এক সময় শীতের মৌসুমে উত্সবের মতো অনুষ্ঠিত হতো যাত্রাপালা। যাত্রার জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে বিনোদন প্রেমী মানুষেরা গড়ে তুলেছিল যাত্রাশিল্প। এই শিল্পে জীবিকা নির্বাহ করতো হাজারো মানুষ। কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির পথে যাত্রাশিল্প। তাই এই শিল্পের কলাকুশলীরা অন্য পেশায় গিয়ে জীবন ও জীবিকার অন্বেষণ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই পেশার জৌলুশ হারালেও মানুষের মনে আছে যাত্রাদল ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নাম। এর মধ্যে অন্যতম গণেশ অপেরা, কপিলেশ্বরী নাট্যদল, প্রতিমা, তাজ মহল, রাজ মহল, চৈতালী, বৈকালী, সবুজ, রংমহল, স্বদেশ, স্বপ্না, শাপলা, মাইকেল, অগ্নিবীনা, ঝুমুরসহ বিভিন্ন নামের যাত্রাদল। এ সব দলের নায়ক নায়িকাসহ বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতেন নটরাজ অশোক কুমার, মুকুন্দ, শেখ শাহিন, সাহেব আলী, তাপস সরকার, বিষ্ণুদেব, জেরিনখান, শংকর, শরজিত্, এস, এ শফিক রহমান, মলয় ব্যানার্জি, চন্দ্রা ও পুর্নিমা ব্যানার্জি, বন্ধনা, রুপালী, কল্পনা, সন্ধ্যা, স্বপ্না, শিউলী ও আঁখি প্রমুখ।
কপিলেশ্বরী নাট্য নিকেতনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নায়ক গায়ক ও নটরাজ শেখ শাহিন আহম্মেদ বলেন, স্কুল জীবন থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৩০ বছর যাত্রাপালা, অপেরা, টিভি নাটকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অভিনয় করেছি। শিল্পী হিসেবে সম্মানও পেয়েছি। বর্তমানে যাত্রাশিল্প নিয়ে আমি শঙ্কিত। দুর্ধর্ষ খল নায়ক বিষ্ণুু বলেন, ভিলেন হিসেবে আমার অভিনয় এখনও মানুষ মনে রেখেছে। এখন জীবন ও সংসার বাঁচাতে বাধ্য হয়ে নসিমন/করিমন ও ভাড়ায় চালিত মটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছি। বাংলাদেশ যাত্রা অপেরা মালিক সমিতির সদস্য নুর ইসলাম, মোশারফ করিম, সোহাগ, শামিম ও জুয়েল ইত্তেফাককে বলেন, বিনোদন না থাকলে দেশে সংসৃ্কতিক চর্চা হবে না। আমরা যাত্রাদল চালাতে প্রায় ২০/২৫ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করি। অধিকাংশ সময় এই টাকা ফেরত আসে না।
তা ছাড়াও শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে সরকার অনুমতি দিলেও স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তার অজুহাতে অপেরা চালাতে দেয় না। অনেক সময় নেতা ও প্রশাসনের কর্তাদের বিভিন্ন অনৈতিক খায়েস পূরণ করে অনুমতি নিতে হয়। এসব নানা কারণে এ শিল্পের সাথে জড়িত হাজার হাজার মানুষ বর্তমানে খুব কষ্টে আছে। অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অনেক নিচু কাজ করে জীবন ও সংসার চালাচ্ছে। রাজা বাদশা কিংবা নায়ক নায়িকার অভিনয় করতে গিয়ে শিল্পীদের মনও তাদের মত হয়ে যায়। তাই তাদের পক্ষে অন্য কাজ করা একদিকে যেমন মানায় না অন্য দিকে তারা সেটা পারেও না। প্রতিমা অপেরার মালিক নুর ইসলাম বলেন, অনেকে বলেন নগ্নতার জন্য যাত্রাদলগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
এ কথা ঠিক নয়। আমি দীর্ঘ ৩৮ বছর যাত্রাপালা নিয়ে আছি। কিছুটা নগ্নতা আগেও ছিল এখনও আছে। বর্তমানে ফিল্মে নোংরা বেহাপনা হচ্ছে। পুতুল নাচ, হাই শো, ভ্যারাটিস, টপ শোসহ অনেকেরই লাইসেন্স নেই। তারা ৮/১০টা সুন্দরী মেয়েকে পুঁজি করে স্থানীয় পুলিশ ও দলীয় নেতাদের ম্যানেজ করে নগ্নতার সীমা ছাড়িয়ে নৃত্য পরিবেশন করে থাকে। তাদের নিয়ে কথা উঠে না। অথচ অপেরার নগ্নতা নিয়ে বাড়াবাড়ির শেষ নেই। তিনি আরো বলেন, যাত্রা সমিতির পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন থেকে পালা করে গান অভিনয় চলবে। আমরা নৃত্যের দিকে যাবো না। তা না হলে এ শিল্পকে বাঁচানো যাবে না।
পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, যাত্রা হলো সামাজিক বিনোদনের মাধ্যম। এটা একা কারো পক্ষে চালানো সম্ভব নয়। তাই যে এলাকায় যাত্রা চলে সেখানকার সব দল গোষ্ঠীর লোক এক হয়ে যাত্রা চালায়। এতে তাদের মধ্যে বাড়ে সামাজিক সম্প্রীতি। নির্দোষ যাত্রানুষ্ঠানের অনুমতি সহজ করলে একদিকে যেমন বাড়বে সামাজিক সম্প্রীতি অন্যদিকে কমবে হিংসা ও হানাহানি। মালিক ও কলাকুশলীরা ফিরে পাবে তাদের হারানো পেশা।
ইত্তেফাক/এএন