নিষিদ্ধ জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) কর্মকান্ড পরিচালন ও আদর্শ চর্চা হচ্ছে পরিবারের ভেতরেই। কোনো পরিবারের একজন জেএমবি’র সদস্য হয়ে সে তার পরিবারের অন্য সদস্যদের সংগঠনে প্রবেশে উদ্বুদ্ধ করছে। বাবা, ভাই, বোনের পাশাপাশি স্ত্রী, শ্বশুর, শাশুড়ি, শ্যালক, ভগ্নিপতিসহ আত্নীয় স্বজনদেরও টার্গেট করা হচ্ছে। সামাজিকভাবে জেএমবি সদস্যরা অন্যদের সঙ্গে চলাফেরা করতে পারছে না বলে তারা নিজেরাই নিজেদের সমাজ তৈরি করছে। এতে জেএমবির নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হচ্ছে। গত শুক্রবার রূপনগরে পুলিশের অভিযানে দুর্ধর্ষ জঙ্গি নেতা মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম নিহত হলে তার স্ত্রী, শ্বশুর-শাশুড়িসহ পরিবারের অনেকেই জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে তথ্য পেয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। এদিকে রবিবার রাতে সিরাজগঞ্জের কাজীপুর থানার গান্ধাইল ইউনিয়নের বড়ইতলা গ্রাম থেকে মা ও দুই মেয়েসহ জেএমবি’র চার মহিলা আত্মঘাতী সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলেন: আবু সাইদের স্ত্রী ফুলেরা খাতুন (৪৫), তাদের মেয়ে সাকিলা খাতুন (১৮), সালমা খাতুন (১৬) ও রফিকুল ইসলামের স্ত্রী রাজিয়া (৩৫)।
অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা ও টাঙ্গাইলে জেএমবি’র নারী জঙ্গির বড় ঘাঁটি রয়েছে বলে পুলিশ ও র্যাবের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আমাদের সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জেলা পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহমদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই বাড়িতে ডিবি পুলিশের একটি দল অভিযান চালায়। সেখানে বৈঠক করা অবস্থায় তাদের হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় সেখান থেকে বিপুল পরিমান জিহাদি বই ও কম্পিউটার উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা জানান, তারা জেএমবি সদস্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছিলো। সেই সাথে তারা এই সংগঠনের হাই কমান্ডের নির্দেশ পেলেই ফিদায়ী হামলা অর্থাত্ আত্মঘাতি হামলার উদ্যেশে হিজরতে রওনা করতো।
সূত্র জানায়, এক মাস আগে টাঙ্গাইলের কালীহাতির জোকারচর রেলগেট সংলগ্ন একটি বাড়ি থেকে সুইসাইডাল স্কোয়াডের সদস্য রোজিনা বেগম (৩০), সাজিদা আক্তার (২২) ও জান্নাতী ওরফে জেমিকে (১৮) গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে সাজিদা আক্তারের স্বামী নজরুল ওরফে বাইক নজরুল ওরফে পারভেজ ওরফে হাসান (২৯)। হাসান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দীকি কিলিং মিশনে অংশ নেয়। রোজিনার স্বামী মোখছেদুল ইসলাম ওরফে মোজাম্মেল ওরফে হারেছ (৩৫) জেএমবি’র দুর্ধর্ষ ক্যাডার। তার বাড়ি গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার পশ্চিম রাখবপুর ভূতমারা গ্রামে। জান্নাতী ওরফে জেমির স্বামী আবু সাইদ ওরফে সবুজ (২৪)। তার বাড়ি বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বাগরা কুসুমদী গ্রামে। জান্নাতী স্বামীর উত্সাহে বগুড়ার শেরপুর, গাবতলী ও ধুনট উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে জেএমবি’র নারী সদস্য সংগ্রহের কাজ করেছেন। তার স্বামী সবুজই টাঙ্গাইলের কালীহাতির জোকারচর রেলগেট সংলগ্ন ঐ বাড়িতে থাকার নির্দেশ দেয়। সেখানে আরো নারী সদস্যদের আসার কথা ছিল।
সূত্র জানায়, দুর্ধর্ষ জেএমবি’র উত্থান হয়েছে পারিবারিকভাবে। জেএমবি’র শূরা কমিটির সাবেক প্রধান শায়খ আব্দুর রহমান তার কন্যা আফিকাকে বিয়ে দিয়েছিলেন শূরা কমিটির অপর সদস্য আব্দুল আউয়ালের সঙ্গে। শায়খ আব্দুর রহমানের ছোট ভাই আতাউর রহমান সানি ছিল জেএমবির শূরা কমিটির সদস্য। ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ জেএমবির শীর্ষ ছয় জঙ্গি ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর র্যাবের হাতে জেএমবি’র ১৪৬ জন নারী জঙ্গি ও পুলিশের হাতে ৪২ জন নারী সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। এর মধ্যে ৫২ জন সদস্য রয়েছে যারা ২০ টি পরিবারের সদস্য।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম শাখার এক গবেষণায় দেখা গেছে, পারিবারিভাবে বিয়ের মাধ্যমে জেএমবি তাদের নেটওয়ার্ক জোরদার করছে। জেএমবি’র একজন দাওয়াতী সদস্য অন্য জেলায় দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালিত করতে এহসার সদস্যের দারস্থ হয়। অনেক সময় এহসার সদস্যের বাসায় থাকেন। এভাবেই এহসার সদস্য তার ছোট বোন অথবা আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে কাউকে দিয়ে ঐ দাওয়াতী সদস্যের সঙ্গে বিয়ে দেন। আবার এহসার সদস্য অনেক সময় নিজেদের সদস্যের বোন অথবা কাছের সম্পর্কের কাউকে বিয়ে করছেন।
র্যাবের এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, জেএমবি’র এক সময়ের শূরা সদস্য রফিক ওরফে জোবায়ের তার ছোট বোন শাহিদার বিয়ে দিয়েছেন জেএমবি’র এহসার সদস্য আনোয়ার হোসেন ওরফে ফারুকের সঙ্গে। ফারুকের ছোট বোন ফাতেমার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে জেএমবি’র আইটি বিশেষজ্ঞ মওলানা সায়েমের সঙ্গে। আবার জেএমবির পলাতক সদস্য এজাজের স্ত্রী হচ্ছে মওলানা সায়েমের ছোট বোন শারমিন। জেএমবির গ্রেফতারকৃত এহসার সদস্য শোয়েব ওরফে জহির ও পলাতক তার অপর ভাই এহসার সদস্য রাসেল তাদের ছোট বোন নূরজাহানকে পলাতক এহসার সদস্য পল্টু ওরফে বাবুল ওরফে আশিক ওরফে শিমুলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া জেএমবির এহসার সদস্য আল আমিনের স্ত্রী জেএমবি’র মহিলা সদস্য মার্জিয়া। মার্জিয়ার পৈত্রিক নিবাস জামালপুরের চর্শী খলিফাপুর গ্রামে। মার্জিয়ার পিতা ছিলেন শায়খ আব্দুর রহমান বন্ধু। বন্ধুর মেয়ের সঙ্গে শায়খ রহমান তার দলের ঐ সময়ের সদস্য আল আমিনের বিয়ে দেন। আবার আল আমিনের বোন মিনা বেগমের স্বামী হচ্ছে গাজীপুরের আঞ্চলিক কমান্ডার মামুন। জেএমবি সদস্য গোলাম মোস্তফার বড় ভাই জেএমবির এহসার সদস্য মনোয়ার হোসেন। জেএমবির মহিলা সদস্য নাসরিন আক্তারের স্বামী মোশারফ হোসেন জেএমবি’র দিনাজপুর জেলার কমান্ডার ছিলেন। এক সমেয়র জেএমবির সামরিক বিভাগের সহকারী প্রধান মোহতাছিম বিয়ে করেছেন জেএমবির এহসার সদস্য দিদারের ছোট বোন হাজেরা নাজনীনকে।
এ ব্যাপারে র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, পরিবারের মধ্যেই জেএমবি’র নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে। জেএমবিকে আরো শক্তিশালী করতে তারা বিয়ে ছাড়াও অন্যান্য আত্মীয়তার সম্পর্ক নিজেদের মধ্যে বজায় রাখছে।
ইত্তেফাক/এএন