লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় এডিপির ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগ উঠেছে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। এদের দুইজনের যোগসাজসে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে এবং কাজ না করেই এডিপির টাকা তুলে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
২০১৫-২০১৬ইং অর্থ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) কাজ না করার মাধ্যমে তারা প্রায় ১০ লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলীর দফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-২০১৬ইং অর্থ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি( এডিপি’র) মাধ্যমে ৪৬টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৫২ লাখ ৬৬ হাজার খরচ করা হয়। এর মধ্যে উম্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ৩৬টি প্রকল্পে ৩৯ লাখ ৩০ হাজার ৫৬০ টাকা, প্রকল্প কমিটির মাধ্যমে একটি প্রকল্পে ৭৫ হাজার টাকা ও রেট ফর কোটেশনের মাধ্যমে আটটি প্রকল্পে ১২ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাজ না করেই ৩০ জুন টাকা ফেরত যাবার অজুহাত দেখিয়ে উপজেলা প্রকৌশলী শামীন সারার ফুয়াদ ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলীর সহায়তায় প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করেন। ৩০ জুনের পর উত্তোলিত টাকা থেকে কিছু প্রকল্পের কাজ করা হলেও বেশ কিছু প্রকল্পের কাজ না করেই তা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এরমধ্যে আবার ভুয়া প্রকল্পও নেয়া হয়েছে।
রেট ফর কোটেশনের মাধ্যমে আদিতমারী গ্যারেজ বাজারের পার্শ্বে গণ শৌচাগার নির্মানের জন্য এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ উপজেলায় কোথাও এমন জায়গার নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই কাজটি করার জন্য ঠিকাদার হিসেবে নির্বাচন করা হয় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের ছেলের প্রতিষ্ঠান জুয়েল ট্রেডিংকে। ভাদাই ইউনিয়নের বড়াবাড়ী আনছার ভিডিপি সমিতির সেচ পাম্প সংস্কার বাবদ এক লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
প্রকৌশলীর দফতর সূত্র জানায়, সেচ পাম্প সংস্কারের জন্য এডিপি থেকে টাকা খরচের কোনো বিধান নেই। এই প্রকল্পটিরও কোনো কাজ করা হয়নি। উপজেলা পরিষদের অভ্যন্তরে গাছের গোড়ায় চুনকাম, পরিচর্যা ও সৌন্দর্য বর্ধনকরণ দেখিয়ে এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ চত্বরে এই কাজের কোন চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যায়নি। মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি সৌধের পিছনে গ্রিল নির্মানের জন্য এক লাখ ৫০ হাজার টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। স্মৃতিসৌধ ঘুরে এ কাজের কোনো চিহ্নও পাওয়া যায়নি। এছাড়াও উপজেলা প্রকৌশলী নিজেই ঠিকাদার সেজে উপজেলা পরিষদের সংস্কারের জন্য দুটি প্রকল্পের ১৫ লাখ টাকার কাজ করছেন বলে জানা গেছে। কোন রকমে এ কাজ দুটিও শেষ করার পায়তাঁরা করছেন তিনি। উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বৈদ্যুতিক ফ্যান সরবরাহের নামে তুলে নেয়া হয়েছে দুই লাখ টাকা। অথচ কোনো বিদ্যালয়েই ফ্যান সরবরাহ করা হয়নি। এনিয়ে গত মাসের সমন্বয় সভায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাপ্টিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল আলম প্রশ্ন তুললে সভায় হৈ-চৈ শুরু হয়। আর ফ্যান সরবরাহের কাজ করার কথা বলে টাকা উত্তোলন করেন উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রোজিনা বেগম সম্পা।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাংগঠনিক সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিম মিয়া বলেন, স্মৃতিসৌধের পিছনে গ্রিল নির্মাণের জন্য টাকা তুলে আত্মসাতের ঘটনা একেবারেই দুঃখজনক। এমন কাজে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।
জুয়েল ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের ছেলে জুয়েল বলেন, ‘আমাদের উপর বিশ্বাস রাখেন, আমরা কাজগুলো সম্পন্ন করবো।’
উপজেলা প্রকৌশলী শামীন সারার ফুয়াদ কাজ না করে টাকা আত্মসাতের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘ঠিকাদারদের কাজগুলো শেষ করতে একটু সময় লাগছে মাত্র।’ এ সময় তিনি আরো বলেন, ‘আমি কামলা মাত্র আর কাজ করলে সব দোষ কামলার উপর বত্রায়।’
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আইয়ুব আলী বলেন, ‘কয়েক দিনের মধ্যে কাজগুলো শুরু করা হবে।’
উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা কালীগঞ্জ ইউএনও শাহীনুর আলম বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমার তেমন কিছু জানা নাই।’
ইত্তেফাক/এএসএমইউ