সৌরশক্তির ব্যবহার, বিদ্যুতের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের চাবিকাঠি

সোলার প্যানেল বা সৌরশক্তির ব্যবহার নিয়ে তত্পর বাংলাদেশ সরকারসহ দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। জার্মানি, ডেনমার্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিটমিটারিং পদ্ধতি ব্যবহার করে সোলার প্যানেলে সংরক্ষিক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ব্যাপারে বেশ উন্নতি সাধিত হয়েছে। এতে করে সরকার ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়ে থাকে। এমনও হয়েছে ইউরোপে বছরের কোন এক সময় বাতাস ও সূর্যের আলো এত বেশি পরিমাণে ছিলো যে প্রচুর বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। সে সময় সেসব দেশের সরকার বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য অর্থ দিয়েছে।
 
কিভাবে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুতের চাপ কমানো যায় এবং কারা কি ধরনের প্রতিষ্ঠান এ কাজে পারদর্শী, এটির সম্ভাবনা, গ্রাহকসেবা ও প্রতিবন্ধকতাসহ বিভিন্ন বিষয়গুলো নিয়ে কথা হয়েছে বেজ টেকনোলজিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ যুবাইর আহমেদ-এর সঙ্গে।   
 
সোলার প্যানেলের যে প্যাকেজ আপনারা দিচ্ছেন সেটি অন্যান্য দেশে আছে কিনা?
 
- পশ্চিমের মোটামুটি সবগুলো দেশে এই প্যাকেজ আছে। এশিয়াতে চীন, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে খুবই কার্যকরভাবে এই প্যাকেজ চালু আছে। আমাদের পাশের দেশগুলোতেই কিন্তু আমরা যে প্যাকেজ দিচ্ছি সেটিই চলছে। নেটমিটারিং পদ্ধতিতে আমরা বিদ্যুতের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি। 
 
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার পদ্ধতিটা কি? এর খরচ কেমন?
  
- জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বাড়তি তেমন কোনো খরচ নেই। আমাদের দেশের জাতীয় গ্রিডে সৌরশক্তি ব্যবহার হয়ে আসছে। আর সরকারি বিদ্যুৎ লাইনতো আমরা নিচ্ছি। এছাড়া আমরা যে সোলার প্যানেলগুলো বসাচ্ছি সেখান থেকেও কিন্তু বিদ্যুৎ আসছে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে ট্রান্সফার সুইচ প্রতিস্থাপন করতে হবে। এটি খুবই সাধারণ একটি পদ্ধতি, এতে কোনো জটিলতা নেই। এটা পুরোটা ডিজাইন করে বসানোর জন্য সাপোর্টের দরকার হয়। যে কেউ চাইলে এটা করতে পারে না। এটার জন্য আমরা আছি কিংবা আমাদের মতো অন্যান্য প্রতিষ্ঠান আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সরকারি উদ্যোগ। আর এর জন্য যদি প্রাথমিকভাবে আপনার খরচও হয়, আপনি এর থেকে একটি বিজনেস মডেল বের করতে পারবেন। আপনি তিন বছরের মধ্যে খরচের টাকা উঠিয়ে নিতে পারবেন। এরপর থেকে আপনি শুধু টাকা আয় করবেন। সরকার থেকে ভর্তুকি হিসেবেও আপনি আয় করতে পারছেন।  
 
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যাপারে আপনারা সরকারকে আবেদন করেছেন?
 
- পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে কাজ করা আমাদের দায়িত্ব না হলেও আমরা যখন ফোরামগুলোতে যাই তখন আমরা বিষয়টি প্রপোজ করেছি। সরকারকে উদ্যোগী করার ব্যাপারে পদক্ষেপ নিচ্ছি। সরকারকেই মূল সিদ্ধান্তটা আসলে নিতে হবে। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, কত দ্রুত সরকার সবার সুবিধার কথা চিন্তা করে একটি কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে। 
 
আমাদের দেশে সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিভাবে সরাসরি ব্যবহার করা যায়? 
 
- সোলার প্যানেল সরাসরি ডিসি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। এটি এক্রিমেট্রিক কারেন্ট বা বিদ্যুৎ উত্পাদন করে। যখন প্যানেল বেশি সূর্যের আলো পাচ্ছে তখন এটি বেশি কারেন্ট উৎপাদন করছে আর যখন কম পাচ্ছে তখন কম। এখন যদি আপনি অনগ্রিড সোলার করেন তাহলে আপনি যখন ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস যেমন ফ্যান, লাইট ইত্যাদি বসাচ্ছেন তখন এট্রিমেট্রিককে সরাসরি সিমেট্রিক অল্টারনেট কারেন্ট করে সরাসরি ব্যবহার করতে দিচ্ছে। এখানে সমস্যা হচ্ছে আপনি সূর্যের আলো থেকে যে অতিরিক্ত শক্তি পাচ্ছেন তা আর সংরক্ষণ করতে পারছেন না। এক্ষেত্রে নেটমিটারিং পদ্ধতিতে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার পদ্ধতিটি কাজে আসবে।  
 
 
সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সোলার প্যানেল বসানো যে উদ্যোগ বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়েছে, এরকম আরো বেশকিছু উদ্যোগ সরকার নিচ্ছে তা কিভাবে দেখছেন আপনারা?
 
- অবশ্যই অনেক ভালো এবং কার্যকর উদ্যোগ। এভাবে মানুষজন সোলার প্যানেল ব্যবহারের ব্যাপারে আরো আগ্রহী হবে এবং একই সাথে সরকারের উপর বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণের দিক থেকে চাপ কমবে। আর প্রত্যাশা থেকেই কিন্তু নেটমিটারিং কথাটা বলা। সরকার কিংবা আমরা প্রত্যাশা করলে আসলে হবে না, জানতে হবে কিভাবে সেবা দিবো বা কি দিলে মানুষ উপকৃত হবে। যেটার একটা টুল হিসেবে থাকতে পারে নেটমিটারিং। নেটমিটারিং-এর মডেলটা কিন্তু সরকার খতিয়ে দেখতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানের সব ব্যাংকের ছাদে সোলার প্যানেল বসানোর উদ্যোগটি কিন্তু আমি বলব না অনেক কার্যকর উদ্যোগ। উদ্যোগটি ভালো কিন্তু বিষয়টিকে শুধু দেশীয় কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখলে হবে না, এটিকে আন্তর্জাতিকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।  
 
সোলার প্যানেলে বিভিন্ন রং-এর বিষয়টি আসলে কি? 
 
- এটা আসলে তেমন কিছুই না। যার যার ডিজাইনের উপর রং নির্ভর করে। অনেকে বলে থাকতে পারে ব্রাউন রং ভালো, কালো রং খারাপ, ব্যাপারটি কিন্তু আসলে এমন না। পুরোটাই আসলে স্পেকের উপর নির্ভর করে। কিভাবে আপনি আপনার সোলার প্যানেল চাচ্ছেন, কি প্রযুক্তি আপনি এতে ব্যবহার করতে চাচ্ছেন তার উপর নির্ভর করে পুরো ডিজাইনটি। ব্যবহারকারী কতগুলো ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করবে তার উপর নির্ভর করে তার সোলার প্যানেলের ডিজাইন। 
 
আপনারা আপাতত কতগুলো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাকে সোলার প্যানেল সেবা দিচ্ছেন? বিদ্যুতের চাহিদাটা কেমন মনে করছেন? 
 
-আমরা আসলে বড় প্রকল্প নিয়ে কাজ করি। ছোট প্রকল্পের কাজ সেভাবে এখন করছি না। আমরা আপাতত ১০-১৫টি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছি। বড় প্রকল্পগুলো বলতে আমরা নিয়মিত সেগুলো তত্ত্বাবধান করছি, টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিচ্ছি। বড় প্রকল্পের মধ্যে যেমন আছে আমরা চট্টগ্রাম ইপিজেড-এর পুরো এলাকার রাস্তায় সোলার লাইট প্রতিস্থাপনের কাজ করেছি এবং এটি কিন্তু পুরোপুরি একটি অফগ্রিড সল্যুশন। এটি সেন্ট্রালি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আপনি একটা জায়গা থেকে লাইট অন-অফ করতে পারবেন। সূর্যের আলোর উপর নির্ভর লাইটের আলোর উজ্জ্বলতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে-কমে। আমরা এ ধরনের প্রকল্প নিয়ে কাজ করছি। এভাবে করে বিপুল পরিমাণ শক্তি সংরক্ষিত হয়।  
 
সোলার প্যানেলের ক্ষেত্রে সব ধরনের যন্ত্রাংশ কি দেশেই উৎপাদিত হয় নাকি যৌথ উদ্যোগে অন্য দেশ থেকে আমদানি করা হয়?
 
- এটার একটা কম্বিনেশন আছে। অনগ্রিড সোলার অর্থাৎ যেখানে শক্তি সঞ্চয়ের কোনো ব্যাপার নেই সরাসরি আপনি বিদ্যুৎ পাচ্ছেন সেখানে ব্যাটারির প্রয়োজন নেই। এক্ষেত্রে দরকার কন্ট্রোলার পার্ট ও সৌর প্যানেল। সৌর প্যানেল ও কন্ট্রোলারের ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের দেশে কোনো প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নেই। এজন্য আমাদের বিশ্ববাজারের ওপর নির্ভর করতে হয়। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত দক্ষতা ও জ্ঞানের প্রয়োজন। গ্লোবাল সোর্সিং হলেও আমরা সব প্যানেল নিতে পারি না। আমাদের এক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা রয়েছে মানসম্পন্ন পণ্য আমদানির। পাশাপাশি, গ্রাহকের সাধ ও সাধ্যের সমন্বয়ের। আমরা নিজেদেরকে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার সংক্রান্ত সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। আমাদের প্যানেলগুলোর বেশিরভাগই আসে চীন থেকে। ইলেকট্রনিক পার্টসও চীন থেকে আমদানি করা হয়। চীন সবকিছুই উৎপাদন করে। এমনকি জার্মান প্রতিষ্ঠানগুলোও চীনে তাদের পণ্য উৎপাদন করে। আমাদের পণ্যগুলো চীন থেকে আসে কিন্তু আমরা যদি বলে কাদের পণ্য, ডিজাইন কোথাকার তাহলে বলতে হবে এটা জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের। আর যদি আপনি ব্যাটারির কথা বলেন তাহলে আমরা চীনসহ ও স্থানীয় সব ব্যাটারিই ব্যবহার করছি। বর্তমানে আমরা নিজেদের প্রযুক্তিতে পণ্য উৎপাদনের চেষ্টা করছি। 
 
সোলার প্যানেল সেবাদানে বেজ টেকনোলজিসের সক্ষমতা কেমন? 
 
- আমাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি বুঝিয়ে বললে আমরা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো সোলার প্যানেল দিচ্ছি কিন্তু আমাদের নেটওয়ার্ক অবকাঠামোগত ব্যবসা রয়েছে। শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিলো উন্নত গ্রাহক সেবাদানের মাধ্যমে সোলার প্যানেলের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। এখানে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি কেননা আমাদের ব্যবসায়িক মডেল পণ্যের ওপর নয় সেবার ওপর নির্ভরশীল। তাই এক্ষেত্রে আমি এখনই বলতে পারবো না যে সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কি সমস্যায় পড়বে এবং এর সমাধান কি হবে। তবে এতোটুকু বলা যায়, যারা এ ব্যবসায় ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এ ব্যবসায় এসেছে তারা সমস্যা শনাক্ত করে এর সমাধান নিয়ে আসতে পারবে। সেক্ষেত্রে আমি মনে করি আমাদের প্রতিষ্ঠান বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে।
 
ইত্তেফাক/এসএসএ