রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশার সন্দেহভাজন খুনি ওবায়দুলকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর গতকাল সোমবার স্কুলের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন স্থগিত করেছে।
গতকাল দুপুর ১২টায় স্কুলের শিক্ষার্থীরা স্কুলের সামনে রিশার হত্যাকারীকে গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এ সময় আশপাশের সড়কগুলোতে ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়। বেলা দেড়টার দিকে রমনা বিভাগের পুলিশের সহকারী কমিশনার শিবলী নোমান ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হন। তিনি শিক্ষার্থীদের রাস্তায় আন্দোলন না করার অনুরোধ জানান। শিবলী নোমান বলেন, তারা খুনি ওবায়দুলের স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানা, ছবি পেয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিকে গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেন। এ আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে বেলা সোয়া দুইটার দিকে শিক্ষার্থীরা মঙ্গলবার দুপুর ১২ পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করে।
এর আগে সকালে স্কুলের মিলনায়তনে রিশার মৃত্যুতে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বক্তব্য দেন। শোকসভায় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং রিশার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। শোকসভায় অংশ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, সুরাইয়া আক্তার রিশার হত্যাকারীকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। অনুষ্ঠানে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ আবুল হোসেন জানান, নিহত ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশার স্মৃতি রক্ষার্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির আইসিটি ল্যাবের নাম তার নামে নামকরণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
স্কুলের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ
রিশা ছুরিকাহত হওয়ার পর তার চিকিত্সার ব্যাপারে স্কুল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ছিল। এমন অভিযোগ করেছেন রিশার বাবা-মা ও অভিভাবকরা। তাদের অভিযোগ, রিশা আহত হওয়ার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ কোনো প্রকার দায়িত্ব নেয়নি। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের কোনো গাফিলতি ছিল না। তাদের অভিযোগ সত্য নয়। আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছি।
রিশার অভিভাবকরা সাংবাদিকদের বলেন, রিশা ছুরিকাহত হয় স্কুলের সামনের ফুটওভার ব্রিজে। সেখান থেকে সে রক্তাক্ত অবস্থায় স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় তার পেটের বাম দিক থেকে রক্ত ঝরছিল। কিন্তু তখন স্কুলে গাড়ি থাকলেও কর্তৃপক্ষ তাকে গাড়ি দেয়নি। গাড়ি পেলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যেত। এছাড়া কোনো শিক্ষক এগিয়ে আসেননি।
অভিভাবকরা বলেন, এ অবস্থায় প্রথম কলেজ সেকশনের দুজন শিক্ষার্থী এসে নিয়ে যায় পাশের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে। রিকশায় করে এখান থেকে ওকে তারা নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে নেওয়ার পর তারা গুরুতর আহত বলে পাঠিয়ে দেয় ঢাকা মেডিক্যালে। পুলিশ কেস হবে বলে স্কুল কর্তৃপক্ষ এগিয়ে আসেনি। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলেছেন, মামলা হবে, ধরা যাবে না।
রিশার মা বলেন, আমার বাচ্চার রক্ত পড়তেছিল, কিন্তু ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বা অন্য কেউ এগিয়ে আসেননি। শিক্ষার্থীরা কোলে করে হাসপাতালে নিয়ে গেছে, পেটের ভেতর থেকে নাড়ি বের হয়ে গিয়েছিল। গাড়ি দিলে আমার বাচ্চা বাঁচতো, ওরে তাড়াতাড়ি নেওয়া যেত হাসপাতালে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের সামনের ফুটওভার ব্রিজে রিশাকে ছুরিকাঘাত করে বৈশাখী টেইলার্স কাটিং মাস্টার ওবায়দুল খান। গুরুতর আহতাবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ নিয়ে যাওয়ার পর রবিবার সকালে সে মারা যায়।
এদিকে ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশার খুনিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের জন্য সরকারকে লিগ্যাল নোটিস দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ভিকারুনন্নিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুল, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রদানের জন্যও বলা হয়েছে নোটিসে। স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের আইজি, ডিএমপি কমিশনার, র্যাবের মহাপরিচালক ও রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে গতকাল সোমবার দুপুরে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে এই নোটিস পাঠানো হয়। এই নোটিস পাঠিয়েছেন আইনজীবী ইউনূস আলী আকন্দ।
গ্রেফতারে অভিযান
রিশা হত্যাকারী সেই যুবক ওবায়দুল খানকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। গতকাল ঠাকুরগাঁওয়ের বীরগঞ্জ উপজেলার মীরাটঙ্গি গ্রামে পুলিশ অভিযান চালায়। পুলিশের অভিযানের আগেই ওবায়দুল পালিয়ে যায়। ওবায়দুলের বাবার নাম আব্দুস সালাম পাইকারী। পারিবারিক সূত্র জানায়, গত ২৪ আগস্ট ঢাকায় রিশাকে ছুরিকাঘাত করার পর ওবায়দুল ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রামের বাড়িতে পালিয়ে আসে। ঐ সময় তাদের পরিবারের কেউই বিষয়টি জানত না। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর তারা বিষয়টি জানতে পারে। গ্রামের মানুষের মধ্যে বিষয়টি জানাজানি হলে ওবায়দুল গা ঢাকা দেয়।
ইত্তেফাক/এএন