পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু

কেউ গাড়িতে, কেউ পদব্রজে চলেছেন। গন্তব্য মিনা। রচিত হয়েছে অভাবনীয় দৃশ্য। মক্কা হতে মিনা’র পথ লাখ লাখ মানুষের পদভারে মুখরিত। মুখে তাদের তালবিয়া। ‘লাব্বাইক! আল্লাহুম্মা লাব্বাইক!! লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক!! ইন্নাল হা’মদা ওয়াননি’মাতা লাকা ওয়ালমুলক’!! এখান থেকেই সূচনা হবে হজ।
 
নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শুক্রবার জুমার নামাজের পর শুরু হয়েছে পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা। পবিত্র হজের পূর্বে এই ছিল শেষ জুমা। গোটা দুনিয়া হতে আগত লাখ লাখ হজযাত্রী মসজিদুল হারামে জুমার সালাত আদায় করেন। অত:পর পবিত্র হজ পালন করতে রওনা হন মক্কা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে মিনা’র উদ্দেশে। সেখানে সারাদিন ও সারারাত অবস্থানের মধ্য দিয়ে পবিত্র হজের পাঁচদিনের আনুষ্ঠানিকতার প্রথম পর্ব শুরু হচ্ছে আল্লাহর মেহমানদের। দীর্ঘ যানজট এড়াতে অনেকে মিনায় যাচ্ছেন পায়ে হেঁটে।
 
অন্য হাজিদের মতো বাংলাদেশের প্রায় ১ লাখ ২ হাজার হাজিও রওনা হয়েছেন মিনার পথে। ফজরের নামাজের আগ পর্যন্ত মিনার পথে মুমিনদের এ যাত্রা চলবে। মিনায় পৌঁছে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায়সহ ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকবেন তারা। রবিবার মিনায় ফজরের নামাজ আদায় করে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য হাজিরা রওনা হবেন পবিত্র আরাফাত ময়দানের দিকে।
 
মূলত:হজের অংশ হিসেবে হজযাত্রীরা ৭ থেকে ১২ জিলহজ-মিনা, আরাফাত, মুজদালিফায় অবস্থান করবেন। ৮ জিলহজ দিনভর থাকবেন মিনায়। ৯ জিলহজ ফজরের নামাজ আদায় করে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে আরাফাতের ময়দানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করবেন। আরাফাত থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে মুজদালিফায় গিয়ে রাত যাপন ও পাথর সংগ্রহ করবেন হাজিরা। ১০ জিলহজ ফজরের নামাজ আদায় করে মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় ফিরবেন। মিনায় এসে বড় শয়তানকে পাথর মেরে, কোরবানি করে ও মাথা মুণ্ডন বা চুল ছেঁটে মক্কায় কাবা শরিফ তাওয়াফ করবেন। তাওয়াফ, সাঈ শেষে মিনায় ফিরে ১১ ও ১২ জিলহজ অবস্থান করবেন ও প্রতিদিন তিনটি শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন।
 
হাজিদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য আরাফাত থেকে মিনা পর্যন্ত মনোরেল সেবা চালু হয়েছে। প্রায় ১৮ কিলোমিটার এ পথে রয়েছে নয়টি স্টেশন (আরাফাতে তিনটি, মুজদালিফায় তিনটি এবং মিনায় তিনটি)।
 
এদিকে মিনায় (জামারাত) শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের সময় যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সৌদি হজ কর্তৃপক্ষ (মোয়াচ্ছাসা) হাজিদের ভাগ ভাগ করে জামারাতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। গত বছর মিনায় পাথর নিক্ষেপের সময় পদদলিত হয়ে ৭১৭ জন হাজির মৃত্যু হয়। তবে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাসহ বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা দাবি করেছে এ সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছিল। এরপরই হজে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ।
 
এ বছর হাজিদের পরিচয় নিশ্চিতের জন্য ইলেকট্রনিক ব্রেসলেট সরবরাহ করা হয়েছে। প্রতিটি ব্রেসলেটে বারকোড রয়েছে এবং এটি অ্যাপসের মাধ্যমে স্মার্টফোনের সঙ্গে সংযুক্ত। এই ব্রেসলেটে হাজিদের ব্যক্তিগত এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য রয়েছে। এটি তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি জরুরি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সুবিধা দেবে। সেইসঙ্গে তাদের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করা হবে এই ব্রেসলেটের মাধ্যমে। মক্কা ও মদীনায় দ্রুত ভিড় অপসারণ ও যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মক্কা ও মদীনায় হাজিদের পথচলা ও দিক-নির্দেশনার জন্য সাড়ে চার হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হজের অনুমতি নেই এমন কেউ যাতে মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
 
সরকারি বার্তা সংস্থা সৌদি গেজেট জানিয়েছে, অবৈধ হজযাত্রীদের আটকে বাহিতা ও হাদা এলাকায় ১ হাজার ২০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যাতে হাজিদের নিরাপত্তায় দ্রুত তিন হাজার উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র স্থানান্তরে ১৭ হাজার কর্মী মোতায়েন করেছে বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ। হজের পাঁচদিন মক্কা ও পবিত্র স্থানগুলো পরিষ্কারের জন্য ২৬ হাজার কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাজিদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য মক্কায় পর্যাপ্ত জনবল, ওষুধ ও যন্ত্রপাতিসহ আটটি হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া মিনা, আরাফাতের ময়দান ও মুজদালিফায় ২৫টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।
 
চলতি বছর পবিত্র কাবার চারপার্শ্বে তাওয়াফের স্থান সমপ্রসারিত করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। মক্কা শরীফের রক্ষাণাবেক্ষণ কর্তৃপক্ষ সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছে, এবার ঘণ্টায় ৩০ হাজার হাজি একসঙ্গে তাওয়াফ করতে পারবে। এর আগে এখানে ১৯ হাজার হাজি একসঙ্গে তাওয়াফ করতে পারতেন।
 
ই্ত্তেফাক/এমএইচ