ফখরুল শাহীন, ব্রেকিং নিউজের রাকিব, বাংলানিউজের দিপু রায়হান সহ আরো স্ব-ঘোষিত বেশকয়েক জন অনলাইন সাংবাদিক নিয়ে সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট  করেন।
 
পরে প্রশাসন ফের তালা দিয়ে সাংবাদিক সমিতির কার্যালয় সিলগালা করে দেন।
 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রক্টর নূর মোহাম্মদ বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সাংবাদিক সমিতির কার্যালয় সিলগালা থাকবে।

 

ইত্তেফাক/এএন